বৃহস্পতিবার, ২১ নভেম্বর ২০১৯

বিতর্কিত এনজিও মুক্তি কক্সবাজারের প্রকল্প বন্ধ

প্রতিবেদক, চট্টগ্রাম

প্রকাশিত: ৩০ আগস্ট ২০১৯ শুক্রবার, ১২:০০ পিএম

বিতর্কিত এনজিও মুক্তি কক্সবাজারের প্রকল্প বন্ধ

বিতর্কিত এনজিও ‘মুক্তি কক্সবাজার’ এর ছয়টি প্রকল্পে সকল কার্যক্রম বন্ধ ঘোষণা করেছে এনজিও বিষয়ক ব্যুরো।

এনজিও বিষয়ক ব্যুরোর নির্দেশ অনুযায়ী ‘মুক্তি কক্সবাজার’ কোনো কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারবে না। কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক মো. কামাল হোসেন সাংবাদিকদের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।

কক্সবাজার জেলা প্রশাসক মো. কামাল হোসেন বলেন, প্রধানমন্ত্রী কার্যালয়ের এনজিও ব্যুরোর পাঠানো একটি পত্রের কপি বৃহস্পতিবার হাতে পেয়েছি। এরপরই ‘মুক্তি কক্সবাজার’সহ অন্যান্য এনজিওগুলোর কার্যক্রম আরো গভীর ভাবে নজরে নিতে উখিয়া উপজেলা প্রশাসনকে নির্দেশনা দেয়া হয়েছে।

সম্প্রতি কক্সবাজারে শরণার্থী শিবিরে রোহিঙ্গাদের সমাবেশে তাদের হাতে ধারাল অস্ত্র দেখার পর আলোচনার মধ্যে এই পদক্ষেপ নিয়েছে এনজিও বিষয়ক ব্যুরো।

ব্যুরোর মহাপরিচালক কে এম আবদুস সালাম বলেন, “কক্সবাজারে রোহিঙ্গাদের মধ্যে বিতর্কিত কর্মকাণ্ডের জন্য মুক্তির ছয়টি প্রকল্প সাময়িক স্থগিত করে তাদের কারণ দর্শানোর নোটিস দেওয়া হয়েছে।”

এনজিও ব্যুরোর উপপরিচালক এবং ব্যুরোর রোহিঙ্গা বিষয়ক সেলের ফোকাল পয়েন্ট আব্দুল্লাহ আল খায়রুম বলেন, “এনজিও ব্যুরোর অনুমোদিত যেসব সামগ্রী বিতরণ করার কথা, তা না মেনে তারা আইটেম তৈরি ও বিতরণ করছে, যা আইনের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন।”

রোহিঙ্গা সঙ্কটের দ্বিতীয় বছর র্পূর্তিতে গত রোববার শরণার্থী শিবিরে বিশাল সমাবেশ করে মিয়ানমারের এই নাগরিকরা।

ওই সময়ে কক্সবাজারের উখিয়ার কোটবাজার এলাকায় একটি কামারের দোকান থেকে লোহার তৈরি ধারাল প্রায় সাড়ে ছয়শ’ সরঞ্জাম জব্দ করা হয়।

স্থানীয়রা অভিযোগ তোলে, রোহিঙ্গা শিবিরে বিতরণের জন্য তৈরি করা হচ্ছিল এসব ‘ধারাল অস্ত্র’।
তবে মুক্তি কক্সবাজারের কর্মকর্তারা দাবি করেন, ওগুলো কৃষি কাজে ব্যবহারের ‘নিড়ানি’ এবং সেগুলো রোহিঙ্গাদের মধ্যে বিতরণের জন্য তৈরি করা হয়নি।

আব্দুল্লাহ আল খায়রুম বলেন, “এগুলো নিড়ানি বা যা-ই বলুক,  এটা এনজিও ব্যুরোর অনুমোদিত ছিল না। সেজন্য স্থগিত করা হয়েছে তাদের কার্যক্রম।”

মুক্তি কক্সবাজারের যে ৬টি প্রকল্প স্থগিত হয়েছে, সেগুলো হচ্ছে-নন ফরমাল এডুকেশন প্রোগ্রাম ফর দ্য চিলড্রেন অব ফোর্সিবলি ডিসপ্লেসড মিয়ানমার ন্যাশনাল; স্ট্রেংদেনিং রেজিলেন্স অ্যান্ড ফুড সিকিউরিটি অব ফোর্সিবলি ডিসপ্লেসড মিয়ানমার ন্যাশনাল অ্যান্ড লস্ট কমিউনিটি ইন টেকনাফ; ইম্প্রুভ অব ওয়াটার, স্যানিটেশন, হাইজিন ফর দ্য ফোর্সিবলি ডিসপ্লেসড মিয়ানমার ন্যাশনাল অ্যান্ড লস্ট কমিউনিটি ইন কক্সবাজার; এনহেন্সিং লার্নিং আউটকামস ফর ফোর্সিবলি ডিসপ্লেসড মিয়ানমার ন্যাশনাল ইন উখিয়া; ইম্প্রুভ ডব্লিউএএসএইচ থ্রু ফেসাল স্লাজ ম্যানেজমেন্ট এ্যান্ড বাথিং কিউবিকল ফর দ্য ডিসপ্লেস পার্সনস ফ্রম মিয়ানমার ইন কক্সবাজার এবং প্রটেকশন ইনিশিয়েটিভ ফর দ্য আন একাম্প্যানিড অর অরফান চিলড্রেন ইন কক্সবাজার।

মুক্তি কক্সবাজারের প্রধান নির্বাহী বিমল চন্দ্র দে সরকার জানান, তাদের ৩০টি প্রকল্প চলমান, তার মধ্যে ছয়টির কার্যক্রম স্থগিত করতে বলা হয়েছে।

“ছয়টির বিষয়ে আমরা চিঠি পেয়েছি। আপাতত ছয়টির কার্যক্রম স্থগিত করা হয়েছে।”

অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে তিনি বলেন, “প্রকৃত পক্ষে আমরা কৃষি উপকরণ হিসেবে নিড়ানি প্রস্তুতের অর্ডার দিয়েছিলাম। যাকে দেওয়া হয়েছিল কাজ, সে সেগুলো কোথায় বানাতে দিয়েছে, জানি না।  এখন বলেছে, উখিয়ায় এসব তৈরি করেছে। এসব নিড়ানি আমরা এখনও রিসিভ করিনি, বিতরণও করা হয়নি।”

বিমল দে বলেন, এক বছরের জন্য ছয়টি প্রকল্পে ৩ কোটি ৪০ টাকার কাজ করার কথা। ২ লাখ টাকায় এসব নিড়ানি তৈরি করা হচ্ছিল।

তার বক্তব্য অনুযায়ী, টেকনাফের হ্নীলায় তাদের একটি কৃষিভিত্তিক প্রকল্প চালু রয়েছে। ওই প্রকল্পের অধীনে স্থানীয় জনগোষ্ঠীকে কৃষির উন্নয়নে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। প্রশিক্ষণ শেষে তাদের সার, বীজ, স্প্রে মেশিন এবং নিড়ানিসহ বিভিন্ন কৃষি উপকরণ বিতরণ করা হয়।

“তদন্ত করলেই প্রকৃত সত্য বেরিয়ে আসবে। তদন্ত হলে জানা যাবে, কৃষি উপকরণের জন্যই এসব করা হয়েছে। ঝুঁকিপূর্ণ হাতিয়ার বা অনুমোদনহীন কিছু বিতরণের প্রশ্নই উঠে না।”

মুক্তি কক্সবাজারের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রমূলকভাবে নিড়ানি তৈরির বিষয়টি ভিন্নভাবে প্রচার করা হয়েছে বলে দাবি করেন বিমল দে।

“আসলে আমাদের কাজের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র বা বানোয়াট কিছু করা হয়েছে।”

তবে লোহার যন্ত্র তৈরির বিষয়ে কোন প্রকল্পের কথা জানেন না বলে দাবি করেন ‘মুক্তি কক্সবাজার’ এর পরিচালনা কমিটির সাধারণ সম্পাদক ও জেলা আওয়ামীলীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট রণজিত দাশ। তিনি বলেন, সর্বশেষ ২২ আগস্ট সম্পন্ন হওয়া নির্বাহী কমিটির বৈঠকেও এসব বিষয় আমাকে জানানো হয়নি, এমনকি মৌখিক ভাবেও। তাই এ টেন্ডার বিষয়ে আমি কিছুই জানি না।

আর এদিকে মুক্তি’র দুই কর্মকর্তার পরস্পরবিরোধী বক্তব্যের প্রেক্ষিতে এবিষয়ে জনমনে ধোঁয়াশার সৃষ্টি হয়েছে। স্থানীয়দের বিরুদ্ধে ব্যবহারের জন্য রোহিঙ্গাদের সরবরাহ করতে এসব হাতিয়ার তৈরি করা হচ্ছিল অভিযোগ স্থানীয়দের।

কৃষি বিভাগও বলছে, নিড়ানি সদৃশ যেসব হাতিয়ার পাওয়া গেছে তা কৃষিকাজে ব্যবহার্য নিড়ানির আকারের সাথে মিলে না। কৃষিকাজে ব্যবহার্য নিড়ানির আকার হাতলসহ সর্বোচ্চ এক ফুট দৈর্ঘের হলেও মুক্তির তৈরিকৃত নিড়ানিগুলোর দৈর্ঘ্য দুই থেকে আড়াই ফুট।

রোহিঙ্গা সঙ্কট শুরুর পর নানা অভিযোগে এ পর্যন্ত ছয়টি এনজিওর কার্যক্রম স্থগিত করা হয়েছে। এগুলো হল ইসলামিক রিলিফ, ইসলামিক এইড, মুসলিম এইড, স্মল কাইন্ডনেস বাংলাদেশ, বাংলাদেশ চাষী কল্যাণ সমিতি ও নমিজান আফতাবি ফাউন্ডেশন।

২০১৭ সালের অগাস্টে মিয়ানমারের রাখাইরে সেনা অভিযান শুরুর পর নির্যাতনের মুখে প্রাণ বাঁচাতে লাখ লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশ সীমান্তে ছুটতে থাকে। দুই বছরে এই সংখ্যা ৭ লাখ ছাড়িয়েছে।