বুধবার, ২১ নভেম্বর ২০১৮

অন্ধকার ছেড়ে ওরা আলোর পথে

প্রতিনিধি, কক্সবাজার

প্রকাশিত: ২১ অক্টোবর ২০১৮ রবিবার, ০৯:০৫ এএম

অন্ধকার ছেড়ে ওরা আলোর পথে

কক্সবাজারের সাগরদ্বীপ মহেশখালীতে শনিবার স্বরাষ্টমন্ত্রীর হাতে অস্ত্র তুলে দিয়ে অন্ধকার ছেড়ে আলোর পথে ফিরলেন মহেশখালী ও কুতুবদিয়া এলাকার ৪৩ দস্যু । তারা পৃথক ছয়টি বাহিনীতে এতদিন দাপিয়ে বেড়াত সাগর-উপকূলে। স্থানীয় মহেশখালী উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে এই আত্মসমর্পণ অনুষ্ঠানে স্বাক্ষী থাকল ১০ হাজার মানুষ।

সবার সামনে দাঁড়িয়ে মহেশখালীর সোনাদিয়ার জলদস্যু ‘আঞ্জু বাহিনী’র প্রধান আঞ্জু মিয়া সিকদার বললেন, ‘সাগরে অনেক অপরাধ করেছি। অনেক মায়ের বুক খালি করেছি। এ জগৎ অন্ধকারের জগৎ।’

৯৪টি অস্ত্র ও গোলাবারুদ তুলে দিয়ে একে একে ৪৩ জন জলদস্যু আত্মসমর্পণ করেন। আঞ্জু মিয়ার মতো জলদস্যুরা অতীতের অপকর্ম ভুলে সুস্থ ও স্বাভাবিক জীবনযাপনের অঙ্গীকার করেন। পাশাপাশি এখনো যাঁরা সাগরে অপকর্ম করছেন, তাঁদেরও এই সুযোগ গ্রহণের আহ্বান জানান তাঁরা।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান দস্যুদের হাত থেকে অস্ত্রগুলো গ্রহণ করেন। এ সময় সঙ্গে ছিলেন র্যা বের মহাপরিচালক বেনজীর আহমেদ।

সমুদ্রে মৎস্যজীবীদের মাছধরা নিরাপদ এবং এলাকার সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি শান্ত রাখতে র‌্যাব-৭ জলদস্যুদের আত্মসমর্পণের এই কর্মসূচির আয়োজন করে। সকাল থেকে উপজেলার বিভিন্ন উপকূল থেকে নারী-পুরুষ দল বেঁধে সমাবেশস্থলে আসতে থাকে। বেলা সাড়ে ১১টার দিকে বিশাল মাঠ ভরপুর হয়। লোকজনের নজর ছিল জলদস্যুদের দিকে। তারা দস্যুমুক্ত মহেশখালী চায়।
সকালে ঢাকা থেকে বিমানে কক্সবাজারে আসেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। এরপর কক্সবাজার থেকে হেলিকপ্টারে তিনি যান মহেশখালীতে।

স্বাগত বক্তব্যে র‌্যাব-৭-এর অধিনায়ক লে. কর্নেল মিফতাহ উদ্দিন আহমেদ বলেন, এই সমাবেশে মহেশখালী ও কুতুবদিয়া উপকূলের ৬টি বাহিনীর ৪৩ জন জলদস্যু আত্মসমর্পণ করেন। তাঁরা জমা দিয়েছেন ৯৪টি আগ্নেয়াস্ত্র ও ৭ হাজার ৬৩৭টি গোলা । লে. কর্নেল মিফতাহ বলেন, ২০০৪ সাল থেকে র্যা ব মহেশখালী-কুতুবদিয়াসহ কক্সবাজার অঞ্চলে ১৮৭টি অভিযান চালিয়ে ২০৮ জলদস্যু ও অস্ত্রধারী সন্ত্রাসীকে গ্রেপ্তার করেছে। এ সময় উদ্ধার করা হয় দেশি-বিদেশি ৬৮২টি অস্ত্র ও ৭ হাজার ৯৯০টি গুলি। এ সময় র্যাবের সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধে ১১ জন দস্যু ও সন্ত্রাসী নিহত হয়। এর ফলে জলদস্যু ও সন্ত্রাসীরা অস্ত্রসহ আত্মসমর্পণে বাধ্য হয়েছে।

দুপুর ১২টায় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর হাতে একটি এসএমজি তুলে দেন মহেশখালীর সোনাদিয়ার জলদস্যু ‘আঞ্জু বাহিনী’র প্রধান আঞ্জু মিয়া সিকদার। তার বাহিনীর আরো ৯ সদস্য ২৪টি অস্ত্র ও ৩৫৪ রাউন্ড গুলিসহসহ আত্মসমর্পণ করেন  । এছাড়া কুতুবদিয়ার রমিজ বাহিনী প্রধান তার সহযোগীকে নিয়ে ৮ অস্ত্র ও ১২০ রাউন্ড গুলি, মহেশখালীর নুরুল আলম ওরফে কালা বদাবাহিনীর প্রধান আলম তার ৬ সদস্য নিয়ে ২৩ অস্ত্র ও ৩৩৩ রাউন্ড গুলি, জালালবাহিনীর প্রধান জালালসহ ১৫ সদস্য নিয়ে ২৫ অস্ত্র ও ৬ হাজার ৭৯৮ রাউন্ড গুলি, আইয়ুব বাহিনীর প্রধান আইয়ুব ৯ সদস্য নিয়ে ৯ অস্ত্র ও ৩৭ রাউন্ড গুলি, আলাউদ্দিন বাহিনীর প্রধান আলাউদ্দিন একটি অস্ত্র ও ৪ রাউন্ড গুলি নিয়ে আত্মসমর্পণ করে। অস্ত্রের মধ্যে রয়েছে এসএমজি, রিভলবার, দেশী বিদেশী একনলা বন্দুক, দেশী পিস্তল, দু’নলা ওয়ান শূটার গান, থ্রি কোয়ার্টার গান, ২২ বোর রাইফেল।

উপস্থিত জনসাধারণের উদ্দেশে দস্যুসম্রাট আঞ্জু মিয়া বলেন, ‘এখন অস্ত্রশস্ত্র জমা দিয়ে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসতে চাইছি।’ অন্য দস্যুদেরও তিনি এ পদাঙ্ক অনুসরণের আহ্বান জানান। মহেশখালী থানায় এই আঞ্জু মিয়ার বিরুদ্ধে হত্যা, অপহরণ, ডাকাতিসহ ১২টি মামলা রয়েছে।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান বলেন, ‘জলদস্যু ও সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কঠোর অবস্থানে আছে। তাদের সব সময় বলে আসছি, তোমরা স্বাভাবিক জীবনে চলে আসো। এখনো বলছি, যারা এখনো আত্মসমর্পণ করোনি, তারা দ্রুত আত্মসমর্পণ করো।

মন্ত্রী বলেন, যারা এখন আত্মসমর্পণ করেছে, তাদের প্রধানমন্ত্রীর তহবিল থেকে নগদ অর্থ সহায়তা দেওয়া হবে। জেলা প্রশাসকের উদ্দেশে মন্ত্রী বলেন, ‘যারা এখন আত্মসমর্পণ করেছে, তাদের খুন ও ধর্ষণ মামলা ছাড়া অন্য মামলাগুলোর বিষয়ে সহজভাবে দেখার ব্যবস্থা করবেন এবং আজ অস্ত্রসহ আত্মসমর্পণের মামলাটিও সহজভাবে দেখতে হবে। কিন্তু তারা (দস্যু) যদি আবারও ফিরে যায়, তাহলে কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না।’