বৃহস্পতিবার, ২১ নভেম্বর ২০১৯

জলোচ্ছ্বাসও নিয়ে আসছে `বুলবুল‘

প্রতিবেদক, চট্টগ্রাম

প্রকাশিত: ০৮ নভেম্বর ২০১৯ শুক্রবার, ০৭:১৫ পিএম

জলোচ্ছ্বাসও নিয়ে আসছে `বুলবুল‘

বঙ্গোপসাগরে অবস্থানরত ঘূর্ণিঝড় ‘বুলবুল’র শক্তি আরো বেড়েছে। মোংলা ও পায়রা সমুদ্রবন্দরকে ৪ নম্বর স্থানীয় হুঁশিয়ারি সংকেতের পরিবর্তে ৭ নম্বর বিপদ সংকেত দেখাতে বলা হয়েছে। আর চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারে ৬ নম্বর বিপদ সংকেত দেখাতে বলেছে আবহাওয়া অধিদপ্তর।

শনিবার সন্ধ্যা থেকে রবিবার মধ্যরাতের মধ্যে যে কোনো সময়ে বাংলাদেশের উপকূলে আঘাত হানতে পারে ঘূর্ণিঝড় বুলবুল। এর গতি কখনো থেমে যাচ্ছে , আবার কখনো তীব্র গতি পাচ্ছে। বর্তমানে যে গতিতে এগুচ্ছে তা অব্যাহত থাকলে ৪৮ আগামী ঘন্টার মধ্যে আছড়ে পড়বে মারাত্মক ঘূর্ণিঝড়টি । এ সময় সৃষ্ট জলোচ্ছ্বাসের উচ্চতা পাঁচ থেকে সাত ফুট পর্যন্ত হতে পারে।

বৃহস্পতিবার রাতেই গভীর নিম্নচাপ থেকে ভয়ঙ্কর ঘূর্ণিঝড় (সিভিয়ার সাইক্লোনিক স্টর্ম)-এ পরিণত হয়েছিল ‘বুলবুল’। এখন সেটি ‘ভেরি সিভিয়ার সাইক্লোনিক স্টর্ম’ বা অতি ভয়ঙ্কর ঘূর্ণিঝড়ে পরিণত হয়েছে বলে জানিয়েছে আবহাওয়া বিভাগ।

বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট অতি প্রবল ঘূর্ণিঝড় বুলবুল ঘণ্টায় ১২৫ কিলোমিটার বেগের বাতাসের শক্তি নিয়ে ধেয়ে আসছে উপকূলের দিকে। আবহাওয়া অধিদপ্তর জানিয়েছে, আপাতত এর গতিমুখ সুন্দরবনের দিকে।

শুক্রবার সন্ধ্যায় সচিবালয়ে এক সংবাদ ব্রিফিংয়ে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ প্রতিমন্ত্রী মো. এনামুর রহমান জানান,  আপাতত খুলনা, সাতক্ষীরা, বাগেরহাট, বরগুনা, পটুয়াখালী, পিরোজপুর ও ভোলা জেলাকে ঝুঁকিপূর্ণ বিবেচনায় রাখা হয়েছে। সাত জেলার আশ্রয় কেন্দ্রগুলোতে লোক সরিয়ে নেওয়ার জন্য প্রস্তুতি রয়েছে। আশ্রয় কেন্দ্রগুলোয় ২০০০ প্যাকেট করে শুকনো খাবার পৌঁছে দেওয়া হয়েছে।

বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট অতি প্রবল ঘূর্ণিঝড় বুলবুল ঘণ্টায় ১২৫ কিলোমিটার বেগের বাতাসের শক্তি নিয়ে ধেয়ে আসছে উপকূলের দিকে। আবহাওয়া অধিদপ্তর জানিয়েছে, আপাতত এর গতিমুখ সুন্দরবনের দিকে।

ভারতের আবহাওয়া দফতরের বিজ্ঞানীদের মতে, আগামী ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে এটি পশ্চিমবঙ্গের সাগর দ্বীপ এবং বাংলাদেশের খেপুপাড়ার মধ্যে  আছড়ে পড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। কিন্তু ঠিক কোন জায়গায় আছড়ে পড়বে বুলবুল, সে ব্যাপারে এখনও নিশ্চিত হতে পারছেন না সে দেশের আবহবিদরাও। কারণ, মাঝেমধ্যেই গতিপথ পরিবর্তন হচ্ছে বুলবুলের। তবে আবহাওয়াবিদদের অনুমান, সুন্দরবনের উপর দিয়ে এই ঘূর্ণিঝড় বয়ে যাবে। সাগরদ্বীপ থেকে বাংলাদেশের খেপুপাড়া— এর মধ্যেই কোনও একটি জায়গায় স্থলভাগে আছড়ে পড়ার সম্ভাবনা রয়েছে বুলবুলের। তবে অভিমুখ এখনও পর্যন্ত খেপুপাড়ার দিকেই ঝুঁকে রয়েছে বলে আবহাওয়া বিজ্ঞানীদের মত।

আবহাওয়া অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা দুপুর ২টার কিছু সময় পর জানিয়েছেন, ঘূর্ণিঝড় `বুলবুল` এখন অবস্থান করছে পূর্ব-মধ্য বঙ্গোপসাগর ও তার কাছাকাছি পশ্চিম-মধ্য বঙ্গোপসাগর এলাকায়। আবহাওয়াবিদ আবুল কালাম মল্লিক  জানান, ঘূর্ণিঝড়টির বর্তমান গতি এবং দিক যদি বজায় থাকে তাহলে রবিবার রাতের মধ্যে বাংলাদেশের উপকূলে আঘাত হানতে পারে। তবে গতি বৃদ্ধি পেলে এর আগেও ঘূর্ণিঝড়টি আঘাত হানতে পারে।

তিনি বলেন, "ঘূর্ণিঝড়টি কখনো বেশি গতি পাচ্ছে, আবার কখনো থেমে যাচ্ছে। গতিবেগ কখনো বেশি হচ্ছে, কখনো কম হচ্ছে।"

তিনি জানান, বঙ্গোপসাগরে যেসব সাইক্লোনেন সৃষ্টি হয়, উপকূলে আঘাত করার আগে সাধারণত সেগুলোর শক্তি বৃদ্ধি পায়। আবার কখনো-কখনো দুর্বল হওয়ার নজিরও দেখা গেছে তিনি উল্লেখ করেন।

ঘূর্ণিঝড় বুলবুলের প্রভাবে সম্ভাব্য ক্ষতি এড়াতে কাজ শুরু করেছে চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসন ও সিটি করপোরেশন। ইতোমধ্যে জেলা প্রশাসনের প্রায় তিন হাজার আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুতের জন্য মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

পাশাপাশি উপকূলীয় এলাকায় বসবাসরত লোকজনকে নিরাপদ স্থানে সরে যেতে মাইকিং শুরু করেছেন চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের কর্মীরা।

চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসক কার্যালয়ের স্টাফ অফিসার তানভীর ফরহাদ শামীম বলেন, “মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের প্রায় তিন হাজার আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুত রাখার নির্দেশ দিয়েছেন জেলা প্রশাসক। পাশাপাশি জেলা দুযোর্গ ব্যবস্থাপনা কমিটির জরুরি সভা ডাকা হয়েছে। শুক্রবার সন্ধ্যায় চট্টগ্রাম সার্কিট হাউজে এই সভা অনুষ্ঠিত হবে।”

অন্যদিকে ঘূর্ণিঝড় মোকাবেলায় কন্ট্রোল রুম খোলার পাশাপাশি উপকূলীয় এলাকার লোকজনকে নিরাপদ আশ্রয়ে যাওয়ার জন্য মাইকিং শুরু করেছেন চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের কর্মীরা।
চসিকের জনসংযোগ কর্মকর্তা মো. রফিক বলেন, “ঘূর্ণিঝড় মোকাবেলায় জরুরি সভা চলছে। ইতোমধ্যে উপকূলীয় এলাকার লোকজনকে নিরাপদ আশ্রয়ে সরে যাওয়ার জন্য মাইকিং শুরু হয়েছে। নগরীর দামপাড়ায় এলাকায় কন্ট্রোল রুম খোলা হয়েছে। চসিকের স্বেচ্ছাসেবক, স্বাস্থ্যসেবা টিমকে প্রস্তুত থাকতে বলা হয়েছে।”

এর আগে শুক্রবার (৮ নভেম্বর) সকালে আবহাওয়ার এক সতর্কবার্তায় চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, মোংলা ও পায়রা সমুদ্রবন্দরগুলোকে ৪ নম্বর স্থানীয় হুঁশিয়ারি সংকেত দেখিয়ে যেতে বলা হয়েছে। বঙ্গোপসাগরে অবস্থানরত নৌযানগুলোকে সাগরে চলাচল না করে দ্রুত নিরাপদ আশ্রয়ে থাকতে বলা হয়েছে।

এক বিশেষ বিজ্ঞপ্তিতে আবহাওয়া অধিদপ্তর জানিয়েছে, শুক্রবার ভোর ৬টায় পশ্চিম-মধ্য ও সংলগ্ন পূর্ব-মধ্য বঙ্গোপসাগর অতিক্রম করে তীব্র ঘূর্ণিঝড় ‘বুলবুল’ উত্তর-উত্তরপশ্চিম উপকূলের দিকে অগ্রসর হয়। এটি চট্টগ্রাম বন্দর থেকে প্রায় ৭৬০ কিলোমিটার দক্ষিণ-পশ্চিমে, কক্সবাজার থেকে ৭১০ কিলোমিটার দক্ষিণ-পশ্চিমে, মোংলা সমুদ্রবন্দর থেকে ৬৬৫ কিলোমিটার দক্ষিণ-পশ্চিমে এবং পায়রা সমুদ্রবন্দর থেকে ৬৫০ কিলোমিটার দক্ষিণে অবস্থান করছিল। ঘূর্ণিঝড় কেন্দ্রের কাছে সাগর বিক্ষুব্ধ রয়েছে।

এটি আরও তীব্র হয়ে উত্তর ও উত্তর-পশ্চিম দিকের দিকে অগ্রসর হতে পারে। তীব্র ঘূর্ণিঝড় ‘বুলবুল’ এর কারণে সমুদ্রবন্দর, উত্তর বঙ্গোপসাগর এবং বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলগুলো প্রভাবিত হতে পারে। রাজধানী ঢাকাসহ সারা দেশে বৃষ্টি হতে পারে, আকাশ মেঘাচ্ছন্ন থাকতে পারে।

উত্তর বঙ্গোপসাগর ও গভীর সাগরে অবস্থানরত সব মাছ ধরার নৌকা ও ট্রলারকে পরবর্তী নির্দেশ না দেয়া পর্যন্ত উপকূলের কাছাকাছি এসে সাবধানে চলাচল করতে বলা হয়েছে। সেই সাথে তাদের গভীর সাগরে বিচরণ না করতে বলা হয়েছে।