বুধবার, ২১ নভেম্বর ২০১৮

‘শিগগির আবার দেখা হবে চট্টগ্রাম’

প্রতিবেদক, চট্টগ্রাম

প্রকাশিত: ১৮ অক্টোবর ২০১৮ বৃহস্পতিবার, ০৯:৫৪ পিএম

‘শিগগির আবার দেখা হবে চট্টগ্রাম’

মাত্র ৫ দিন আগে নিজ শহর চট্টগ্রাম মাতিয়ে গিয়েছিলেন ব্যান্ড সঙ্গীতের কিংবদন্তি আইয়ুব বাচ্চু। নগরীর জিইসি কনভেনশন সেন্টারে সেই অনুষ্ঠানের ছবি নিজের ফেসবুক পেইজে আপলোড দেন। তাতে লিখেছিল ‘সি ইউ সোন এগেইন, চিটাগং’ (শিগগির আবার দেখা হবে চট্টগ্রাম)

দেখা হচ্ছে ঠিকই । এবার আর মাতাবেন না কোন মঞ্চ। এসে খানিকটা সময় পর চলে যাবেন চির নিদ্রায়। নগরীর চৈতন্য গলি কবরস্থানে মায়ের কবরের পাশে নিজের শেষ ঠিকানায়।    

শনিবার দুপুরের নানাবাড়ী মাদারবাড়ীতে পৌঁছাবে আইয়ুব বাচ্চুর মরদেহ। সেখানে স্বজনরা দেখার পর জানাযা হবে বাদ আছর জমিয়তুল ফালাহ মসজিদ প্রাঙ্গনে।

জীবনের শেষ সময়টুকু চট্টগ্রামে কাটানোর ইচ্ছা ছিল ব্যান্ড লিজেন্ড আইয়ুব বাচ্চুর। অসংখ্য জনপ্রিয় গানের শ্রষ্টা বাচ্চুর সেই ইচ্ছাটুকু হয়ত পূরণ হল না। কিন্তু চট্টগ্রামের মাটিই তাঁকে চিরদিনের জন্য বুকে জড়িয়ে নেবে। শনিবার নগরীর চৈতন্যগলি কবরস্থানে মায়ের কবরের পাশেই চির নিদ্রায় শায়িত হবেন বাংলাদেশের ব্যান্ড সংগীতকে এগিয়ে নেওয়ার এই অগ্রপথিক।

সম্প্রতি চট্টগ্রাম এসে সিটি মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দিনের সঙ্গে দেখা করে জানিয়েছিলেন, চট্টগ্রামে একটি বাড়ি নির্মাণ করে জীবনের শেষ সময়টা এখানেই স্থায়ীভাবে কাটাবেন। কিন্তু সেই সময়টা আর এলো না।

তবে চট্টগ্রামেই হচ্ছে তার শেষ বিছানা। চট্টগ্রামবাসীর পক্ষ থেকে সর্বোচ্চ সম্মান দিয়ে তাঁকে শেষ বিদায় জানানো হবে উল্লেখ করে নগরপিতা বলেন, চসিক’র ব্যবস্থাপনায় জমিয়াতুল ফালাহ মসজিদ মাঠে শনিবার বাদ আছর তাঁর জানাজা হবে। পরে মায়ের কবরের পাশে নগরের চৈতন্যগলি বাইশ মহল্লা কবরস্থানে তাঁকে দাফন করা হবে।

সূত্র জানায়,  ‘আইয়ুব বাচ্চুর মরদেহ বৃহস্পতিবার স্কয়ার হাসপাতালেই থাকবে। শুক্রবার  বিকেল চারটায় সর্বস্তরের জনগণের শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য মরদেহ শহীদ মিনারে রাখা হবে।   শুক্রবার বাদ জুমা জাতীয় ঈদগাহ মাঠে জানাজার নামাজ অনুষ্ঠিত হবে। সেই সময় পর্যন্ত স্কয়ারের হিমাগারেই শুয়ে থাকবেন তিনি। মৃত্যুর পরেও সন্তানদের অপেক্ষায় যেন বাবা। তার দুই ছেলে মেয়ে দেশের বাইরে। ছেলে আহনাফ তাজোয়ার পরিসংখ্যান নিয়ে পড়াশুনা করছেন ইউনিভার্সিটি অব ব্রিটিশ কলম্বিয়াতে। তিনি কানাডাতেই থাকেন। বাবার মৃত্যুর সময় তাই পাশে থাকতে পারেননি। মেয়ে রাজকুমারী থাকেন অস্ট্রেলিয়ায়।

বাবার মৃত্যু সংবাদ শুনে দেশের উদ্যেশ্যে যাত্রা শুরু করেছেন তারা। সন্তানদের জন্যই শুক্রবার দুপুরে জানাজার সময় নির্ধারণ করা হয়। জানাজা শেষে করে চট্টগ্রামে যাত্রা শুরু করবে সবাই। এরপর শনিবার দুপুরে মায়ের কবরেই সমাহিত করা হবে আইয়ুব বাচ্চুকে।

নগরের স্টেশন রোডের পাশে বাইশ মহল্লার চৈতন্য গলি কবরস্থান। যার উত্তরে এনায়েত বাজার। সেখানে জন্ম ও বেড়ে ওঠা কিংবদন্তির শিল্পী ‘এবি’ খ্যাত আইয়ুব বাচ্চুর। দক্ষিণে পূর্ব মাদারবাড়িতে নানাবাড়ি। চট্টগ্রামে এলে এক ঘণ্টার জন্য হলেও ছুটে যেতেন মায়ের স্মৃতিধন্য সেই বাড়িতে।

আইয়ুব বাচ্চুর মামাত ভাই মো. আবদুল্লাহ আল মেহেরাজকে পাওয়া গেল পূর্ব মাদারবাড়ির আকতার শাহ লেনের মামা বাড়িতে। একের পর এক ফোন আসছে তার মোবাইল ফোনে।  রবিন (বাচ্চুর ডাকনাম) বলে গেছেন, চৈতন্য গলিতে মায়ের কবরের পাশেই যাতে কবর দেওয়া হয়। সে অনুযায়ী চট্টগ্রামে চলছে ব্যান্ড সঙ্গতের যুবরাজের শেষ বিদায়ের প্রস্তুতি।

যে চট্টগ্রামের অলিগলিতে গিটার বাজিয়ে ‘এবি’ নামে দেশবিখ্যাত হয়েছিলেন নন্দিত ব্যান্ড তারকা আইয়ুব বাচ্চু। সেই চট্টগ্রামের তরুণদের জন্য কিছু কারার চেষ্টা করেছিলেন তিনি। নিজের নামের সঙ্গে মিল রেখে নগরের নাসিরাবাদ এলাকায় উইন্ড অব চেইঞ্জ রেস্টুরেন্টের রুফটপে শুরু করেছিলেন ‘এবি লাউঞ্জ’।

চলতি বছরের আগস্ট থেকে শুরু হয়েছে ‘এবি লাউঞ্জ’র কর্যক্রম। প্রতি শনিবার রাতে চট্টগ্রাম তরুণ শিল্পীরা পারফরমেন্স করেন এই লাউঞ্জে। প্রতি মাসে দুই বার চট্টগ্রামের দুটি নতুন ব্যান্ড লাউঞ্জে পারফর্ম করার সুযোগ পান। প্রতিটি পারফরমেন্সে ঢাকা থেকে অনলাইনে সংযুক্ত থাকতেন আইয়ুব বাচ্চু নিজেই।

এবি লাউঞ্জ নিয়ে আইয়ুব বাচ্চু বলেছিলেন, ‘আমি চট্টগ্রামের সন্তান। তাই চট্টগ্রামের জন্য আমি কিছু করে যেতে চাই। আমি সারাজীবন গাইতে পারবো না। কিন্তু আমি চাই চট্টগ্রাম থেকে আমার মতো আরও কেউ উঠে আসুক। চট্টগ্রামের উদীয়মান শিল্পীদের জন্য আমি একটা প্লাটফর্ম তৈরি করে দিয়ে যেতে চাই। চট্টগ্রামে এবি লাউঞ্জ হবে ব্যান্ড সংগীত এবং উদীয়মান ব্যান্ড শিল্পীদের জন্য নতুন একটি সম্ভাবনার দ্বার।’

এবি লাউঞ্জের অন্যতম উদ্যোক্তা সৈয়দ রুম্মান আহাম্মেদ জানান, আইয়ুব বাচ্চু চট্টগ্রামের তরুণ ব্যান্ড শিল্পীদের নিয়ে যে স্বপ্ন দেখেছিলেন সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নে আমরা কাজ করে যাবো। এবি লাউঞ্জ বন্ধ হবে না।

বৃহস্পতিবার সকাল সাড়ে নয়টার দিকে রাজধানীর পান্থপথের স্কয়ার হাসপাতালে পৌঁছানোর আগেই নিজের ব্যক্তিগত গাড়িতে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন কিংবদন্তী সঙ্গীতশিল্পী আইয়ুব বাচ্চু।

চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, সম্প্রতি তার হৃদযন্ত্রের কার্যকারিতা ৩০ শতাংশের নিচে নেমে আসে।