ঢাকা, মঙ্গলবার, ১৬ অক্টোবর ২০১৮

কথা রাখেনি সেই চিংড়ি জামাই

প্রতিনিধি, আনোয়ারা

প্রকাশিত: ০৫ অক্টোবর ২০১৮ শুক্রবার, ১২:৩১ পিএম

কথা রাখেনি সেই চিংড়ি জামাই

আনোয়ারায় বিয়ের খাবারে চিংড়ি না পেয়ে তুলকালাম ঘটানো সেই চিংড়ি জামাই কথা রাখলেন না। গত ২৭ সেপ্টেম্বর (বৃহস্পতিবার) বিয়ের প্রীতিভোজের পর উদ্ভুত পরিস্থিতিতে সোমবার (১ অক্টোবর) সালিশি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে সিদ্ধান্ত হয় শুক্রবার (৫ অক্টোবর) নববধুকে ঘরে তুলে নেবেন এবং মেয়ের ভবিষ্যৎ জীবনের নিরাপত্তায় ৩ লাখ টাকার ব্যাংক ডিপোজিট করে দেবেন।

বৃহস্পতিবারের (৪ অক্টোবর) মধ্যে ব্যাংক হিসাব খুলে শুক্রবার নববধুকে নিয়ে যাওয়ার কথা ছিল। শেষ পর্যন্ত কোনটাই হয়নি।

এদিকে বরপক্ষের কথা না রাখা ও নানামুখি চাপে মানসিক ভাবে ভেঙ্গে পড়েছেন কনের পিতা মোহাম্মদ হোসেন। শুক্রবার সকালে সারাবেলাকে তিনি বলেন , এসব আর ভাল লাগছে না। তারা আমার মেয়ের জীবন নিয়ে তামাশা করছে। ছেলের বাবা জানিয়েছে সালিশি বৈঠকের সেই সব নিরাপত্তা ডিপোজিট দেয়া সম্বব নয়। এমনিতে মেয়ে তুলে দিলে আনব। নয়ত আনব না। এখন আমি কী করব বুঝে উঠতে পারেছি না। অবস্থা তিনি বলেন, তারা (ছেলে পক্ষ) কথা দিয়ে কথা রাখছে না। এখন মনে হচ্ছে বিয়েটা ভাঙ্গাভাঙ্গি হয়ে গেলেই আমার মেয়ের জন্য মঙ্গল।

ঘটনার শুরু যেভাবে :
গত ২৭ সেপ্টেম্বর আনোয়ারা উপজেলার ১১নং জুইদন্ডী ইউনিয়নের ৮নং খুরসকুল গ্রামের হাজী বাড়ীর আবদুল মোনাফের ছেলে মোহাম্মদ আলমগীর (৩০) সাথে একই ইউনিয়নের জুইদন্ডি গ্রামের মোহাম্মদ হোসেনের মেয়ের বিয়ে অনুষ্ঠানের আয়োজন ছিল।  এর ১৮ দিন আগে ইসলামী শরিয়ত মতে তাদের আকদ সম্পন্ন হয়।  বটতলী আলভী ম্যারেজ গার্ডেনে প্রীতিভোজের আয়োজন ছিল।

মধ্যপ্রাচ্যের আমিরাত প্রবাসী বরের চাওয়াকে প্রাধান্য দিয়ে কনেপক্ষ ৫শ’ বরযাত্রীসহ প্রায় ৮শ’ লোকের প্রীতিভোজের আয়োজন করে। মুরগির রোস্ট, কোরমাসহ নানা উপাদেয় আইটেমে ভোজের আয়োজন করা হয়। কিন্তু খাবার আয়োজনে চিংড়ি মাছ না থাকায় বাকবিতন্ডায় জড়ায় বর আলমগীর। এক পর্যায়ে তা গড়ায় হাতাহাতিতে। পরে পুলিশ এসে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রনে আনে। বিষয়টি সামাজিক মাধ্যমে ভাইরাল হলে তা নিয়ে সমালোচনার ঝড় উঠে।

বিয়ের আয়োজনে যা ছিল :
বরের চাচা শেয়ার আলী সারাবেলাকে জানান, বিয়েতে সাড়ে ৩শ’ বরযাত্রী যাওয়ার কথা ছিল। বিয়ের ক্লাবে বর আলমগীরের উচ্ছৃংখল আচরণের পর অনেকে না খেয়ে চলে গেছে।আমরা খরচ কমানোর জন্য কনে পক্ষকে বলেছিলাম খোরমা না করে ছোট আকারে চিংড়ি দেওয়ার জন্য। পরে শুনেছি তারা গরু কিনে খোরমাসহ খাবারের আয়োজন করে।  আসলে বাইরে থেকে কয়েকজন ফোন করে খাবারের বিষয়ে উল্টাপাল্টা কথা বলায় ছেলে খারাপ আচরণ করে। তার এমন আচরণের জন্য তিনি ক্ষমা চান।

কনের নানা আহমদ শফি সারাবেলাকে জানান, অনেক আশা নিয়ে নাতনির বিয়ে ঠিক করেছিলাম। দুই পক্ষে ৮শ’ লোকের খাবারের আয়োজন ছাড়াও ৬২ হাজার টাকার ফার্নিচারসহ অনুষঙ্গিক অন্যান্য উপহার সামগ্রি দেওয়া হয়। ছেলে পক্ষও আড়াই তোলা স্বর্ণালংকারসহ অন্যান্য উপহার পাঠায়। প্রীতিভোজের দিন বর উত্তেজিত হয়ে বলেছিল-আজিয়া লই যাইয্যুম, হালিয়া ছাড়ি দিয়্যুম” (আজ নিযে যাব, কাল ছেড়ে দেব)। তার এই কথা কারো পছন্দ হয়নি। তাই ওই দিন নাতনিকে তুলে দেই নি। শেষ পর্যন্ত সুন্দর সমাধান হয়েছে।

সালিশি বৈঠক
বিয়ের প্রীতিভোজে চিংড়ি ইস্যুতে বরের আচণের পর গত ১ অক্টোবর স্থানীয় বটতলী রুস্তমহাটে দু’পক্ষের অন্তত ৩০ জন আত্মীয় স্বজনের উপস্থিতিতে সালিশি বৈঠক হয়। বৈঠকে রুস্তমহাটে স্থানীয় বটতলী ইউপি চেয়ারম্যান ও উপজেলা আওয়ামীলীগ সভাপতি অধ্যাপক আবদুল মান্নান চৌধুরী এবং বরুমছড়া ইউপি চেয়ারম্যান শাহাদাত হোসেন চৌধুরী ছাড়াও  বরের পিতা আবদুল মোনাফ, চাচা শেয়ার আলী, কনের বাবা মোহাম্মদ হোসেন, নানা আহমদ শফি, আওয়ামীলীগ নেতা নুরুল ইসলাম, আলমগীর আজাদ, জসিম উদ্দিন, মোহাম্মদ বাবু, বিয়ের মধ্যস্থতাকারী নুরুল ইসলাম উপস্থিত ছিলেন।

বৈঠকে সিদ্ধান্ত হয়, কনের ভবিষ্যৎ আরো নিরাপদ করতে কনেকে তুলে নেওয়ার আগে তার নামে ৩ লাখ টাকা ফিক্সড ডিপোজিট করে দেবে বরপক্ষ। এছাড়া ৭ লাখ টাকার দেনমোহর ও ৮০ হাজার টাকা উসুল দেওয়ার পুর্বের সিদ্ধান্তও বলবৎ থাকবে ।

বৈঠক সুত্র জানায়, দুই পক্ষের আলোচনার পর বিয়ে অনুষ্ঠানে অনাকাংখিত আচরণের জন্য ক্ষমা চান বর মোহাম্মদ আলমগীর। কনের পিতা মোহাম্মদ হোসেন সব ভুলত্রুটি ভুলে মেয়ে জামাই আলমগীরকে বুকে টেনে নেন।

বৈঠকের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী বৃহস্পতিবারের মধ্যে ফিক্সড ডিপোজিটের পর শুক্রবার (৫ অক্টোবর) নববধুকে ঘরে তুলে নেওয়ার কথা ছিল। কিন্তু শুক্রবার দুপুর পর্যন্ত বরপক্ষ আগের সিদ্ধান্তে সাড়া না দিয়ে উল্টো পিছটান দেয় বলে জানা গেছে।

সালিশকার-রা যা বলবেন :
বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন স্থানীয় বরুমছড়া ইউপি চেয়ারম্যা শাহাদাত হোসেন চৌধুরী । সারাবেলাকে তিনি বলেন, পূর্ব সিদ্ধান্ত অনুযায়ী শুক্রবার বউ ঘরে তুলে নেওয়ার কথা ছিল। তারা সেই সিদ্ধান্ত না মেনে খুব অন্যায় করেছে। বর্তমানে বঙ্গবন্ধুর মাজার জেয়ারতে টুঙ্গিপাড়া আছেন জানিয়ে বলেন, সেখান থেকে ফিরেই তিনি এ ব্যাপারে ব্যবস্থা নেবেন।

বরপক্ষের প্রতিবেশী স্থানীয় জুইদন্ডি ইউনিয়ন আওয়ামীলীগ সাধারণ সম্পাদক জসিম উদ্দিন সারাবেলাকে জানান, সালিশি বৈঠকের সিদ্ধান্ত অমান্য করার সুযোগ নেই। তাদের আমি ব্যক্তিগতভাবে অনুরোধ করেছি অন্তত লাখ দু’য়েক টাকা হলেও যোগাড় করে যেন মেয়ের বাবার কাছে যায়। প্রয়োজনে বাকী টাকা পরিশোধের জন্য সময় নিতে পারত। তা না করে তারা আরো একটি অপরাধ করল।

কনেপক্ষের আত্মীয় মোহাম্মদ সালাউদ্দিন সারাবেলাকে বলেন, ছেলের পিতার আগের কথা আর এখনের কথার মিল নাই। তারা প্রতিশ্রুতি অনযায়ী মেয়েকে তুলে না নিলে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

বিয়ের মধ্যস্থতাকারী নুরুল ইসলাম সারাবেলাকে জানান, বরপক্ষের হাতে নগদ টাকা নাই সেটা সত্য। কিন্তু কনে পক্ষের হাতে পায়ে ধরে কীভাবে সমাধান করা যায় সে উপায় বর আলমগীর ও তার পিতাকে বের করতে হবে।

কনেপক্ষ ও বরপক্ষের বক্তব্য :
কনের পিতা মোহাম্মদ হোসেন বলেন, ‘আমি চোখের সামনে কোন পথ দেখছি না। শুক্রবার মেয়েকে ঘরে নিয়ে যাবে বলেও তারা কথা রাখেনি। আমি এর সুষ্ঠু বিচার চাই’।

এ ব্যাপারে বরের পিতা আবদুল মোনাফের মোবাইলে কয়েক দফা ফোন করা হলেও সেটা বন্ধ পাওয়া যায়। বর মোহাম্মদ আলমগীরের মোবাইলে ফোন করলে তিনি লাইন কেটে দেন। ফলে তাদের ব্কত্য জানা সম্ভব হয়নি।