বৃহস্পতিবার, ২০ জুন ২০১৯

চট্টগ্রাম কারাগারে সন্ত্রাসী অমিত মুহুরী খুন

প্রতিবেদক, চট্টগ্রাম

প্রকাশিত: ৩০ মে ২০১৯ বৃহস্পতিবার, ০৩:৫৯ এএম

চট্টগ্রাম কারাগারে সন্ত্রাসী অমিত মুহুরী খুন

চট্টগ্রাম জেলের ভেতর মারামারিতে খুন হয়েছেন যুবলীগ নামধারী দুর্ধর্ষ সন্ত্রাসী অমিত মুহুরী (৩২)। বুধবার সন্ধ্যায় ৩২ নম্বর সেলে রিপন নামের একজনের সঙ্গে কথা কাটাকাটি হয় অমিত মুহুরীর। পরে রিপন ‘ভারী জিনিস’ দিয়ে অমিতকে আঘাত করে। আহত অবস্থায় চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হলে মারা যায় অমিত।

বিষয়টি নিশ্চিত করে চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগারের সিনিয়র জেল সুপার কামাল হোসেন বলেন, কারাগারে আহত হওয়ার পর হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা গেছে।

রাত ১১ টার দিকে চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে অমিতকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়। রাত ১টার দিকে তাকে মৃত ঘোষণা করা হয়।

চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সহকারি রেজিস্ট্রার ডা.খুরশীদ আনোয়ার চৌধুরী  বলেন, রোগীকে গুরুতর আহত অবস্থায় আনা হয়েছিল। তার মাথার উপরে এবং পেছনে গুরুতর জখম ছিল। মাথায় লৌহজাত ধাতুর বড়ো রকমের আঘাত ছিল। ৩০টির মতো সেলাই দিতে হয়েছে। হাসপাতালে আনার পর থেকে তাকে অক্সিজেন দিয়ে রাখা হয়েছিল। অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে তার মৃত্যু হয়েছে।

হাসপাতালে যাওয়া অমিতের বাবা অরুণ মুহুরী  বলেন, রাত ১১ টার দিকে কারাগার থেকে আমাকে ফোনে জানানো হয়; অমিতকে আহত অবস্থায় হাসপাতালে নেওয়া হয়েছে। এরপর আমি এখানে এসেছি। আমার ছেলেকে কারা খুন করেছে, আমি এর তদন্ত এবং বিচার চাই।

চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগারের কারাধ্যক্ষ নাশির আহমেদ বলেন, চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগারে ৩২ নম্বর সেলে অমিত মুহুরিসহ তিনজন বন্দী ছিলেন। রাত ১০টার দিকে আরেক বন্দী রিপনের সঙ্গে অমিত মুহুরির কথা-কাটাকাটি হয়। একপর্যায়ে রিপন ইট দিয়ে অমিতের মাথায় আঘাত করেন। গুরুতর অবস্থায় অমিতকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজে আনা হয়। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় অমিত মারা যান।

নিহত অমিত মুহুরি পুলিশের তালিকাভুক্ত সন্ত্রাসী। তাঁর বিরুদ্ধে জোড়া খুনসহ ১৫টি মামলা আছে। ২০১৭ সালের ২ সেপ্টেম্বর গ্রেপ্তারের পর থেকে তিনি কারাগারে বন্দী ছিলেন।

অমিত মুহুরী পরে আলাদা করে আলোচনায় আসেন ছোটবেলার বন্ধুকে খুন করে। ইমরানুল করিম ইমন ও অমিত মুহুরী বাল্যবন্ধু। রাউজান পৌরসভা এলাকায় তাদের বাড়ি। ২০১৭ সালের ৮ আগস্ট রাতে অসুস্থতার কথা বলে নন্দনকাননের বাসায় ইমনকে ডেকে নিয়ে যায় অমিত মুহুরী। ৯ আগস্ট ভোরে নৃশংসভাবে খুন করেন তাকে। শুরুতে ড্রামের ভেতরে মরদেহ রেখে এসিড ও চুন ঢেলে সেটা গলিয়ে হাড়গোড় নদীতে ফেলে দেওয়ার পরিকল্পনা করেন। খুনের পর ইমনের লাশ বাথরুমে রেখে রাতভর গান শোনেন অমিত মুহুরী। সাথে ছিল স্ত্রী চৈতী ও বেশ কয়েকজন বন্ধু-বান্ধব। গানের সাথে চলে ইয়াবা সেবনের আসর। কিন্তু একদিন পরও মরদেহ অবিকৃত থাকায় সেটি খণ্ড খণ্ড করে কেটে ফেলার চেষ্টা করে। মরদেহ শক্ত হয়ে যাওয়ায় অমিতের ওই পরিকল্পনাও ব্যর্থ হয়। এর পর জোগাড় হয় এসিড, চুন, সিমেন্ট, বালি। ড্রামে লাশ ভরে এসিড ঢেলে গলানোর চেষ্টা হয়। এরপর তাতে চুন ঢেলে সিমেন্ট, বালি দিয়ে ঢালাই করা হয়। পরে ড্রাম ফেলে দেওয়া হয় রাণীর দীঘির পানিতে। ১৩ আগস্ট দীঘি থেকে ড্রামভর্তি গলিত লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। এ ঘটনায় ৩১ আগস্ট অমিতের বন্ধু ইমাম হোসেন মজুমদার ওরফে শিশির (২৭) ও হরিশদত্ত লেনের বাসার নিরাপত্তারক্ষী শফিকুর রহমান শফিকে (৪৬) আটক করে কোতোয়ালি থানা পুলিশ। এর দুই দিন পর কুমিল্লার একটি মাদক নিরাময় কেন্দ্র থেকে অমিত মুহুরীকে গ্রেফতার করে নগর গোয়েন্দা পুলিশ। এ ঘটনায় খুনের দায় স্বীকার করে পরস্পরকে দায়ী করে আদালতে জবানবন্দি দেন শিশির ও অমিত।

ভয়ঙ্কর সন্ত্রাসী অমিত মুহুরী যুবলীগের কেন্দ্রীয় নেতা হেলাল আকবর চৌধুরী বাবরের অনুসারী হিসেবে পরিচিত। ২০১৩ সালে সিআরবিতে রেলওয়ের টেন্ডার নিয়ে জোড়া খুনের মামলার আসামি অমিত মুহুরীকে ২০১৫ সালের ৫ নভেম্বর নগর গোয়েন্দা পুলিশ গ্রেফতার করেছিল। পরে অমিত জামিনে বেরিয়ে আসে।

২০১৭ সালের ১৪ এপ্রিল পহেলা বৈশাখের দিন নগরীর ডিসি হিলে পুলিশের উপর হামলা চালায় অমিত মুহুরী ও তার অনুসারী সন্ত্রাসীরা। এরপর ২৮ এপ্রিল রাতে ঝাউতলায় স্থানীয় কিশোর–তরুণদের মধ্যে ঝগড়া হয়। এর এক পর্যায়ে তারা মারামারিতে জড়িয়ে পড়ে। সেখানে অমিত মুহুরীর অস্ত্র উঁচিয়ে গুলি করার চিত্র ভিডিও ফুটেজে পেয়ে ২৫ মে তাকে গ্রেফতার করে কোতয়ালী থানা পুলিশ। কিন্তু ২৬ জুন অমিত জামিনে বেরিয়ে আসে। এরপর বন্ধুকে খুন করে জেলে যায়।

নগরীর নন্দনকানন এলাকার বাসিন্দা অজিত মুহুরীর বড় ছেলে অমিত। তাদের গ্রামের বাড়ি রাউজান পৌরসভা এলাকার ৯ নম্বর ওয়ার্ডে। এসএসসি পাস করেন রাউজান পৌরসভার সুরেশ বিদ্যায়তন থেকে। এর পর চট্টগ্রাম শহরে এসে ওমর গণি এমইএস কলেজে ভর্তি হলেও উচ্চ মাধ্যমিকের গণ্ডি পেরোতে পারেননি।