বুধবার, ২১ নভেম্বর ২০১৮

তাসফিয়ার মৃত্যুর তদন্ত রিপোর্টে পরিবারের নারাজি

প্রতিবেদক, চট্টগ্রাম

প্রকাশিত: ২৫ অক্টোবর ২০১৮ বৃহস্পতিবার, ০৯:১২ এএম

তাসফিয়ার মৃত্যুর তদন্ত রিপোর্টে পরিবারের নারাজি

স্কুলছাত্রী স্কুলছাত্রী তাসফিয়া আমিনের (১৬) রহস্যজনক মৃত্যুর পর দায়ের করা মামলায় পুলিশের ‘চূড়ান্ত প্রতিবেদন’ প্রত্যাখ্যান করে ‘নারাজি’ দিচ্ছে তার পরিবার।বৃহস্পতিবার ৫ম অতিরিক্ত মহানগর দায়রা জজ আদালতে (শিশু আদালত) এ পিটিশন দাখিল করা হবে। নারাজি পিটিশনে চূড়ান্ত প্রতিবেদনের বেশ কয়েকটি বিষয়ের উপর আপত্তি দেওয়া হবে বলে জানা গেছে।

গত ১৬ সেপ্টেম্বর আদালতে জমা দেওয়া চূড়ান্ত প্রতিবেদনে নগর গোয়েন্দা পুলিশের উপ-পরিদর্শক (এসআই) স্বপন কুমার সরকার উল্রেখ করেন স্কুলছাত্রী তাসফিয়া কর্ণফুলী নদীতে ঝাঁপ দিয়ে আত্মহত্যা করেছেন । তাকে হত্যা কিংবা যৌন নির্যাতনের কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি। প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনা, ময়নাতদন্ত ও ভিসেরা রিপোর্ট পরীক্ষায় হত্যার প্রমাণ পাওয়া যায়নি। ময়নাতদন্তে তাসফিয়ার ফুসফুসে পানির উপস্থিতি পাওয়া গেছে। এতে তার পানিতে ডুবে মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত হওয়া গেছে।

‘প্রত্যক্ষদর্শী কয়েকজন সাক্ষী বলেছেন, তাসফিয়াকে সন্ধ্যার দিকে নদীর তীরে বসে থাকতে দেখেছিলেন তারা। এরপর তাকে তীর থেকে নেমে রিটেইনিং ওয়াল সংলগ্ন পাথরের ওপর দিয়ে হাঁটতে দেখেন। অন্ধকার ঘনিয়ে আসার পর তারা পানিতে ঝাঁপ দেওয়ার আওয়াজ এবং চিৎকার শুনতে পান। এতে প্রতীয়মান হয় যে- তাসফিয়া কর্ণফুলী নদীতে ঝাঁপ দিয়ে আত্মহত্যা করেছেন।’

তবে আত্মহত্যার কারণ চূড়ান্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ করেননি তদন্তকারী কর্মকর্তা। ১৬ জন সাক্ষীর সাক্ষ্যের ভিত্তিতে দেওয়া চার পৃষ্ঠার চূড়ান্ত প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, ময়নাতদন্ত প্রতিবেদনে বিষপানের কোনো আলামত পাওয়া যায়নি। যৌন হয়রানি কিংবা ধর্ষণের কোনো আলামত মেলেনি। তবে ফুসফুসে পানি পাওয়া গেছে যা পানিতে ডুবে মৃত্যুকে সমর্থন করে।”

চূড়ান্ত রিপোর্টে অসংলগ্নতা :

বাদীর আইনজীবী এডভোকেট চন্দন দাশ জানান, তাসফিয়ার শরীরে গুরুতর আঘাতের চিহ্নগুলো দেখলে এটা যে আত্মহত্যা নয় তা যে কেউ বুঝতে পারবে। তাছাড়া পোস্টমর্টেম রিপোর্টেও আঘাতের কথা বলা আছে এবং তা মৃত্যুর আগের আঘাত। একজন সাঁতার না জানা মানুষ পানিতে ডুবে যাওয়ার সময় চিৎকার করতে পারে না স্বাভাবিকভাবে। অথচ পুলিশের চূড়ান্ত প্রতিবেদনে পানিতে নিমজ্জিত হওয়ার আগে চিৎকারের শব্দ শুনার কথা বলা হয়েছে। এ বিষয়েও আদালতের দৃষ্টি আকর্ষণ করা হবে।

চূড়ান্ত প্রতিবেদনে তাসফিয়া আমিন ও তার প্রেমিক আদনান মির্জা চায়না গ্রিল রেস্টুরেন্ট থেকে একসাথে বের হওয়ার তথ্য রয়েছে। এরপর তাসফিয়া আমিন একটি সিএনজি টেক্সিতে উঠে। একইভাবে আদনান মির্জাও আরেকটি সিএনজি টেক্সি নিয়ে বাসায় চলে যায়। তদন্তে আদনান মির্জার সিএনজির গন্তব্যের কথা বলা হলেও তাসফিয়ার সিএনজির গন্তব্যের কথা আসেনি। শুধু বলা হয়েছে, ঘটনার দিন রাত ৮টার দিকে প্রত্যক্ষদর্শীরা তাসফিয়াকে পতেঙ্গা নেভাল বিচে একা বসে থাকতে দেখেন। কিছুক্ষণ পর আবার একা নীচে নেমে যেতেও দেখেন। এর আধঘণ্টা পর অর্থাৎ রাত সাড়ে ৮টায় কর্ণফুলী নদী হতে তার একটি চিৎকারের শব্দ শুনেন।

উল্লেখিত বর্ণনার বিষয়ে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, তাসফিয়া সিএনজি করে পতেঙ্গা গেলে রাস্তায় বেশ কয়েকটি স্থানে সিসি ক্যামেরা রয়েছে। সেগুলো পর্যালোচনা করে সিদ্ধান্ত নেয়ার বিষয়টি তদন্তে আসেনি। এছাড়া ঘটনার সময় আসামিদের মোবাইল লোকেশন কোথায় ছিল সেটাও স্পষ্ট হওয়া দরকার বলে মনে করেন মামলার বাদী মোহাম্মদ আমিন।

২ মে সকালে নগরীর পতেঙ্গায় নেভাল একাডেমির অদূরে ১৮ নম্বর ঘাট এলাকায় কর্ণফুলী নদীর তীরে তাসফিয়া আমিনের (১৬) মরদেহ পায় পুলিশ। প্রথমে পরিচয় নিশ্চিত না হলেও দুপুরে পরিবারের লোকজন থানায় গিয়ে মরদেহ শনাক্ত করেন।

তাসফিয়া কক্সবাজার জেলার টেকনাফ উপজেলার ডেইলপাড়া এলাকার মো. আমিনের মেয়ে। চট্টগ্রাম নগরীর ও আর নিজাম রোডে তাদের বাসা। সান সাইন গ্রামার স্কুলের নবম শ্রেণির ছাত্রী ছিলেন।

তাসফিয়ার বাবা বাদী হয়ে ৩ মে পতেঙ্গা থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন। ওই মামলার আসামিরা হলেন, গ্রেফতার হওয়া তাসফিয়ার বন্ধু ও এলিমেন্টারি স্কুলের নবম শ্রেণির ছাত্র আদনান মির্জা (১৬), সানসাইন গ্রামার স্কুলের নবম শ্রেণির ছাত্র শওকত মিরাজ ও আসিফ মিজান, আশেকানে আউলিয়া ডিগ্রি কলেজের এইচএসসির ছাত্র ইমতিয়াজ সুলতান ইকরাম এবং কথিত যুবলীগ নেতা মো. ফিরোজ ও তার সহযোগী সোহায়েল ওরফে সোহেল।আদনানসহ গ্রেপ্তারকৃত তিন আসামির মধ্যে দুইজন গত ঈদের আগেই জামিনে বেরিয়ে গেছে। এ দুইজন হচ্ছে, ফিরোজ ও আসিফ মিজান। ৬ আসামির মধ্যে অন্যদের গ্রেপ্তার করা যায়নি।

বাদীপক্ষের আরেক আইনজীবী মোহাম্মদ খালেদ বলেন, বৃহস্পতিবার  মামলার ধার্য তারিখে আসামিপক্ষের আইনজীবীরা মামলার প্রধান আসামি আদনান মির্জার জামিন চাইবেন। এদিন আমরাও পুলিশের দাখিল করা চূড়ান্ত প্রতিবেদন প্রত্যাখ্যান করে নারাজি পিটিশন দাখিল করবো আদালতে।