বুধবার, ২১ নভেম্বর ২০১৮

চুরির টাকায় চন্দনাইশে নাছিরের মসজিদ, দালানবাড়ি

প্রতিবেদক, চট্টগ্রাম

প্রকাশিত: ২২ অক্টোবর ২০১৮ সোমবার, ০৯:০৬ এএম

চুরির টাকায় চন্দনাইশে নাছিরের মসজিদ, দালানবাড়ি

চট্টগ্রামে চন্দনাইশে শঙ্খতীরের গ্রাম ধোপাছড়ি। এখানে দানশীল, সমাজসেবী হিসাবে নাম রয়েছে বদিউল হক ওরফে নাছিরের। নিয়মিত দান খয়রাত করেন ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে। রমজানের ঈদে এলাকার গরীব লোকজনকে নতুন কাপড়-চোপড়ও দেন। শঙ্খতীরের ধোপাছড়ির তার গ্রামের বাড়ির চারপাশে বসিয়েছেন ক্লোজ সার্কিট ক্যামেরা (সিসি ক্যামেরা)। বানিয়েছেন সুরম্য দোতলা  বাড়ি। দুই একর জমিজুড়ে রয়েছে মাছের খামার। একাধিক সিএনজিচালিত ট্যাক্সিরও মালিক। চলাফেরা করেন প্রাইভেট কারে। বিলাসবহুল চলাফেরা অর্থসম্পদ সবই করেছেন চুরির টাকায়।

চুরির দায়ে মাঝে মাঝে জেলেও যেতে হয় এ চোরকে। কিন্তু প্রতিবার জেল থেকে বের হয়ে এলাকায় গিয়ে নাছির গ্রামবাসীকে জানান তিনি সৌদিআরব গিয়েছিলেন।

তিনি হলেন চন্দনাইশের ধোপাছড়ি ইউনিয়নের পূর্ব ধোপাছড়ি গ্রামের সুন্দরকুল গ্রামের মৃত জান বক্সের ছেলে বদিউল হক ওরফে নাছির। এলাকার লোকজন জানেন চট্টগ্রামে ব্যবসা করেন নাছির। চলতি বছরের ২৩ মে আগ্রাবাদ শেখ মুজিব রোডের সিএন্ডএফ টাওয়ারের চতুর্থ তলায় কিউসি মেরিটাইম লিমিটেড, কিউসি লজিস্টিক ও আরকে ক্যাপিটাল লিমিটেড নামে তিনটি প্রতিষ্ঠানে একই রাতে চুরির ঘটনা ঘটেছে। তিন প্রতিষ্ঠান থেকে প্রায় বিশ লাখ টাকা নিয়ে যায় চোরের দল। ভবনটির ক্লোজ সার্কিট ক্যামেরার ভিডিও ফুটেজ দেখে সম্প্রতি পূর্ব ধোপাছড়ি গ্রামের আবছার উদ্দিনের ছেলে মো. হেলালকে (২৮) গ্রেপ্তার করেছে ডবলমুরিং থানা পুলিশ। হেলাল পেশাদার চোর নাছিরের ভাগিনা। এর আগে গত ২১ এপ্রিল রাত আটটায় আগ্রাবাদ স্ট্যান্ড রোডে বারেকবিল্ডিং চেয়ারম্যান মেরিন ইলেক্ট্রনিক্স সার্ভিস নামে একটি ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে চুরি করে।

ডবলমুরিং থানার পরিদর্শক (ওসি) একেএম মহিউদ্দিন সেলিম জানান, নাছির পেশাদার চোর। তার বিরুদ্ধে নগরীর বিভিন্ন থানায় ১৩টি মামলা রয়েছে। তার সহযোগী জামালের বিরুদ্ধে নগরীর বিভিন্ন থানায় আটটির অধিক মামলা রয়েছে। দু’জনেই চুরি করা অর্থে বেশ অর্থ-সম্পদ গড়ে তুলেছে। সিএন্ডএফ টাওয়ার ছাড়াও বারিক বিল্ডিং মোড়ের একটি শিপিং অফিসেও চুরির ঘটনায় নাছির ও তার সহযোগীরা অংশ নিয়েছিল এমন তথ্য আমাদের কাছে রয়েছে।

তিনটি স্থানে চুরির ঘটনার বিস্তারিত বর্ণনা দিয়ে নাছিরের ভাগিনা গ্রেপ্তার হেলাল আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছে।

এর আগে ২০১২ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর কোতোয়ালী থানা পুলিশ নাছিরকে কাজির দেউড়ি এলাকা থেকে গ্রেফতার করেছিল। তৎকালীন ওসি (তদন্ত) সদীপ কুমার দাশের কক্ষে আলাপকালে বদিউল হক ওরফে নাছির সাংবাদিকদের জানিয়েছিল “আমি তবলীগ করি। আমি প্রতিবছর তুরাগ নদীর পাড়ে বিশ্ব ইজতেমায় যাই। আমি মিথ্যা বলি না। আমি কোনো অপরাধ করলে সেটা সরাসরি স্বীকার করি। পুলিশ হেফাজতে নাছির জানিয়েছিল, চুরির জন্য নিজস্ব কিছু কৌশল প্রয়োগ করেন তারা। প্রথমেই টার্গেট করে কোথায় চুরি করবে। তারপর টার্গেট করা জয়গার উপর সকাল, সন্ধ্যা ও রাতে নজর রাখা হয়। তিনি জানান, লাইট জ্বলা-নেভার ওপর অনেক কিছু নির্ভর করে।
 
তিনি আরো জানান, চট্টগ্রামে একটি ঘটনার পর তারা কমপক্ষে একমাস আর চুরি করে না। তখন ঢাকায় চলে যান। একইভাবে সেখানে কোন ঘটনা ঘটালে চলে আসেন চট্টগ্রামে। তার গ্রামের বাড়িতে সকলে জানে মূলত তিনি আমদানি-রপ্তানির ব্যবসা করেন।

ডবলমুরিং থানার পরিদর্শক (ওসি) একেএম মহিউদ্দিন সেলিম জানান, নাছির পেশাদার চোর। তার বিরুদ্ধে নগরীর বিভিন্ন থানায় ১৩টি মামলা রয়েছে। তার সহযোগী জামালের বিরুদ্ধে নগরীর বিভিন্ন থানায় আটটির অধিক মামলা রয়েছে। দু’জনেই চুরি করা অর্থে বেশ অর্থ-সম্পদ গড়ে তুলেছে। সিএন্ডএফ টাওয়ার ছাড়াও বারিক বিল্ডিং মোড়ের একটি শিপিং অফিসেও ২০১১ সালের ৩১ মে মিশম্যাক অফিসে চাঞ্চল্যকর চুরির ঘটনায় অংশ নিয়ে আলোচনায় আসে নাছির। সেখানে ক্লোজ সার্কিট ক্যামেরা নিষ্ক্রিয় করে ভল্ট ভেঙে ২৩ লাখ ৫০ হাজার টাকা চুরি করেছিল।

২০১১ সালের ৬ জুন বিকেলে জিইসি মোড় থেকে সহযোগী আজিজসহ নাছিরকে গ্রেপ্তার করেছিল পুলিশ। জামিনে বের হয়ে ২০১২ সালের ৮ আগস্ট দামপাড়া টেলিটকের পরিবেশকের অফিস থেকে এক লাখ ২০ হাজার চুরি করে। ঐ ঘটনায়ও আবার গ্রেপ্তার হয়। এর আগেও পাঁচবার গ্রেপ্তার হয়েছিল নাছির। গত বছরের ৩০ অক্টোবর দেওয়ানহাট পোস্তারপাড় এলাকায় ইউনিলিভারের পরিবেশক প্রাইম কর্পোরেশনের অফিসেও সিসি ক্যামেরা নিষ্ক্রিয় করে ভল্ট ভেঙে ৩০ লাখ টাকা লুট করে নাছির।

ওসি মহিউদ্দিন সেলিম বলেন, নাছির দুর্ধর্ষ চোর। ইতিমধ্যে একাধিকবার গ্রেপ্তার হয়েছে। জামিনে বের হয়ে ফের চুরি করে।

পুলিশের প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে হেলাল জানায়, নাছির সম্পর্কে তার মামা হয়। ধোপাছড়ির সুন্দরকুল গ্রামে নাছিরের মালিকানাধীন মাছের খামারে চাকুরি করে। আগ্রাবাদের সিএন্ডএফ টাওয়ারের চুরির ঘটনায় হেলাল নিজেও অংশ নিয়েছিল।

হেলাল বলেছে, সিএনএফ টাওয়ারে চুরির ঘটনার আগের দিন নাছিরের ফোন পেয়ে ধোপাছড়ি থেকে নগরীতে আসে। তিনপুলের মাথায় মুসলিম হোটেলে একটি রুমে তাকে থাকতে দেয়া হয়। আসার সময় ব্যাগে ভরে চুরির সরঞ্জাম রেঞ্চ, একটি ছোট আকারের লোহার রড, দুটি স্ক্রু ড্রাইভার নিয়ে আসে। গ্রাম থেকে লুঙ্গি শার্ট পরে আসা হেলালকে রিয়াজউদ্দিন বাজার থেকে ৩৫০ টাকা দিয়ে একটি শার্ট ও ৬০০ টাকা দিয়ে প্যান্ট কিনে দেয় মামা।

হেলাল বলেছে, সিএন্ডএফ টাওয়ারের চুরির ঘটনায় সে ছাড়াও তার মামা নাছির, কুমিল্লার উত্তর বেতিয়ার মৃত আবুল বশরের ছেলে জামাল হোসেন অংশ নিয়েছিল। হেলাল বাইরে পাহারায় ছিল। ওই ভবনের দুটি অফিসে প্রায় দেড় ঘণ্টা ধরে তারা চুরি করে ব্যাগভর্তি টাকা নিয়ে বের হয়। চুরির টাকা থেকে ১৫০০ টাকা দিয়ে হেলালকে ধোপাছড়ি চলে যেতে বলে নাছির। সিএন্ডএফ টাওয়ারে চুরির ঘটনার পর থেকে নাছির আত্মগোপনে আছে।

পুলিশ ও স্থানীয় সূত্র জানায়, নিতান্ত দরিদ্র পরিবারের সন্তান বদিউল হক ওরফে নাছির দ্বিতীয় শ্রেণী পর্যন্ত পড়ালেখা করে চন্দনাইশের ধোপাছড়ি বাজারে একটি চা দোকানে কাজ নেন। প্রায় ১০ বছর বিভিন্ন চা দোকানে কাজ করার পর ১৯৯৬ সালের দিকে চট্টগ্রাম শহরে আসেন।

চট্টগ্রাম নগরীতে এসে নাছির ষোলশহর রুবি গেইট এলাকায় একটি ভাসমান চা দোকান দেন। সেখানে সন্ত্রাসীদের সঙ্গে তার পরিচয় হয়। এরপরই মূলত উত্থান ঘটে নাছিরের। একের পর এক অপরাধমূলক কর্মকান্ডে জড়িয়ে নাছির হয়ে উঠেন চট্টগ্রাম নগরীর ভয়ংকর ও দুর্ধর্ষ চোর দলের মূল নিয়ন্ত্রক।

ধোপাছড়ি ইউনিয়নের চেয়ারম্যান ধোপাছড়ি ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মোর্শেদুল আলম জানান, নাছিরকে তিনি খুব একটা বেশি চিনেন না। তবে সে নিয়মিত এলাকায় থাকে না। মাঝে মাঝে আসে।