রোববার, ২১ জুলাই ২০১৯

ধর্ষকের পায়ে ধরেও রক্ষা পায়নি সেই তরুণী

প্রতিনিধি, আনোয়ারা , চট্টগ্রাম

প্রকাশিত: ০৬ জুলাই ২০১৯ শনিবার, ০৬:২৮ পিএম

ধর্ষকের পায়ে ধরেও রক্ষা পায়নি সেই তরুণী

আনোয়ারা চাতরী চৌমুহনি থেকে বাড়ি যাবেন বলে ৩০টাকা ভাড়ায় টেক্সিতে উঠেছিলেন লাবণী (ছদ্ম নাম)। কেইপিজেডের কেএসআই সু ফ্যাক্টরির এই কর্মী কাজ শেষে এভাবেই প্রতিদিন পাবলিক গাড়িতে চন্দনাইশের সূচিয়ার বাড়ি ফিরতেন। টেক্সিতে চালক ছাড়াও ছিলেন আরো ৩ জন। দুইজন সামনে বসা, পেছনে ২ জন। চলা শুরুর পর এক কিলোমিটার না যেতেই টেক্সিটি মূল রাস্তার পরিবর্তে চায়না ইকোনমিক জোনের নতুন রাস্তা ধরে চলতে শুরু করল।

এ সময় তরুনী মেয়েটি চিৎকার শুরু করলে ধর্ষক আবদুন নুর মুখ চেপে ধরে। নির্জন স্থানে নিয়ে গিয়ে মেয়েটিকে গাড়ি থেকে নামায়। ধর্ষকদের কবল থেকে বাঁচতে এক পর্যায়ে সে আবদুন নুরের পায়ে পড়ে কান্নাকাটি করে। নিজের শারীরিক অসুস্থতার কথা জানায। তারপরেও বাঁচতে পারেনি। ছুরিকাঘাতে মেরে ফেলার ভয় দেখিয়ে প্রথমে আবদুন নুর ধর্ষণ করে। এরপর তার বন্ধুও ধর্ষণ করে।

এই ঘটনায় জড়িত দুই আসামিকে শনিবার গ্রেফতার করে আনোয়ারা থানা পুলিশ। এর মধ্যে একজন টেক্সি চালক মো. মামুন (১৮)। সে আনোয়ারা বৈরাগ গ্রামের আনোয়ার হোসেনের পুত্র । অন্যজন পটিয়া দক্ষিণ ছনহরা গ্রামের মোহাম্মদ আবদুল গফুরের পুত্র মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিন (৩০)। গ্রেফতারের পর পুলিশ তাদের নিয়ে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে। সেখানে সারাবেলা প্রতিবেদকের সঙ্গে কথা হয় এই দুই আসামির।

নিজেদের সরাসরি সম্পৃক্তার বিষয়টি অস্বীকার করে এই দুই আসামি ধর্ষণ ঘটনার বিস্তারিত বর্ণনা দেন। মোহাম্মদ মামুন জানান, সিএনজি টেক্সিটি তিনি চালাচ্ছিলেন। বাঁশখালী যাওয়ার কথা বলে আবদুন নুর ও তার এক বন্ধু মইজ্যারটেক থেকে টেক্সিটি ভাড়া নেয়। হেলাল ছিল তার পাশে, সামনের সিটে। আবদুন নুর ও তার বন্ধু ছিল পেছনের সিটে। বুধবার রাত সাড়ে ৮টার দিকে টেক্সিটি চৌমুহনি বাজারের মোড়ে আসলে ওয়ান মাবিয়া মার্কেটের সামনে  ওই তরুণী ভাড়ার টেক্সি মনে করে সিগন্যাল দেন। এ সময় আবদুন নুর টেক্সি থামাতে বলে। চন্দনাইশ যাওয়ার জন্য ৩০ টাকা ভাড়া দরদাম করে মেয়েটিকে গাড়িতে তুলে নেয়। টেক্সিচালক মামুনের দাবি, মূল রাস্তার পরিবর্তে গাড়িটি ইকোনমিক জোনের ভেতরের রাস্তায় নিতে বললে সে প্রতিবাদ করেছিল। শেষ পর্যন্ত নিয়ে যেতে বাধ্য হয়।

গ্রেফতার হওয়া আরেক আসামি মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিন বলেন, মেযেটি আবদুন নুরের পায়ে পড়ে অনেক কান্নাকাটি করেছিল। তবুও নুর তাকে ছাড়েনি। ছুরির ভয় দেখিয়ে সে ও তার বন্ধু মিলে মেয়েটিকে ধর্ষণ করে। এ সময় মেয়েটি অনেক রক্তাক্ত ছিল। পিরিয়ড অবস্থায থাকার কথা বলার পরও মেয়েটিকে ছাড়েনি আবদুর নুর।

আনোয়ারা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) দুলাল মাহমুদ বলেন, কিশোরী ধর্ষণের ঘটনায় দুইজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। বাকিদের গ্রেপ্তারের অভিযান চলছে।

জানা যায়, গত বুধবার (৩ জুলাই) রাতে আনোয়ারা ইপিজেডের একটি জুতা কারখানায় কাজ শেষে নিজ বাড়ী চন্দনাইশে ফেরার পথে ওই কিশোরীকে সিএনজি চালকসহ উপজেলার কালাবিবি দীঘি চায়না ইকোনোমিক জোন এলাকার নির্জন জঙ্গলে নিয়ে গিয়ে ধর্ষণ করে তাকে রাস্তার পাশে ফেলে যায়। সংঘবদ্ধ ধর্ষণের শিকার মেয়েটি পাঁচমাস ধরে একটি জুতার ফ্যাক্টরিতে শ্রমিক হিসেবে কাজ করতো। বর্তমানে সে চট্টগ্রাম মেডিকের কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আছে।

ধর্ষিতার বোনের স্বামী বলেন, ‘আমার শালী ফ্যাক্টরি কাজ শেষে বাড়ি ফেরার জন্য সিএনজিচালিত অটোরিক্সায় উঠে। অটোরিক্সায় তখন চালকসহ দুইজন ছিলো। আমার শালী উঠার পর ওই অটোরিক্সায় আরও দুইজন উঠে। এরপর তার মুখ চেপে হাত-পা বেঁধে ফেলে। পরে একটি জঙ্গলে তাকে নিয়ে ওই চার পাষন্ডপালাক্রমে তাকে ধর্ষণ করে। সে অজ্ঞান হয়ে গেলে মৃত ভেবে ধর্ষকরা পালিয়ে যায়।’

এরপর ওই তরুণী কোন মতে হেঁটে পিএবি সড়কের চায়না সড়কের মুখে আসে।  সেখান থেকে এক ভ্যান চালকের সহযোগিতায় চৌমহনী বাজারের দক্ষিণে টানেল সংযোগ সড়কের পূর্ব পাশে চায়ের দোকানের সামনে আসে। সেখানে স্থানীয় কয়েকজন বসে চা দোকানে টেলিভিশন দেখছিলেন। 

স্থানীয় বাসিন্দা মো. জাবেদ জানায়, গত বুধবার আনুমানিক রাত ১০ টার পর আমিসহ স্থানীয় ৮/১০ জন লোক টানেল রোড়ের পূর্ব পাশে চায়ের দোকানে বসে খেলা দেখছিলাম। এ সময় এক ভ্যান চালক ওই তরুণীকে রাস্তা পার করে করে দোকানের সামনে রেখে যায়। তখন তরুণীর সারা শরীরির রক্তাক্ত অবস্থায় ছিল। তরুণীর পরনের কাপড়ের অবস্থা দেখে আমি ঘর থেকে আমার স্ত্রীর কাপড় নিয়ে এসে তাকে পড়তে দেই। 

স্থানীয় অপর বাসিন্দা এনাম জানান, এখানে আসার পর মেযেটি অজ্ঞান হয়ে যায়। পরে মাথায পানি ঢেলে ও ঠান্ডা পানীয় পান করানোর পর তার জ্ঞান ফেরে। মোবাইল ফোনে পরিবারের লোকজনকে জানানো হলে তারা উদ্ধার করে প্রথমে আনোয়ারা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে পরে চট্টগ্রাম মেডিকের কলেজে নিয়ে যায়।

ধর্ষণের ঘটনায় বৃহষ্পতিবার বিকেলে ধর্ষিতার ভাই বাদী হয়ে অজ্ঞাত ৪ জনকে আসামী করে আনোয়ারা থানা মামলা দায়েরের পর র‌্যাব ও পুলিশ তদন্তে নামে। মেযেটির শারীরিক অবস্থা উন্নতির দিকে বলে হাসপাতাল সূত্র জানায়।