শনিবার, ২৪ অক্টোবর ২০২০

রোহিঙ্গা ক্যাম্পে আধিপত্যের সংঘাত

প্রতিবেদক, কক্সবাজার

প্রকাশিত: ০৭ অক্টোবর ২০২০ বুধবার, ০৮:৪৫ এএম

রোহিঙ্গা ক্যাম্পে আধিপত্যের সংঘাত

কক্সবাজারের উখিয়ার কুতুপালং ক্যাম্পে আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র রোহিঙ্গাদের দুই গ্রুপে সংঘর্ষে ৪ জন নিহত হয়েছেন। এ ঘটনায় কুতুংপালং ক্যাম্প-১ এ উত্তেজনা বিরাজ করছে।

তবে সংঘর্ষের কারণে মঙ্গলবার (০৬ অক্টোবর) রাত ১০টা পর্যন্ত ক্যাম্প-১ থেকে আনুমানিক ৫শ’ রোহিঙ্গা পরিবার ঘর ছেড়েছেন বলে নিশ্চিত করেছেন ক্যাম্প ইনচার্জ মো. মাহফুজুর রহমান। তিনি বলেন, কুতুপালংস্থ ক্যাম্প-১ এ সন্ধ্যার পর থেকে সংঘর্ষ চলমান রয়েছে। এরপর পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে সেনাবাহিনী, র‌্যাব, পুলিশ, এপিবিএন ও আনসার সদস্যরা কাজ করে যাচ্ছেন। এখনো ক্যাম্পে থমথমে অবস্থা বিরাজ করছে।

মো. মাহফুজুর রহমান বলেন, সংঘর্ষের কারণে আতংকে ইতিমধ্যে সাধারণ ৫শ’ রোহিঙ্গা পরিবার ক্যাম্প-১ থেকে সরে গিয়ে অন্যান্য ক্যাম্পে আত্মীয়-স্বজনদের বাসায় আশ্রয় নিয়েছে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে পুনরায় ঘর ছাড়া রোহিঙ্গারা স্ব-স্ব ঘরে ফিরে আসবে।

অতিরিক্ত শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার মো. সামছু দ্দৌজা বলেন, আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র কুতুপালং ক্যাম্পে নতুন ও পুরাতন রোহিঙ্গাদের মধ্যে গত কয়েকদিন ধরে সংঘর্ষ ও গোলাগুলির ঘটনা চলছে। তারই ধারাবাহিকতা গত ৪ ও ৫ অক্টোবর ৩ জন রোহিঙ্গা হত্যা করা হয়েছে। আর মঙ্গলবার সকালে র্যাকব অভিযান চালিয়ে ৯ জন রোহিঙ্গা ডাকাতকে অস্ত্র ও গুলিসহ আটক করে।

তিনি বলেন, মঙ্গলবার সন্ধ্যায় কুতুপালং ক্যাম্প-১ এ রোহিঙ্গাদের দুইগ্রুপ আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে। উভয়পক্ষের সংঘর্ষে ৪ জন নিহত হয়েছেন। তবে এ ঘটনায় প্রকৃতপক্ষে কতজন হতাহত হয়েছে তা এখনো জানা যায়নি। ঘটনাস্থলে সেনাবাহিনী, র্যা ব, পুলিশ, এপিবিএন সদস্যরা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা করছেন।

কক্সবাজারের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. রফিকুল ইসলাম জানিয়েছেন, এ পর্যন্ত ৪ জনের মৃতদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। একজনের গলাকাটা ও অপর ৩ জন গুলিবিদ্ধ। এ ঘটনায় একজন আনসার সদস্য আহত হয়েছেন।

জানা যায়, আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে উখিয়ার কুতুপালং ক্যাম্পে দীর্ঘদিন ধরে আনাস ও মুন্না গ্রুপের মধ্যে দফায় দফায় হামলা ও গুলিবর্ষণের ঘটনায় গত পাঁচদিনে এক নারীসহ ৮ জন রোহিঙ্গার মৃত্যু হয়েছে। এতে আহত হয়েছে নারী-পুরুষ ও শিশুসহ অন্তত শতাধিক। এছাড়া ক্যাম্পের শতাধিক ঝুপড়ি ঘর ও ৫০টি দোকান ভাঙচুর করেছে। এ নিয়ে ক্যাম্পে চরম উত্তেজনা বিরাজ করছে।

এর আগে গত বৃহস্পতিবার (০১ অক্টোবর)  রাত ১২টা থেকে ভোর পর্যন্ত গুলাগুলি চলে। সকালে সমিরা আক্তার (৪১) নামের একজনকে মৃত্যু উদ্ধার করে পুলিশ। তিনি হলেন কুতুপালং ৩ নম্বর ক্যাম্পের এফ ব্লকের মৃত ছৈয়দ আলমের মেয়ে।

রবিবার (৪ অক্টোবর) আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে দুই গ্রুপে দফায় দফায় সংঘর্ষে দুই জন রোহিঙ্গা নিহত হয়। ভোর ৪টার দিকে কুতুপালং ক্যাম্পের ২ ওয়েষ্ট এর ডি ৫ ব্লকের মৃত সৈয়দ আলমের ছেলে ইমাম শরীফ (৩২) ও ডি ২ ব্লকের মৃত ইউনুসের ছেলে শামসুল আলম (৪৫)।
সোমবার রাত ১১ টা থেকে ভোর পর্যন্ত আনাস ও মুন্না গ্রুপের মধ্যে এ সংঘর্ষ হয়। এতে মোহাম্মদ নাসিম (২৪) নামে এক রোহিঙ্গা যুবকের মৃত্যু হয়েছে। নিহত যুবক কুতুপালং ডি-৪, ২ ওয়েস্ট ক্যাম্পের মোহাম্মদ নাসিমের ছেলে। কুতুপালং ক্যাম্পের আইন শৃংখলার দায়িত্বে নিয়োজিত ১৪ আমর্ড পুলিশ ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক আতিকুর রহমান ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করেছেন।

মঙ্গলবার (৬ অক্টোবর) কুতুপালং ক্যাম্পে দু’গ্রুপ রোহিঙ্গাদের মধ্যে আবারও সংঘর্ষ হয়ে ৪ জন নিহত হয়েছে। মঙ্গলবার সন্ধ্যায় এ সংঘর্ষ হয় বলে জানা গেছে।

স্থানীয়রা অভিযোগ করেছেন, দিন দিন রোহিঙ্গারা বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। পাশাপাশি তারা চুরি, হত্যাসহ বিভিন্ন অপরাধের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ছে। শিবির থেকে বেরিয়ে স্থানীয়দের ওপর হামলার ঘটনাও ঘটছে।

কুতুপালং রেজিস্টার্ড ক্যাম্পের চেয়ারম্যান হাফেজ জালাল আহমদ জানান, আনাস গ্রুপ ও মুন্না গ্রুপের মধ্যে সংঘটিত ঘটনায় প্রাণ বাঁচাতে কয়েক’শ রোহিঙ্গা নারী-পুরুষ ও শিশু কুতুপালং ক্যাম্প ছেড়ে অন্য ক্যাম্পে নিরাপদ স্থানে আশ্রয় নিয়েছে। বর্তমানে ক্যাম্পের অভ্যন্তরে দোকানপাট বন্ধ আছে। রোহিঙ্গা শিবিরে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা টহল দিচ্ছেন।

উখিয়া উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান অধ্যক্ষ হামিদুল হক চৌধুরী বলেন, উখিয়া-টেকনাফের ৩২টি ক্যাম্পে আশ্রয় নিয়েছে ১১ লাখের বেশি রোহিঙ্গা। বিপুল এই জনগোষ্ঠীকে নিয়ন্ত্রণ করা অনেক কষ্টসাধ্য ব্যাপার।

শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশন কার্যালয়ের অতিরিক্ত কমিশনার শামসুদ দৌজা জানান কুতুপালং শরণার্থী ক্যাম্পে রেজিস্ট্রার্ড এবং আনরেজিস্ট্রার্ড কয়েকটি রোহিঙ্গা গ্রুপের মধ্যে সংঘর্ষ হয়েছে। ঘরবাড়ি ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করেছে তারা। সকালেই ঘটনাস্থলে পুলিশ টহল দিচ্ছে। পরিস্থিতি এখন নিয়ন্ত্রণে আনা হয়েছে বলে জানিয়েছেন তিনি।