বুধবার, ১৬ অক্টোবর ২০১৯

চট্টগ্রামজুড়ে পানি, জলাবদ্ধতা আর বন্যায় দূর্ভোগ

প্রতিবেদক, চট্টগ্রাম

প্রকাশিত: ১৪ জুলাই ২০১৯ রবিবার, ০৯:১৩ এএম

চট্টগ্রামজুড়ে পানি, জলাবদ্ধতা আর বন্যায় দূর্ভোগ

পানিতে ভাসছে পুরো চট্টগ্রাম। শহরে জলাবদ্ধতা আর গ্রামে বন্যা। দূর্ভোগে নাকাল হাজারো মানুষ। দু‘দিন ধরে সাঙ্গু ও হালদা নদীর পানি বিপদসীমার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন বন্যা অন্তত এক সপ্তাহ স্থায়ী হতে পারে। তবে বৃষ্টি থেমে গেলে উন্নতি হবে নগরের জলাবদ্ধতা পরিস্থিতি।

মূল সড়ক ডুবে যাওয়ায় শনিবার রাত থেকে চট্টগ্রাম-কক্সবাজার সড়কে বন্ধ হয়ে গেছে যান চলাচল।

চট্টগ্রাম শহরে শনিবার দিনভর ছিল বৃষ্টি। তবে রোববার সকাল থেকে কমে এসেছে বৃষ্টির পরিমাণ।  অবশ্য এতদিন ভারী বর্ষণ হলেও গতকাল রেকর্ডকৃত বৃষ্টির পরিমাণ বলছে, এটি ছিল মাঝারী মানের বৃষ্টি। আবার বৃষ্টির সময় জোয়ারও ছিল না। তবু নিচু এলাকাগুলো ডুবে যায়। পানি প্রবেশ করে বাসা–বাড়িতেও। তাছাড়া গত কয়েকদিন ধরে ভারী বর্ষণেও যেসব বাসা–বাড়িতে পানি ঢুকেনি শনিবার সেখানে পানি ঢুকে যায়।

তীব্র জলটের কারণে গোলপাহাড় থেকে প্রবর্তক মোড় এবং দুই নম্বার গেইট থেকে চকবাজার সড়কে প্রায় দুই ঘণ্টা যানবাহন চলাচল বন্ধ ছিল। সেখানে প্রায় গলা পর্যন্ত পানি জমেছিল। এবং বিভিন্ন ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে পানি ঢুকে পড়ে।

এছাড়া জিইসি মোড়, ষোলশহর, চকবাজার ডিসি রোড, গণি কলোনি, কালাম কলোনি, রসুলবাগ, খালপাড় এলাকা, খাজা রোডে পানি জমেছিল। খাজা রোডের বিভিন্ন বাসা–বাড়িতেও পানি প্রবেশ করে। বহাদ্দারহাটের ফরিদারপাড়া তালতলা এলাকায় বিভিন্ন বাসা–বাড়িতেও পানি ঢুকে যায়। এখানে দুর্ভোগের শিকার কেয়া বড়ুয়া দৈনিক আজাদীকে বলেন, পানি ঢুকে ঘরের সব আসবাব পত্র ভিজে গেছে। ফ্রিজসহ ইলেক্ট্রনিঙ যন্ত্রাংশও নষ্ট হওয়ার পথে।

এদিকে আগ্রাবাদ সিডিএ আবাসিক, হালিশহর, ছোটপুল, বহদ্দারহাট এককিলোমিটার, ডেপুটি রোড, চৌধুরী স্কুল, নাসিরাবাদ হাউজিং সোসাইটির ৩, ৪,৫ ও ৬নং সড়ক, চান্দগাঁও শরফউদ্দিন আউলিয়া সড়ক, খলিফা পাড়া, ছাত্তার মেম্বার বাড়ি, মাদারবাড়ি, পাহাড়তলী সিডিএ মার্কেট এলাকা, কোরবানীগঞ্জ বলুয়ার দিঘির পাড়, আগ্রাবাদ এঙেস রোড, উত্তর কাট্টলীর বিশ্বাস পাড়া, সদরঘাট থানার আইস ফ্যাক্টরি রোড, আগ্রাবাদ কমার্স কলেজ এলাকা, মোহাম্মদপুর রোড, বাদুরতলা বড় গ্যারেজ, জিইসি মোড়, গোসাইলডাঙ্গা, মোহাম্মদপুর, খতিবের হাট এালকার কোথাও হাঁটু এবং কোথাও কোমর সমান পানি ছিল।

এদিকে সাঙ্গু ও হালদার পানি বেড়ে যাওয়ায় চন্দনাইশ, সাতকানিয়া, রাউজান আনোয়ারায় বন্যা পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে।শনিবার রাত থেকে চট্টগ্রাম কক্সবাজার সড়কে যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়।  রাঙ্গামাটি সড়কের রাউজান অংশে কিছু সময় যান চলাচল বন্ধ ছিল। বিভিন্ন ইউনিয়নের আভ্যন্তরীণ সড়কগুলোতেও ছিল একই অবস্থা। বাঁশখালী, সাতকানিয়া, চন্দনাইশ, পটিয়া, আনোয়ারা, বোয়ালখালী, কর্ণফুলী, রাঙ্গুনিয়া, হাটহাজারী, ফটিকছড়িতেও বন্যা পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে। এখানে বিভিন্ন বাসা–বাড়িতে পানি ঢুকে যায়। এরমধ্যে সাতকানিয়ার ১৭টি ইউনিয়নের সবগুলোই তলিয়ে যায় পানিতে। হাটহাজারীতে ৮টি ইউনিয়নের বন্যা পরিস্থিতি সবচেয়ে খারাপ।

বন্যা ও পানি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এবারের এই বন্যা অন্তত দু’সপ্তাহ স্থায়ী হতে পারে। এজন্য তারা একে ‘মধ্যমেয়াদি বন্যা’ হিসেবে আখ্যায়িত করছেন। সাধারণত ৫ দিনের কম স্থায়ী বন্যাকে স্বল্প আর এর বেশি স্থায়ী হলে মধ্যমেয়াদি বন্যা বলে। তিন সপ্তাহের বেশিদিন ধরে চললে তাকে দীর্ঘমেয়াদি বন্যা বলে। তবে এবার এখন পর্যন্ত দীর্ঘমেয়াদি বন্যা হওয়ার কোনো আশঙ্কা নেই বলে উল্লেখ করেন বুয়েটের পানি ও বন্যা ব্যবস্থাপনা ইন্সটিটিউটের অধ্যাপক ড. একেএম সাইফুল ইসলাম।

তিনি বলেন, বাংলাদেশে সাধারণত তিনটি অববাহিকায় একসঙ্গে বন্যা হলে সেটা দীর্ঘমেয়াদি রূপ লাভ করে। এগুলো হচ্ছে- গঙ্গা-পদ্মা, ব্রহ্মপুত্র-যমুনা এবং মেঘনা অববাহিকা। বর্তমানে শেষের দুই অববাহিকায় বন্যা চলছে। এই বন্যা ২০১৭ সালের মতো ২৫ জেলায় বিস্তৃত হওয়ার আশঙ্কা আছে। সেক্ষেত্রে দেশ একটি মধ্যমেয়াদি বন্যার কবলে পড়বে।

দেশের বন্যা পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে থাকে পানি উন্নয়ন বোর্ডের বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র (এফএফডব্লিউসি)। সংস্থাটির উপবিভাগীয় প্রকৌশলী সরদার উদয় রায়হান বলেন, ভারতের পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্য আসাম, মেঘালয়, সিকিম, পশ্চিমবঙ্গের উত্তরাঞ্চলে কয়েকদিন ধরে ভারি বৃষ্টি হচ্ছে।
ওই পানি বাংলাদেশে নেমে আসছে। এছাড়া বাংলাদেশের ভেতরেও প্রায় সারা দেশে মাঝারি থেকে ভারি বৃষ্টি হচ্ছে। বিশেষ করে সিলেট ও রংপুর বিভাগের বিভিন্ন জেলায় বৃষ্টির প্রবণতা বেশি। একই অবস্থা চট্টগ্রাম বিভাগেও। ফলে দেশের উত্তরাঞ্চল, উত্তর-পূর্বাঞ্চল, দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের জেলাগুলোতে বন্যা চলছে।

এফএফডব্লিউসি জানায়, অতিরিক্ত পানি প্রবাহের কারণে দেশের ১৫ নদীর পানি বিপদসীমার ওপরে প্রবাহিত হচ্ছে। এসব নদীর পানি আবার ২৩ স্টেশনে বিপদসীমার ওপরে আছে। নদীগুলো হচ্ছে- সুরমা, কুশিয়ারা, মনু, ধলাই, খোয়াই, সোমেশ্বরী, কংস, হালদা, সাঙ্গু, মাতামুহুরী, ধরলা, তিস্তা, ঘাঘট, ব্রহ্মপুত্র ও যমুনা।