রোববার, ১৬ মে ২০২১

কঠোর না সহজ - কোন পথে দেশ

প্রতিবেদক, চট্টগ্রাম

প্রকাশিত: ০৮ এপ্রিল ২০২১ বৃহস্পতিবার, ০৭:৫৭ পিএম

কঠোর না সহজ - কোন পথে দেশ

দেশে প্রতিদিনই বাড়ছে করোনায় আক্রান্ত ও মৃতের সংখ্যা। সরকার করোনা মোকাবেলায় বেশকিছু বিধিনিষেধ দিলেও সাধারণ মানুষের মধ্যে আইন মানার কোন গরজ নেই। এভাবে চলতে থাকলে চলতি মাসের শেষের দিকে আক্রান্তের সংখ্যা ২০ হাজারে পৌঁছতে পারে বলে আশংকা বিশেষজ্ঞদের।

লকডাউনের আদলে সরকারের ৭ দিনের বিধিনিষেধ শেষ হচ্ছে রোববার। এর মধ্যে মহানগরীতে গণপরিবহণ চলাচল ও একটি নির্দিষ্ট সময়ের জন্য দোকান খোলারও অনুমতি মিলেছে। চলছে শিল্প কারখানা ও সরকারি-বেসরকারি অফিস। এভাবে চলতে থাকলে সামনের দিনগুলোতে করোনা সংক্রমন ঠেকানো কঠিন হবে বলে মনে করছেন স্বাস্থ্যবিভাগ সংশ্লিষ্টরা।

বৃহস্পতিবার ঢাকায় লোকপ্রশাসন প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে বিসিএস কর্মকর্তাদের এক অনুষ্ঠানে গণভবন থেকে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে যুক্ত হয়ে প্রধানমন্ত্রী মেখ হাসিনা বলেছেন,  ‘মানুষকে বাঁচানোর জন্য ভবিষ্যতে কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে।’ তিনি বলেন,  “করোনাভাইরাস এখন একটা মহামারী আকারে দেখা দিয়েছে এবং আমরাও সেই ধাক্কাটা দেখতে পাচ্ছি। আমাদের তাৎক্ষণিক কিছু ব্যবস্থা নিলেও ভবিষ্যতে হয়তো কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে মানুষকে বাঁচানোর জন্য এবং সেটা আমরা নেব। সমগ্র দেশবাসীকে আজকে এই সভার মাধ্যমে সবাইকে বলব- প্রত্যেকে আপনারা যাতে স্বাস্থ্য সুরক্ষা বিধিটা যাতে মেনে চলে সেই ব্যবস্থাটা নেবেন।”  

করোনার বর্তমান পরিস্থিতিতে করোনা প্রতিরোধ জাতীয় কমিটির সদস্য কাজী তরিকুল ইসলাম বলেন, এভাবে মানুষ স্বাস্থ্যবিধি না মানলে, কঠোর লকডাউন না হলে পরিস্থিতি অনেক ভয়াবহ পর্যায়ে যাবে। বর্তমানে প্রতিদিন ৭ হাজারের মত আক্রান্ত হচ্ছে। চলতি এপ্রিলের শেষের দিকে মা মে মাসের প্রথম সপ্তাহে তা ২০ হাজারের ঘরে গেলে আশ্চার্য হওয়ার কিছুই থাকবে না।

করোনার এই অবস্থায় আরো কঠিন পদক্ষেপ দরকার বলে অভিমত বিশেষজ্ঞদের। তাদের মতে, সত্যিকার অর্থে সংক্রমণ প্রতিরোধ করতে হলে সরকারিভাবে ‘কারফিউ লকডাউন’ ঘোষণা করা উচিত। বিশেষ করে যেসব স্থানে করোনা সংক্রমণ বেশি, যেমন : ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, গাজীপুর, চট্টগ্রাম, সিলেট এবং রাজশাহী; এসব অঞ্চলে ‘কারফিউ লকডাউন’ দেয়া উচিত। তা না হলে করোনার সংক্রমণ ও মৃত্যুঝুঁকি আরও বৃদ্ধি পাবে।’

বৃহস্পতিবার (৮ এপ্রিল) করোনার ক্রমবর্ধমান সংক্রমণরোধে কী করা প্রয়োজন তা জানতে চাইলে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় (বিএসএমএমইউ) হাসপাতালের ফার্মাকোলজি বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডা. সায়েদুর রহমান খসরু এসব কথা বলেন।

তিনি আরও বলেন, ‘সরকারিভাবে লকডাউন ঘোষণা করা হয়েছে। তবে এর প্রকৃত অর্থ ‘মানুষকে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য বাধ্যতামূলকভাবে ঘরবন্দি করা’ এ ব্যাপারটাই কেউ অনুধাবন করতে চাইছেন না। ফলে লকডাউনও কার্যকর হচ্ছে না।’

ডা. সায়েদুর রহমান বলেন, ‘সরকার লকডাউন ঘোষণা করে তাৎক্ষণিকভাবে সকলের চলাচল বন্ধ না করে ৪৮ ঘণ্টা সবকিছু খোলা রাখার ফলে দেশের যেসব বিভাগ ও জেলায় করোনার সংক্রমণ বেশি, সেসব এলাকায় আরও বেশি লোকজন ছড়িয়ে পড়ার সুযোগ পেয়েছে। ফলে লকডাউনের যে সুবিধা পাওয়ার কথা, তা আমরা পাবো না। তবুও লকডাউনের ফলে মানুষের চলাচল কিছুটা কমায় সংক্রমণ কিছুটা হয়তো কমতে পারে।’

জীবন ও জীবিকার প্রয়োজনে মানুষ লকডাউন মানতে চাইছে না, এ ব্যাপারে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে তিনি বলেন, ‘জীবনের জন্য জীবিকা, জীবিকার জন্য জীবন নয়। টানা দুই সপ্তাহ লকডাউন থাকলে ঢাকা শহরের দুই কোটি মানুষের মধ্যে দিন আনে দিন খায় এমন ৩০ লাখ মানুষের খেয়ে বাঁচতে সমস্যা হবে। সরকারিভাবে অর্থায়নের পাশাপাশি সামাজিকভাবে ব্যাপক গণসচেতনতা সৃষ্টির মাধ্যমে বিত্তশালীসহ যাদের সামর্থ্য আছে, তারা সবাই মিলে ফান্ড তৈরি করে ১৪ দিন ৩০ লাখ মানুষকে বাঁচিয়ে রাখা অসম্ভব কোনো ব্যাপার নয়। ইতিপূর্বে বন্যাসহ বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগে সামাজিকভাবে অসহায়-দরিদ্রদের সাহায্যে বিত্তশালীসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষকে এগিয়ে আসতে দেখা গেছে। বর্তমান করোনার সংক্রমণ ও মৃত্যু অব্যাহত থাকলে আর্থিক বিবেচনায় ১৪ দিনের লকডাউনের চেয়ে অনেক বেশি ক্ষতি হবে।’

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ডা. শারফুদ্দিন আহমেদ বিএসএমএম্ইউ হাসপাতালের ফিভার ক্লিনিকে ৫০ শয্যার করোনা ইউনিটের উদ্ভোধন উপলক্ষে আয়োজিত সাংবাদিক সম্মেলনে বিশ্বের বিভিন্ন গবেষকদের তথ্য তুলে ধরে বলেন, ‘আগামী ২০২৪ সাল পর্যন্ত করোনার সংক্রমণ থাকবে। এ থেকে রক্ষা পেতে ওই সময় পর্যন্ত স্বাস্থ্যবিধি কঠোরভাবে মেনে চলতে হবে।’

বিশেষজ্ঞরা যখন এমন কথা বলছেন তখন সরকার ঘোষিত নানান বিধিনিষেধের চতুর্থ দিনে  শুক্রবার থেকে শপিংমল ও মার্কেট খোলার ঘোষণা এসেছে। এর আগে গতকাল (বুধবার) থেকে সব সিটি করপোরেশন এলাকায় গণপরিবহন চলাচলের অনুমতি দেয়া হয়। লকডাউনে মানুষ রাস্তায় অবাধে ঘুরে বেড়াচ্ছে। সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালে করোনা আক্রান্ত রোগীর ভীড়ও বাড়ছে।