শুক্রবার, ১৯ অক্টোবর ২০১৮

এমন চিকিৎসকও আছেন !

সারাবেলা প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ১৭ জুলাই ২০১৮ মঙ্গলবার, ১০:৫৭ পিএম

এমন চিকিৎসকও আছেন !

১৩১৩ শয্যার চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ(চমেক)হাসপাতালে রোগী থাকছে ৩ হাজারের বেশি। চট্টগ্রামসহ কক্সবাজার থেকে লক্ষীপুর পর্যন্ত বিশাল এই এলাকার প্রায় ২ কোটি মানুষের চিকিৎসা সেবায় সবচেয়ে বড় ভরসাস্থল এই হাসপাতালে জটিল রোগের চিকিৎসায় আইসিইউ বেড আছে মাত্র ১২টি। তার মধ্যে আবার পাঁচটি নষ্ট।

যে কারণে উচ্চ মধ্যবিত্ত, মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত এমনকি অজ্ঞাত শ্রেণির মুমূর্ষু রোগীদের আইসিইউ পাওয়াটা সোনার হরিণের চেয়েও দুর্লভ। বেসরকারি হাসপাতালগুলোতে আইসিইউতে ভর্তির দিন দিতে হয় ৫০ হাজার টাকা। এরপর প্রতিদিন ৩০ হাজার টাকা।

এদিকে জটিল রোগের চিকিৎসায় আইসিইউর অভাবে অনেক সময় রোগীদের ঠিক মত সেবা দেওয়া সম্ভব হয় না। এক্ষেত্রে হার্টফেইলর রোগীদের শ্বাসকষ্টের চিকিৎসায় বেগ পোহাতে হয় বেশি।

আইসিইউ নিয়ে যখন এই জটিল হিসাব-নিকাশ তখন চমেক হাসপাতালের এক চিকিৎসক নিজের উদ্যোগে নিয়ে এসেছেন বিকল্প ‘বাইপেপ’ মেশিন। হাসপাতালের হৃদরোগ চিকিৎসক ইকবাল মাহমুদ তার ওয়ার্ডে প্রতিদিনই হার্ট ফেইলর রোগীদের চিকিৎসা দেন। শ্বাস কষ্টে ভোগা হার্ট ফেইলর রোগীদের আইসিইউ ছাড়া চিকিৎসা দেওয়া কঠিন ।

রোগীদের কষ্ট দেখতে দেখতে ডা.ইকবাল মাহমুদের ব্যাকুল মন নিজ তাগিদে এক বন্ধুর সহযোগিতায় কিনে নেন মেশিনটি। গত বৃহস্পতিবার চমেক হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা এক মৃত্যুপথযাত্রী রোগীকে বাইপেপের মাধ্যমে সেবা দিয়ে সারিয়ে তুলেছেন। একান্ত নিজের উদ্যোগে ডা. ইকবালের এই উদ্যেগ প্রশংসিত হয়েছে বিভিন্ন মহলে।

এ প্রসঙ্গে ডা. ইকবাল মাহমুদ বলেন, কার্ডিওলজি ওয়ার্ডে আসার পর হার্ট ফেইলরের রোগীদের শ্বাস কষ্ট দেখলে মনে হয় এখানকার রোগীদের সবচেয়ে বড় কষ্ট হচ্ছে মায়াময় এই পৃথিবীতে বুক ভরে শ্বাস নিতে না পারা। নিজে আইসিইউতে দীর্ঘদিন কাজ করার কারণে বারবার মনে হত,যদি এসব রোগীদের জন্য বিকল্প যান্ত্রিক শ্বাসের ব্যবস্থা করা যেত! তাহলে অনেক হার্ট ফেইলর, রেসপিরেটরী ফেইলরের রোগীর শ্বাসকষ্ট কম হত ।রোগী তাড়াতাড়ি উন্নতি করত।

এক্ষেত্রে বাইপেপ মেশিন একটি কার্যকরী সমাধান হলেও নিজের পক্ষে এতগুলো টাকা যোগান দেয়া কঠিন ছিল। অবশেষে এক বড় ভাইয়ের সহযোগিতায় মেশিনটি কিনে নিলাম, শুধুমাত্র অসহায় রোগীদের সেবা করার জন্য। চমেক কার্ডিওলজি বিভাগে এখন বাইপেপ মেশিন আছে।হার্ট ফেইলরের রোগীদের কষ্ট কিছুটা হলেও কমবে, ভাবতে মন ভালো হয়ে যায় ।

নিজের ভাল লাগার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, গত বৃহস্পতিবার সকালের ডিউটিতে একজন অজ্ঞান রোগী আসেন প্রচন্ড শ্বাস কষ্ট নিয়ে। যার অক্সিজেনের মাত্রা ছিল ৪৮%( স্বাভাবিক ৯৫% এর বেশি)। রোগী দেখে বুঝলাম শ্বাসকষ্টজনিত কারণে ব্রেনে বিষাক্ত কার্বন ডাই অক্সাইড( রোগীর ১৩০,স্বাভাবিক ৪০ এর নীচে) জমে রোগী অজ্ঞান।পুরোপুরি অজ্ঞান অবস্থায় বাইপেপ মেশিনের ব্যবহার নিয়ে বিতর্ক থাকায় আইসিইউতে কল পাঠাই। যথারীতি সিট খালি ছিল না। রোগীর স্বজনদের জানালাম বাইরের কোন আইসিইউতে ট্রান্সফার করার জন্য। তাদের সেই সামর্থ্য না থাকায় বাধ্য হয়ে আমার সদ্য কেনা বাইপেপ মেশিনটা লাগালাম। ৬ ঘন্টার মধ্যে রোগীর পুরোপুরি জ্ঞান ফিরে আসে। কিছুটা শ্বাস কষ্ট ছিল,কিন্তু এই রোগীকে দেখে বুঝার উপায় ছিল না যে তিনি মরতে মরতে বেঁচে গেছেন।

সোমবার যখন ডিসচার্জ লিখি,রোগীর ছেলের চোখে মুখে কৃতজ্ঞতা।

সোমবার চিকিৎসা দেওয়া আরেক রোগীর অভিজ্ঞতা তুলে ধরে বলেন, তিন দিন আগে হার্ট ফেইলর নিয়ে সিসিইউতে ভর্তি ছিলেন। প্রচন্ড শ্বাস কষ্ট,ফুসফুসে পানি, অক্সিজেন সেচুরেশন ৫২%ছিল।বিভাগের সিনিয়ররা রাউন্ডে বলছিলেন আইসিইউতে পাঠাতে । কিন্তু সেখানে সিট খালি ছিল না। এরপর রোগীকে বাইপেপ লাগানো হলো । ধীরে ধীরে শ্বাস কষ্ট কমতে থাকে। রোগীর অক্সিজেন ও স্বাভাবিক হয়ে আসে।

ডা. ইকবাল মাহমুদের নিজের উদ্যোগে সংযোজন করা বাইপেপ মেশিনটি চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে এর মধ্যে বাঁচিয়ে দিয়েছে কয়েক প্রাণ। আর মানবিক চিকিৎসক হিসাবে ছড়িয়ে পড়ছে ডা. ইকবাল এর সুনাম। বিনয়ী ও প্রচার বিমুখ ডা. ইকবাল নিজে অবশ্য এর কৃতিত্ব নিতে রাজী নন। তিনি বলেন বাঁচা-মরার মালিক আল্লাহ। হার্ট ফেইলিওর রোগীরা যখন শ্বাস কষ্টে ছটফট করতে থাকেন ‘বাইপেপ’ তাদের শ্বাস যোগায়।একজন রোগীকে বুক ভরে শ্বাস নেওয়ার সুযোগ করে দেওয়ার চেয়ে বড় তৃপ্তি আর কী হতে পারে !