শনিবার, ১৫ ডিসেম্বর ২০১৮

বাবরসহ ১৯ জনের মৃত্যুদণ্ড, তারেকের যাবজ্জীবন

প্রতিবেদক, ঢাকা

প্রকাশিত: ১১ অক্টোবর ২০১৮ বৃহস্পতিবার, ০৮:৪৬ এএম

বাবরসহ ১৯ জনের মৃত্যুদণ্ড, তারেকের যাবজ্জীবন

দীর্ঘ বিচারিক প্রক্রিয়া শেষে ১৪ বছর পর ২০০৪ সালের ২১ আগস্টের ভয়াল সেই গ্রেনেড হামলা মামলায় সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবর ও সাবেক উপমন্ত্রী আব্দুস সালাম পিন্টুসহ ১৯ আসামির ফাঁসির আদেশ দিয়েছেন ট্রাইব্যুনাল।

আর খালেদা জিয়ার বড় ছেলে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান, খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক সচিব হারিছ চৌধুরীসহ ১৯ জনকে দেওয়া হয়েছে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড।
বুধবার (১০ অক্টোবর) পুরান ঢাকার নাজিমুদ্দিন রোডের পুরাতন কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে অবস্থিত ঢাকার ১ নম্বর দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালের বিচারক শাহেদ নূর উদ্দিন এ রায় প্রদান করেন।

রাষ্ট্রপক্ষের কৌঁসুলি মোশারফ হোসেন কাজল বলেন, ‘প্রত্যেক আসামিই দণ্ডপ্রাপ্ত হয়েছেন। এর মধ্যে ১৯ জনকে ফাঁসির আদেশ দেওয়া হয়েছে।

২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলায় মোট আসামি ৫২ জন। তবে মামলা বিচারকালীন জামায়াত নেতা আলী আহসান মুহাম্মাদ মুজাহিদের মানবতা বিরোধী অপরাধের মামলায় এবং হরকাতুল জিহাদ নেতা মুফতি হান্নান ও শরিফ শাহেদুল ইসলাম বিপুলের ব্রিটিশ হাইকমিশনার আনোয়ার চৌধুরীর উপর হামলার মামলায় মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়ায় বর্তমানে আসামির ছিলেন ৪৯ জন।
২০০৪ সালের ২১ অগাস্ট গ্রেনেড হামলা চালিয়ে ২৪ জনকে হত্যার ওই ঘটনা পুরো বাংলাদেশকে স্তব্ধ করে দিয়েছিল।

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের পর ওই গ্রেনেড হামলার ঘটনা ছিল মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্ব দেওয়া দল আওয়ামী লীগের ওপর সবচেয়ে বড় আঘাত।

আজকের প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা সে সময় ছিলেন বিরোধী দলীয় নেতা। আর সেই সময়ের বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া এখন কারাগারে দুর্নীতি মামলার সাজা ভোগ করছেন।

দণ্ডবিধি ও বিস্ফোরক দ্রব্য আইনে দায়ের করা দুই মামলার রায় ঘোষণা করে বিচারক শাহেদ নূর উদ্দিন তার পর্যবেক্ষণে বলেছেন, ‘রাষ্ট্রযন্ত্রের সহায়তায়’ ওই হামলা ছিল দলকে ‘নেতৃত্বশূন্য করার ঘৃণ্য অপচেষ্টা’।

তিনি বলেন, “রাজনীতিতে অবশ্যম্ভাবীভাবে ক্ষমতাসীন দল ও বিরোধী দলের মধ্যে শত বিরোধ থাকবে। তাই বলে বিরোধী দলকে নেতৃত্বশূন্য করার প্রয়াস চালানো হবে? এটা কাম্য নয়।”
এ মামলার অভিযোগে বলা হয়, শেখ হাসিনাকে হত্যার উদ্দেশ্যে ২১ অগাস্ট বঙ্গবন্ধু এভিনিউয়ে ওই হামলা চালানো হয়। হামলায় অংশ নেয় হরকাতুল জিহাদ আল ইসলামী বাংলাদেশের (হুজি) জঙ্গিরা। তারা সহযোগিতা নেয় বিদেশি জঙ্গিদের। আর এই ষড়যন্ত্রের পেছনে ছিল তখনকার চারদলীয় জোট সরকারের শীর্ষ পর্যায়ের ‘ইন্ধন’। হামলায় ব্যবহৃত আর্জেস গ্রেনেড আনা হয় পাকিস্তান থেকে।

বিএনপি আমলে ওই হত্যাকাণ্ডের তদন্ত ভিন্ন খাতে নিতে নানা চেষ্টা হয়। হামলার পরপরই নষ্ট করে ফেলা হয় আলামত।

পরে ২০০৭ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময়ে নতুন করে তদন্ত শুরু হলে ‘প্রকৃত তথ্য’ বেরিয়ে আসতে থাকে। উদঘাটিত হয় ‘জজ মিয়া নাটক’।

বিএনপি বরাবরই অভিযোগ অস্বীকার করে বলে এসেছে, তাদের কেউ ওই হামলার সঙ্গে জড়িত ছিল না। বুধবার রায় ঘোষণার পর তা প্রত্যাখ্যান করে বিক্ষোভ সমাবেশ ও কালো পতাকা মিছিলের কর্মসূচি দিয়েছে দলটি।

বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, “বিএনপি মনে করে, এই রায় রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত, ক্ষমতাসীন সরকারের রাজনৈতিক প্রতিহিংসা চরিতার্থ করার নগ্ন প্রকাশ। আমরা এই ফরমায়েশি রায় প্রত্যাখ্যান করছি।”

এ মামলায় মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামি সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবর রায়ের পর সাংবাদিকদের সামনে বলেছেন, তাকে ‘ফাঁসিয়ে দেওয়া’ হয়েছে।

আর আসামিপক্ষের অন্যতম আইনজীবী সানাউল্লাহ মিয়া এই রায়কে ‘অন্যায় ও বেআইনি’ আখ্যায়িত করে আপিল করার কথা বলেছেন।   

আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের বলেছেন, এই রায়ে তারা ‘অখুশি নন’, কিন্তু ওই হামলার ‘মাস্টারমাইন্ড’ তারেক রহমানের সর্বোচ্চ সাজা না হওয়ায় তারা ‘পুরোপুরি সন্তুষ্ট’ নন।

অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম এবং আইনমন্ত্রী আনিসুল হক বলেছেন, পুরো রায় দেখে তারা আপিলের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবেন।

দুই মামলায় মোট ৫২ আসামির বিচার শুরু হলেও অন্য মামলায় তিনজনের ফাঁসি কার্যকর হওয়ায় বুধবার রায় এসেছে মোট ৪৯ আসামির। অপরাধ প্রমাণিত হয়েছে জানিয়ে তাদের সবাইকেই সাজা দিয়েছেন বিচারক।

এই ৪৯ আসামির মধ্যে আটজন রাজনৈতিক নেতা, পাঁচজন সামরিক বাহিনীর সদস্য এবং আট জন পুলিশের সাবেক কর্মকর্তা। বাকি ৩১ জন হরকাতুল জিহাদের জঙ্গি।
হত্যা মামলায় তাদের সবার নাম থাকলেও বিস্ফোরক আইনের মামলায় তাদের মধ্যে ৩৮ জন আসামি ছিলেন।

বাবর, পিন্টুসহ এ মামলার ৩১ আসামিকে রায়ের জন্য সকালে গাজীপুরের কাশিমপুর কারাগার থেকে ঢাকার নাজিমউদ্দিন রোডের পুরনো কেন্দ্রীয় কারাগার সংলগ্ন একটি ভবনে দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালের বিশেষ এজলাসে নিয়ে আসা হয়। রায়ের পর আবার তাদের ফিরিয়ে নেওয়া হয় কারাগারে।

এর আগে দুই মামলায় সাত ও দশ বছর কারাদণ্ডের রায় মাথায় নিয়ে লন্ডনে বসবাসরত তারেক রহমানসহ ১৮ জনকে পলাতক দেখিয়েই এ মামলার বিচার কাজ চলে।

মৃত্যুদণ্ড প্রাপ্ত অন্য আসামিরা হলেন, মওলনা মো: তাজউদ্দিন (পলাতক), শেখ আব্দুস সালাম, মো: আব্দুল মাজেদ ভাট ওরফে মো: ইউসুফ ভাট,  আব্দুল মালেক গেলাম মোহাম্মদ ওরেফে জিএম, মওলানা শওকত ওসমান ওরফে শেখ ফরিদ, মহিবুল্লাহ ওরফে মুফিজুর রহমান ওরফে অভি, মওলানা আবু সাঈদ ওরফে ডাক্তার জাফর, আবুল কালাম আজাদ ওরফে বুলবুল, মো. জাহাঙ্গীর আলম, হাফেজ মওলানা আবু তাহের, হোসাইন আহম্মেদ তামিম, মঈনদ্দিন শেখ ওরফে মুফতি মঈন ওরফে খাজা ওরফে আবু জানদাল ওরফে মাসুম বিল্লাহ, মো: রফিকুল ইসলাম ওরফে সবুজ, খালেদ সাইফুল্লাহ ওরফে শামীম ওরফে রাশেদ, মো. উজ্জল ওরফে রতন, মেজর জেনারেল (অব) রেজ্জাকুল হয়দার চৌধুরী, বিগ্রেডিয়ার জেনারেল আব্দুর রহিম, মো: হানিফ (হানিফ পরিবহনের মালিক)।

যাবজ্জীবন দন্ডপ্রাপ্তরা হলেন : বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান, খালেদা জিয়ার সাবেক রাজনৈতিক সচিব হারিছ চৌধুরী, বিএনপির সাবেক এমপি কাজী শাহ মোফাজ্জল হোসেন কায়কোবাদ , বিএনপির সাবেক ওয়ার্ড কমিশনার আরিফুল ইসলাম আরিফ , হরকাতুল জিহাদ নেতা আব্দুল হান্নান ওরফে সাব্বির , হাফেজ মাওলানা ইয়াহিয়া , মাওলানা আব্দুর রউফ ওরফে পীর সাহেব , মো. খলিল , মুফতি শফিকুর রহমান, মুফতি আব্দুল হাই ,বাবু ওরফে রাতুল বাবু ,শাহাদত উল্যাহ ওরফে জুয়েল, আরিফ হাসান সুমন, মহিবুল মুত্তাকিন ওরফে মুত্তাকিন,  আনিসুল মুরছালিন ওরফে মুরছালিন, জাহাঙ্গীর আলম বদর, মো. ইকবাল, আবু বকর ওরফে হাফেজ সেলিম হাওলাদার, লিটন ওরফে মাওলানা লিটন