মঙ্গলবার, ১৫ অক্টোবর ২০১৯

কারসাজিতে পেঁয়াজের সেঞ্চুরি

প্রতিবেদক, চট্টগ্রাম

প্রকাশিত: ০১ অক্টোবর ২০১৯ মঙ্গলবার, ০৮:৫২ এএম

কারসাজিতে পেঁয়াজের সেঞ্চুরি মায়ানমার থেকে উল্লেখযোগ্য আমদানি

পূর্ব ঘোষণা ছাড়াই রোববার (২৯ সেপ্টেম্বর) থেকে বাংলাদেশে পেঁয়াজ রফতানি বন্ধ করে দিয়েছে ভারত। পেঁয়াজ রফতানি পুরোপুরি বন্ধ করে দেয়ায় এর প্রভাব পড়েছে বাংলাদেশের বাজারে। এক রাতের ব্যবধানে বাংলাদেশে পেঁয়াজের দাম দ্বিগুণ হয়ে গেছে। রোববার খুচরা বাজারে পেঁয়াজের কেজি ছিল ৬০ টাকা। ভারতের রপ্তানি বন্ধের খবরে রাতেই দাম বেড়ে হয়ে যায় ৮০ টাকা। আর সোমবার তা হয়ে যায় ১০০ থেকে ১২০ টাকা। 

গত ২৪ ঘণ্টায় রান্নায় অতি প্রয়োজনীয় এ পণ্যটির কেজিতে দাম বেড়েছে ৬০ থেকে ২৫ টাকা।  সোমবার (৩০ সেপ্টেম্বর) বন্দরনগরীর মুরাদপুর, বহদ্দারহাট, জামালখানসহ বিভিন্ন কাঁচাবাজার ঘুরে দেখা গেছে এমন চিত্র।

দেশের বাজারে পেঁয়াজের দাম কেজি ১০০ টাকা ছুঁলেও বাণিজ্য সচিব মো. জাফর উদ্দীন বলছেন, দেশি ও আমদানি করা পেঁয়াজের সন্তোষজনক মজুত রয়েছে। এ নিয়ে উদ্বিগ্ন হওয়ার কোনো কারণ নেই। যারা মজুদ করবেন এবং বাজার অস্থির করার চেষ্টা করবেন তাদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেয়া হবে।

সন্তোষজনক মজুদের কথা বললেও ভারত বাদে বিভিন্ন মাধ্যম থেকে পেঁয়াজ আমদানি করছে সরকার। সোমবার চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে আমদানি হয়েছে তিন লাখ ৬৪ হাজার কেজি পেঁয়াজ। কনটেইনারে করে আমদানি করা এসব পেঁয়াজ খালাসের প্রক্রিয়া চলছে। মিসর ও চীন থেকে এসব পেঁয়াজ আমদানি হয়েছে বলে জানা গেছে।

এদিকে সোমবার পর্যন্ত টেকনাফ স্থলবন্দর দিয়ে বাংলাদেশে পেঁয়াজ আমদানি হয়েছে তিন হাজার ৫৭৩ টন। খালাসের অপেক্ষায় আছে পেঁয়াজভর্তি ১৫টি ট্রলার। অবশ্য দেশের বাজারে এসব পেঁয়াজ ঢুকলেও বাজার দরে এর প্রভাব এখনও টের পাওয়া যায়নি।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সোমবার সকাল থেকে বিকাল পর্যন্ত ছয়জন ব্যবসায়ীর মিয়ানমার থেকে আমদানি করা ৩৫২ দশমিক ১৪১ মেট্রিক টন পেঁয়াজ টেকনাফ স্থলবন্দর দিয়ে এসে পৌঁছে। ৫০ কেজি প্রতি বস্তা পেঁয়াজ শ্রমিকেরা ট্রলার থেকে খালাস করে ট্রাকে বোঝাই করেছেন। স্থলবন্দরে পেঁয়াজ ভর্তি ট্রাকগুলো সারি সারিভাবে দেশের বিভিন্ন স্থানে স্থলবন্দর ছেড়ে যায়।

স্থলবন্দর শুল্ক স্টেশন সূত্রে জানায়, ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ৩ হাজার ৫৭৩ দশমিক ১৪১ মেট্রিক টন পেঁয়াজ আমদানি হয়েছে মিয়ানমার থেকে। এর মূল্য ১৫ কোটি ৫৫ লাখ ২৪ হাজার ৩৫৭ টাকা। এসব পেঁয়াজ ১০-১২ জন ব্যবসায়ী পেঁয়াজ আমদানি করেছেন। এর আগে আগস্টে ৮৪ মেট্রিক টন পেঁয়াজ আমদানি হয়।

আমদানিকারক এমএ হাশেম, মোহাম্মদ সেলিম ও নুরুল কায়েস সাদ্দাম বলেন, মিয়ানমারের আকিয়াব বন্দর থেকে কয়েক হাজার মেট্রিক টন ভর্তি পেঁয়াজের জাহাজ সমুদ্রপথে রয়েছে। সেগুলো কয়েকদিনের মধ্যে টেকনাফ স্থলবন্দরে এসে পৌঁছাবে বলে আশা করা হচ্ছে।

স্থানীয় নুর হাকিম নামের এক ব্যক্তি অভিযোগ করেন, মিয়ানমার থেকে প্রচুর পরিমাণ পেয়াজ আমদানি হলেও বাজারে কোনও প্রভাব পরেনি। ব্যবসায়ীরা সিন্ডিকেট করে বাজার নিয়ন্ত্রণ করছে। এতে লোকজনের মাঝে হতাশা বিরাজ করছে।

টেকনাফ স্থলবন্দরে কাস্টমস সুপার আবছার উদ্দিন বলেন, মিয়ানমার থেকে পেঁয়াজ আমদানি বাড়ছে। টেকনাফ স্থল শুল্ক স্টেশন দিয়ে আমদানি করা পেঁয়াজগুলোর খালাস কার্যক্রম দ্রুত শেষ করে সরবরাহ করা হচ্ছে। তবে পেঁয়াজের সংকট মোকাবিলায় ব্যবসায়ীদের আমদানি আরও বাড়াতে উৎসাহিত করা হচ্ছে।

দেশের সবচেয়ে বড় ভোগ্যপণ্যের বাজার খাতুনগঞ্জ থেকে একপ্রকার উধাও হয়ে গেছে পেঁয়াজ। ভারত থেকে বাংলাদেশে পেঁয়াজ রফতানি বন্ধ হওয়ার বিষয়টি জানার পর খাতুনগঞ্জের ব্যবসায়ীরা জানান, আমদানিকারকদের সিদ্ধান্ত না জেনে পেঁয়াজ বিক্রি করবেন না তারা। এর মাঝে ঘণ্টায় ঘণ্টায় লাফ দিয়ে বাড়ে পেঁয়াজের দাম।

জানা গেছে, বাড়তি মুনাফার আশায় ব্যবসায়ীরা গত কয়েক দিনে আমদানি করা পেঁয়াজ বাজারের বাইরে গুদামজাত করেছেন। মূলত ভারত পেঁয়াজ রফতানি বন্ধ করে দিয়েছে- এ খবর চট্টগ্রামে পৌঁছার সঙ্গে সঙ্গে খাতুনগঞ্জের আড়ত থেকে ‘উধাও’ হয়ে যায় পেঁয়াজ। গতকাল রোববার সকালেও খাতুনগঞ্জের আড়তগুলোতে কেজিপ্রতি ভারতীয় পেঁয়াজ ৬৫ টাকায় বিক্রি হলেও সন্ধ্যার পর পেঁয়াজ বিক্রি বন্ধ করে দেয়া হয়।

এদিকে রফতানি বন্ধ ঘোষণার খবর পাওয়ার পর রোববার রাতে পেঁয়াজভর্তি ১৬টি ট্রাক ভারতের পেট্রাপোল সীমান্ত থেকে ফেরত পাঠানো হয়েছে। তবে হতাশাজনক পেঁয়াজের বাজারে আশা জাগিয়েছেন কক্সবাজারের টেকনাফ স্থলবন্দরকেন্দ্রিক ব্যবসায়ীরা। এখানকার ব্যবসায়ীরা মিয়ানমার থেকে পেঁয়াজ আমদানি বাড়িয়ে দিয়েছেন আগের তুলনায় দ্বিগুণ।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, মিয়ানমারের রফতানিকারকরা টনপ্রতি গড় দাম ৩৫ হাজার টাকায় টেকনাফ স্থলবন্দর পর্যন্ত পৌঁছে দিচ্ছে। আনুষঙ্গিক খরচ যোগ করে মিয়ানমার থেকে আসা পেঁয়াজ টেকনাফ বন্দর কার্যক্রম শেষ পর্যন্ত কেজিপ্রতি গড় দাম দাঁড়ায় ৩৫ টাকা। কিন্তু টেকনাফের স্থানীয় বাজারে ব্যবসায়ীরা পেঁয়াজের দাম হাঁকাচ্ছেন ৮০ টাকা। কক্সবাজার শহর, বৃহত্তর ঈদগাঁও বাজারসহ প্রসিদ্ধ বাজারগুলোতে ১০০ থেকে ১১০ টাকা পর্যন্ত নেয়া হচ্ছে পেঁয়াজের কেজি।

টেকনাফ পাইকারি বাজারের হারুন সওদাগর, নবী সওদাগরসহ একাধিক ব্যবসায়ী জানান, বন্দরের আমদানিকারকদের কাছ থেকে প্রতি কেজি ৭০ টাকায় কিনছি। টেকনাফ বাজারে এনে ১০ টাকা লাভে ৮০ টাকা কেজিতে পেঁয়াজ বিক্রি করছি। তবে মিয়ানমার থেকে পেঁয়াজ আসার পর দাম কমবে।

সাধারণ ক্রেতারা জানান, মিয়ানমার থেকে কম দামে পেঁয়াজ আমদানি হলেও অদৃশ্য কারণে স্থানীয় বাজারে পেঁয়াজের দাম কমছে না। মিয়ানমার থেকে যে পরিমাণ পেঁয়াজ আমদানি হচ্ছে তাতে পেঁয়াজের দাম ৫০ টাকা পেরোনোর কথা নয়। অথচ ওসব পেঁয়াজ কিনতে হচ্ছে ৮০ থেকে ৯০ টাকায়।