শনিবার, ২৪ অক্টোবর ২০২০

হাটহাজারী মাদ্রাসায় চিরনিদ্রায় আল্লামা শফি

প্রতিবেদক, চট্টগ্রাম

প্রকাশিত: ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২০ শনিবার, ০৪:৫৭ পিএম

হাটহাজারী মাদ্রাসায় চিরনিদ্রায় আল্লামা শফি

ছাত্র থেকে শিক্ষক । তারপর টানা ৩৪ বছর মহাপরিচালক। হাটহাজারী জামিয়াতুল আহলিয়া দারুল উলুম মঈনুল ইসলাম মাদ্রাসার প্রিয় প্রাঙ্গনে চিরনিদ্রায় শায়িত হলেন মুফতি শাহ আহমদ শফী।

মৃত্যুর একদিন আগ পর্যন্ত তিনি ছিলেন এই মাদ্রাসার মহাপরিচালক। হেফাজতে ইসলাম, বাংলাদেশ কওমি মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ড (বেফাক) , আল-হাইআতুল উলয়া লিল-জামি‘আতিল কওমিয়া, খতমে নবুওয়াত মুভমেন্টসহ গত দুই যুগ ধরে কওমিপন্থিদের প্রায় সব ফোরামে শীর্ষ নেতা ছিলেন মাওলানা শাহ আহমদ শফি।

শনিবার বেলা ২টা ১৫ মিনিটে তাঁর জানাজা সম্পন্ন হয়। মাদ্রাসার উত্তর-দক্ষিণ পাশের সড়কে প্রায় এক কিলোমিটার এলাকাজুড়ে এই জানাজায় দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা মুসল্লিরা অংশ নেন। জানাজা শেষে তাঁকে মাদ্রাসার ভেতর উত্তর মসজিদসংলগ্ন কবরস্থানে দাফন করা হয়।

জানাজায় ইমামতি করেন আহমদ শফীর বড় ছেলে মাওলানা ইউসুফ। জানাজার আগে তিনি উপস্থিত লোকজনসহ দেশবাসীর কাছে তাঁর বাবার জন্য দোয়া চান।

জানাজায় অংশ নেন স্থানীয় সংসদ আনিসুল ইসলাম মাহমুদ, চট্টগ্রাম রেঞ্জের ডিআইজি আনোয়ার হোসেন খান, এসপি এস এম রশীদুল হকসহ হেফাজতে ইসলামের নেতারা।

জানাজার আগে হেফাজতে ইসলামের মহাসচিব ও মাদ্রাসার শিক্ষক জুনায়েদ বাবুনাগরী বলেন, ‘হুজুর আমাদের ছেড়ে গেলেন। তবে হেফাজতের আন্দোলন আগের মতো অব্যাহত থাকবে।’

সকাল সাড়ে নয়টার দিকে শাহ আহমদ শফীর মরদেহ বহন করা গাড়িটি হাটহাজারীর দারুল উলুম মঈনুল ইসলাম মাদ্রাসায় ঢোকে। ঢাকা থেকে গাড়িটি ভোরে রওনা হয়। আগেই মাদ্রাসার ভেতর উত্তর মসজিদসংলগ্ন কবরস্থানে কবর খোঁড়া শেষ করা হয়। সকাল থেকেই জানাজায় অংশ নিতে দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে লোকজন চট্টগ্রামের হাটহাজারী মাদ্রাসায় আসতে শুরু করেন। লোকজনের ভিড়ে পূর্ণ হয়ে যায় মাদ্রাসার মাঠ। সকাল ১০টা থেকে হাটহাজারী-নাজিরহাট সড়ক বন্ধ করে দেওয়া হয়।

বার্ধক্যজনিত কারণে অনেকদিন ধরে নানা শারীরিক সমস্যায় ভুগছিলেন আল্লামা শাহ আহমদ শফী। গত কয়েক বছরে তিনি বেশ কয়েকবার দেশ ও দেশের বাইরের হাসপাতালে চিকিৎসা নেন। বৃহস্পতিবার ছাত্রবিক্ষোভের মুখে অবরুদ্ধ অবস্থায় অসুস্থ হয়ে পড়েন আল্লামা শাহ আহমদ শফী। মাদরাসার দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি নেয়ার পর বৃহস্পতিবার রাত ১২টার দিকে ফায়ার সার্ভিসের একটি অ্যাম্বুলেন্সে করে তাকে চট্টগ্রাম হাসপাতালে নেয়া হয়।

শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালের আইসিইউতে থাকা আল্লামা শফীকে এয়ার অ্যাম্বুলেন্সে শুক্রবার সন্ধ্যার আগে ঢাকায় এনে আজগর আলী হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। চিকিৎসাধীন অবস্থায় সেখানেই তিনি মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন। প্রায় ১০৫ বছর বয়সী আল্লামা আহমদ শফী দীর্ঘদিন যাবৎ বার্ধক্যজনিত দুর্বলতার পাশাপাশি ডায়াবেটিস, উচ্চরক্তচাপ ও শ্বাসকষ্টে ভুগছিলেন।

শাহ আহমদ শফী চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়া থানার পাখিয়ারটিলা গ্রামে এক আলেম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। ১৯৪৬ সালে হাটহাজারী মাদ্রাসায় শিক্ষক হিসেবে নিযুক্ত হওয়ার পর ১৯৮৬ সালে প্রতিষ্ঠানের মজলিসে শুরার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী মহাপরিচালক পদে দায়িত্ব¡ পান।  মৃত্যুর কিছু সময় আগ পর্যন্ত টানা ৩৪ বছর ধরে মহাপরিচালকের দায়িত্ব পালন করে গেছেন। দেশের সর্ববৃহৎ ইসলামি শিক্ষাকেন্দ্রের সাথে দীর্ঘদিন যুক্ত থাকার কারণে সারা দেশে তার রয়েছে অসংখ্য ছাত্র, মুরিদ, ভক্ত ও খলিফা। কওমি ধারার ৪০ হাজার মাদ্রাসার প্রায় প্রতিটির শিক্ষক ও পরিচালকের পদে রয়েছে তার অগণিত ছাত্র।

২০১০ সালের ১৯ জানুয়ারি কওমি মাদ্রাসাভিত্তিক সংগঠন হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে সারাদেশের মানুষের কাছে ব্যাপক পরিচিতি পান শাহ আহমদ শফি। কওমিপন্থি রাজনীতি বহুধাবিভক্ত হলেও আহমদ শফি ইস্যুতে সবাই ছিলেন এক। সেই আহমদ শফিই মৃত্যুর এক দিন আগে ছাত্র আন্দোলনের মুখে তার চিরচেনা মাদ্রাসায় কর্তৃত্ব হারিয়ে মহাপরিচালকের পদ ছাড়তে বাধ্য হন। অভিযোগ উঠেছে এই ছাত্র আন্দোলনের পেছনে হেফাজতের নেতৃত্বও একটি বড় কারণ।

হাটহাজারী মাদ্রাসার বিভিন্ন ইস্যুতে আহমদ শফির ছেলে আনাস মাদানীর সাথে হেফাজতের মহাসচিব ও মাদ্রাসার সহকারী পরিচালক মাওলানা জুনায়েদ বাবুনগরীর বিরোধ চরম আকার ধারণ করে। এক পর্যায়ে বাবুনগরীকে মাদ্রাসা থেকে অব্যাহতিও দেয়া হয়। মাওলানা শফীর ছেলে আনাস মাদানী হেফাজতের প্রচার সম্পাদক৷ তিনি একই সঙ্গে হাটহাজারী মাদ্রাসার শিক্ষক ছিলেন। দুদিন আগে তাকেও মাদ্রাসা থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে।  অভিযোগ আছে, তার পিতা অসুস্থ হওয়ায় তিনি মাদ্রাসা এবং হেফাজতের মধ্যে তার প্রভাব বাড়াতে থাকেন৷ বাবুনগরীকে মাদ্রাসা থেকে বাদ দেয়ার পর তিনি কয়েকজন শিক্ষককে মাদ্রাসা থেকে বাদ দেন এবং তার বিরোধী ছাত্রদের নানাভাবে কোণঠাসা করেন৷ 

হাটহাজারী মাদ্রাসায় প্রায় ২০ হাজার ছাত্র আছে৷ তারাও শিক্ষকদের অনুসারী হিসেবে নানা ভাগে বিভক্ত৷ গত ৯ জুলাই অবশ্য মাওলানা আহমেদ শফি তার ছেলে এবং বাবুনগরীকে নিয়ে এক টেবিলে বসে তাদের মিলিয়ে দেন৷ কিন্তু বাবুনগরী মাদ্রাসায় তার পদ ফিরে পাননি৷

ছাত্র বিস্ফোরণে মহাপরিচালকের পদ ছাড়ার পর বৃহস্পতিবার (১৭ সেপ্টেম্বর) রাতে অসুস্থ হয়ে পড়া আহমদ শফিকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। তার শারীরিক অবস্থা সংকটাপন্ন হওয়ায় বিকেলে এয়ার অ্যাম্বুলেন্সে তাকে ঢাকায় নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে আজগর আলী হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শুক্রবার (১৮ সেপ্টেম্বর) সন্ধ্যা ৬টা ২০ মিনিটে শেষ নি:শ্বাস ত্যাগ করেন।

মৃত্যুর পর পরই হাসপাতালের সামনে আহমদ শফিপন্থি আলেম ও বিক্ষুব্ধ ছাত্ররা এই মৃত্যুকে হত্যাকান্ড দাবি করে দায়িদের বিচার দাবি করেন। তারা এজন্য হেফাজতের মহাসচিব জুনায়েদ বাবুনগরীর দিকে আঙ্গুল তুলেন। অভিযোগ করেন, হাসপাতালের ভেতরে মানসিক চাপের পর আহমদ শফি হার্ট অ্যাটাক করেন। কিন্তু তাকে হাসপাতালে নেয়ার সময় অ্যাম্বুলেন্স আটকে রাখা হয়।
আহমদ শফির ছেলে আনাস মাদানীও এই মৃত্যুকে হত্যাকান্ড বলে দাবি করেছেন। এ কদিনে যারা মাদ্রাসায় অস্থিরতা সৃষ্টি করেছে তারাই এজন্য দায়ি বলে তিনি মন্তব্য করেন। হেফাজতের যুগ্মমহাসচিব ও মুফতি আহমদ শফির ঘনিষ্ঠ হিসাবে পরিচিত মাওলানা মঈনুদ্দীন রুহিও এ ঘটনাকে পরিকল্পিত হত্যাকান্ড মন্তব্য করে বলে মাদ্রাসার দখলদাররাই আল্লামা মফিকে হত্যা করেছে। জোরপূর্বক পদত্যাগ করানোর পর কাউকে ছাড়াই তাকে অ্যাম্বুলেন্সে হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে।
উদ্ভুত পরিস্থিতি স্পষ্টত দুই শিবিরে ভাগ হয়ে গেছে হেফাজত শিবির। তাই নতুন করে এই সংগঠনের নেতৃত্বে কে আসবেন তা নিয়ে শুরু হয়ে গেছে আলোচনা। 

হেফাজত নেতারা বলেন, , ২০১৩ সালে শাহবাগে গণজাগরণ মঞ্চের আন্দোলন চলাকালে শাহবাগ বিরোধী কওমি আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে হেফাজতের জন্ম। একই বছরের ৫ মে শাপলা চত্বরে সমাবেশ করে সেখানেই অবস্থান নেয় সংগঠনটির নেতাকর্মীরা। তখনই সারাদেশের মানুষের কাছে পরিচিতি পায় সংগঠনটি। সারাদেশে কওমিদের শীর্ষ সংগঠন হিসাবে একজন গ্রহনযোগ্য আলেম এই সংগঠনের দাযিত্বে আসুক সেটা চাইছে সবাই। 

হেফাজতের প্রভাবশালী একাধিক নেতা মনে করেন, সিনিয়র নায়েবে আমির মাওলানা মুহিব্বুল্লাহ বাবুনগরী, বর্তমান মহাসচিব জুনায়েদ বাবুনগরী,  ঢাকা মহানগর আমির মাওলানা নূর হোসাইন কাসেমী আমির হিসেবে সামনে থাকতে পারেন। তবে এক্ষেত্রে সরকারের কোনও একটি মহলের ভূমিকা থাকতে পারে বলে জানান কেউ-কেউ।

ঢাকার একটি ইসলামী দলের একজন সিনিয়র নেতা বলেন, ‘হেফাজতে ইসলামের নেতৃত্ব হাটহাজারী মাদ্রাসা থেকে নির্ধারণ হওয়ার সম্ভাবনা বেশি।’ হেফাজত ইসলামের মহাসচিব মাওলানা জুনায়েদ বাবুনগরী অবশ্য বলেছেন, হেফাজতের আমীর কে হবেন সে সিদ্ধান্ত হবে কাউন্সিলে। আমার দায়িত্ব হলো এখন কাউন্সিল ডাকা। কাউন্সিল যে সিদ্ধান্ত নেবে সেটাই চূড়ান্ত‘।