শুক্রবার, ১৯ অক্টোবর ২০১৮

আনোয়ারায় হাতি-মানুষের লড়াই !

আনোয়ারা প্রতিনিধি

প্রকাশিত: ১৩ জুলাই ২০১৮ শুক্রবার, ১১:২৮ পিএম

আনোয়ারায় হাতি-মানুষের লড়াই !

আনোয়ারার দেয়াং পাহাড় ও আশপাশের এলাকায় ৬ বছর ধরে চলছে বন্য হাতি আতংক। চুনতি অভয়ারন্য থেকে বাঁশখালীর পাহাড়ি এলাকা হয়ে আনোয়ারায় ঢুকে তান্ডব চালায় বন্য হাতির দল। সবশেষ শুক্রবার উপজেলার বৈরাগ ইউনিয়নের মোহাম্মদপুর গ্রামে হাতির আক্রমনে মারা গেছে আবদুর রহমান (৭০) নামে এক বৃদ্ধ। তার তিন আগে চাঁপাতলি গ্রামে হাতির হামলায় আহত হয় আরেক মহিলা। 

প্রতি বছরই পথ হারিয়ে বন্য হাতির পাল হানা দিলেও এবার সবচেয়ে দীর্ঘ সময় ধরে হাতিগুলো দেয়াঙ পাহাড়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে। হাতিগুলো তাড়াতে আধুনিক কোন প্রযুক্তি না থাকায় বনবিভাগ ও স্থানীয় প্রশাসন আজ শনিবার মোহাম্মদপুর গ্রামে উপজেলার বিভিন্ন গ্রামের লোকজনকে নিয়ে পাহাড় ঘেরাও করে হাতি তাড়ানোর চিন্তা করছে।

জানা যায়, শুক্রবার মোহাম্মদপুরে বৃদ্ধ আবদুর রহমানের মৃত্যুর ঘটনার আগে কয়েক বছরে মারা গেছে আরো ২ জন। গত বছর কর্নফুলীর বড়উঠান গ্রামের খিলপাড়ায় হাতির আক্রমনে জালাল আহমদ নামের এক বৃদ্ধের মৃত্যু হয়। এর আগে ২০১২ সালেও এই গ্রামের মরিয়ম আশ্রম এলাকায় হাতির পাযে পিষ্ট হয়ে জুয়েল দাশ নামে এক স্কুল ছাত্রের মৃত্যু হয়েছিল।

বনবিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, চুনতি অভয়ারণ্যে ৪২টি ও আশপাশের পাহাড়ি এলাকা মিলিয়ে ৪৭টি বন্য হাতি রয়েছে এই অঞ্চলে। এই হাতিগুলোর মধ্য থেকে কোন কোনটি পথ হারিয়ে প্রতি বছর আনোয়ারায় ঢুকে পড়ছে।

এবার মারা গেল ৭০ বছরের বৃদ্ধ :


মোহাম্মদপুর গ্রামে এবার হাতির আক্রমনে মারা গেছে এক বৃদ্ধ। কয়েক দিন আগে উপজেলা চাপাতলি গ্রামে একইভাবে হাতির আক্রমনের শিকার হন এক মহিলা। উপজেলার বৈরাগ ইউনিয়নের মুহাম্মদপুর গ্রামে শুক্রবার ভোর রাতে ফজরের নামাজ পড়তে যাওয়ার সময় বন্য হাতির আক্রমনে মারা যান আবদুর রহমান (৭০) । তিনি স্থানীয় মৃত আলতাফ আলীর পুুত্র ।

স্থানীয়রা জানায়, প্রতিদিনের জন্য নামাজ আদায়ের জন্য ঘর থেকে বের হন মোহাম্মদপুর গ্রামের আবদুর রহমান। কয়েক দিন ধওে দেয়াং পাহাড়ে বিচরণ করা হাতি দু’টি আচমকা তার সামনে পড়ে যায়। এক পর্যায়ে হাতিগুলো তাঁকে টেনে নিয়ে আছাড় মারে । এতে মারাত্মক আহত হন তিনি। তাঁকে উদ্ধার করে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হলে কর্তব্যরত চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন। এ ঘটনায় এলাকায় ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।

এলাকাবাসীর অভিযোগ, গত দুই সপ্তাহে হাতি দুটি উপজেলার বৈরাগ ইউনিয়নের মোহাম্মদপুর, কুলালপাড়া ও ফকিরখীল, বারশত ইউনিয়নের পশ্চিমচাল, বারখাইন ইউনিয়নের বেলচূড়া, বটতলী ইউনিয়নের চাঁপাতলী, জয়নগরপাড়া, কালাগাজীপাড়া ও গুচ্ছগ্রাম এলাকার ১০-১২টি কাঁচাঘর গুঁড়িয়ে দিয়েছে। এলাকার খেতখামার ও জমির ফসল ক্ষতি করছে। দেয়াঙ পাহাড়ে হাতির অবস্থান সম্পর্কে বন বিভাগকে জানানো হলেও কোনো ব্যবস্থা নেয়নি তারা।

বৈরাগ ইউনিয়নের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ সোলায়মান বলেন, গত কয়েক দিনে এলাকার কয়েক লাখ টাকার ক্ষতি হয়েছে। বন বিভাগ কর্মকর্তারা প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিলে এভাবে মানুষের মৃত্যু হতো না। বর্তমানে এলাকার মানুষ হাতির আতঙ্কে নির্ঘুম রাত কাটাচ্ছেন।

বন বিভাগের পটিয়া রেঞ্জ কর্মকর্তা মো. সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘আমরা বৃহস্পতিবার সারা রাত এলাকায় ছিলাম। এরপরও ভোররাতে এক ব্যক্তি হাতির হামলায় মারা গেছেন। হাতির আক্রমণে নিহত ব্যক্তির পরিবারকে এক লাখ টাকা ও আহত মহিলাকে ৫০ হাজার টাকা আর্থিক অনুদান দেওয়া হবে বলে জানান তিনি। বাঁশখালী বা চুনতির পাহাড়ি এলাকা থেকে পাহাড় থেকে দু’সপ্তাহ আগে দেয়াং পাহাড়ে অবস্তান নেওযা দু’টি বন্য হাতি লোকালয়ে এসে তান্ডব চালাচ্ছে বলে তিনি জানান।

স্থানীয় ইউপি সদস্য মো. সাদ্দাম হোসেন বলেন, আমরা প্রতিদিন হাতির আক্রমনের ভয়ে ঘুমাতে পারিনা। প্রতিরাতে পাহারা দিতে হয়। কাল রাতেও স্থানীয় লোকজন পাহারায় ছিল। বনবিভাগ হাতিগুলো দ্রুত তাড়ানোর ব্যবস্থা না করে মানুষের আরো ক্ষতি হবে।

প্রশাসনের বেঠক :

এদিকে হাতির আক্রমনে এক ব্যক্তির মৃত্যুর পর শুক্রবার বিকালে জরুরী সভা করে উপজেলা প্রশাসন। দুই ঘন্টাব্যাপী এই সভায় হাতি তাড়ানোর নানা কলা কৌশল ও আজ শনিবার মোহাম্মদপুর গ্রামবাসীকে নিয়ে বৈঠকের সিদ্ধান্ত হয়। এতে উপজেলা উপজেলা প্রশাসনের কর্মকর্তারা ছাড়াও স্থানীয় চেয়ারম্যান, থানা প্রশান, বন বিভাগ ও সাংবাদিক প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।

আনোয়ারা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা দুলাল মাহমুদের বন্য হাতি দু’টির গতি প্রকৃতি নিয়ে সবাইকে অবহিত করেন। আনোয়ারা উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) সাইদুজ্জামান চৌধুরীর সভাপতিত্বে সভায় বক্তব্য রাখেন বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (দক্ষিণ) মোজাম্মেল হক শাহ চৌধুরী, উপজেলা আওয়ামীলীগের সভাপতি অধ্যাপক আবদুল মান্নান চৌধুরী, বৈরাগ ইউনিয়নের চেয়ারম্যান মোঃ সোলায়মান, চেয়ারম্যান এম.এ কাইয়ুম শাহ, আনোয়ারা প্রেস ক্লাবের সভাপতি এম.আনোয়ারুল হক, সাধারণ সম্পাদক এম.নুরুল ইসলাম, অর্থ সম্পাদক সুমন শাহ, বনবিভাগ কর্মকর্তা ওমর ফারুক, সাইফুল ইসলাম ও গাজী বাহার উদ্দিন প্রমুখ।

দুই ঘন্টা ব্যাপী এ বৈঠকে হাতিগুলো সরিয়ে নিতে নানা কৌশল ও উপায় নিয়ে আলোচনা হয়। তবে কি উপায়ে হাতিগুলো এখান থেকে তাড়ানো সম্ভব হবে সে বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে আজ শনিবার সকাল ১০ টাকয় বৈরাগ ইউনিয়নের মোহাম্মদপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মাঠে স্থানীয় বাসিন্দাদের সাথে আরো একটি প্রশাসনিক যৌথ বৈঠক আহবান করা হয়েছে। গতকাল রাতে এ বিষয়ে স্থানীয়দের মাইকিং করে যথাসময়ে উক্ত স্থানে উপস্থিত থাকতে উপজেলা প্রশাসন থেকে অনুরোধ করা হয়েছে। বৈঠকে নিহত ব্যক্তির পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা জানানো হয়।

বনবিভাগ কর্মকর্তা মোজাম্মেল হক শাহ চৌধুরী জানান, হাতি তাড়ানোর আধুনিক কোন প্রযুক্তি এ মুহুর্তে বনবিভাগের কাছে নেই। প্রযুক্তিগত পিছিয়ে থাকার কারণে হাতিগুলো সরিয়ে নিতে ফটকা, আগুন জ¦ালানো ও উচ্চস্বরে বাঁশি বাজানো ইত্যাদি পুরনো কৌশলের উপর নির্ভর করতে হচ্ছে। এক্ষেত্রে এলাকাবাসীর অংশগ্রহনে পাহাড়ি এলাকার তিন প্রান্ত ঘিরে রেখে বাঁশখারী-চুনতি প্রান্ত খোলা রেখে হাতি দু’টি তাড়ানোর একটি পদক্ষেপ নেওয়া হবে বলে বৈঠক সূত্র জানায়।

আনোয়ারা উপজেলা আওয়ামলীগের সভাপতি ও ইউপি চেয়ারম্যান অধ্যাপক আবদুল মান্নান চৌধুরী বলেন, আমি আগেই আশংকা করেছিলাম অনাকাংকিত দুর্ঘটনা ঘটবে। কিন্তু রাত জেগে পাহাড়া বসিয়েও কাজ হলোনা। নিরহ ব্যক্তিকে প্রাণ দিতে হলো। আর যাতে কোন ব্যক্তির প্রাণহানি না ঘটে আমাদের দ্রুত হাতিগুলো সরিয়ে নেওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে। সাধারন মানুষের মাঝে ভয় আর আতংক ছড়িয়ে পড়েছে। হাতি দুইটির তান্ডবও অব্যাহত আছে।

বন্য হাতি ঢুকল কীভাবে :

বন বিভাগের কর্মকর্তাদের ধারণা চুনতি অভয়ারণ্য থেকে পথ হারিয়ে বাঁশখালীর পাহাড়ি এলাকা হয়ে বন্য হাতি দু’টি দেয়াং পাহাড়ে ঢুকেছে। পর্যাপ্ত খাদ্য না পাওয়া ও নিজের আবাসস্থলে পৌঁছতে না পারায় হাতি দু’টি লোকালয়ে চড়াও হচ্ছে। সাধারণত দিনের বেলায় হাতি দু’টি পাহাড়ে থাকলেও রাত নামলেই চলে আসছে গ্রামে। এ সময় ঘর বাড়ি ও ফসলের ব্যাপক ক্ষতি সাধন করছে।

বন বিভাগ সূত্র জানায়, শরৎ ও বসন্তে চালানো পৃথক ক্যামেরা ট্র্যাকিংয়ে চুনতি ও আশপাশের তিন বনাঞ্চলের ২১টি স্থানে হাতির চলাচলের পথ এবং আবাসস্থলও পাওয়া যায়। এর মধ্যে ১৩টি স্থান চুনতি বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্যে, সাতটি ফাইস্যাখালী বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্যে ও একটি মেধাকচ্ছপিয়া ন্যাশনাল পার্কে। চুনতিতে ১৩টির মধ্যে নয়টিতে উভয় মৌসুমে হাতির আনাগোনা দেখা যায়। প্রায় সাত মাস পর্যবেক্ষণে রাখা হয় এসব ক্যামেরা। এই বনাঞ্চলে সর্বোচ্চ ৪৭টি হাতি দেখা গিয়ে ছিল।

গবেষকদের মতে, `হাতি তাদের চলাচলের পথে কোনো ধরনের বাধা সহ্য করে না। প্রতিবন্ধকতার মুখে পড়লে তারা সেটা উপড়ে ফেলার চেষ্টা করে। নয়তো লোকালয়ে চড়াও হয়।

চুনতি অভয়ারণ্য বন বিভাগের এক কর্মকর্তা জানান, চুনতি অভয়ারণ্যে রয়েছে ৪২টি হাতি। হাতিগুলোর মধ্যে ৩৬টি বয়স্ক ও ছয়টি বাচ্চা। এগুলো তিন থেকে চারটি দলে বিভক্ত হয়ে চলাচল করে থাকে। বেপরোয়া ধরনের একটি হাতিকে আলাদা চলাচল করতে দেখা যায়। কখনও কখনও সব হাতিকে একসঙ্গেও দেখা যায়। পথ হারিয়ে এসব হাতির মধ্য থেকে দু’টি হাটি বাঁশখালী হয়ে আনোয়ারায় ঢুকে যেতে পারে।

উল্লেখ্য, ২০১২ সালের পর থেকে প্রায় প্রতি বছর আনোয়ারায ঢুকে পড়ছে বন্য হাতি। গত ৬ বছরে হাতির আক্রমনে আনোযারায় অন্তত ৩জন মারা যাওয়া ছাড়াও ১০ জন হতাহতের ঘটনা ঘটেছে।