বুধবার, ২১ আগস্ট ২০১৯

স্ত্রীর স্বীকৃতি চাইতে গিয়ে পুড়ল নুসরাত

প্রতিবেদক, চট্টগ্রাম

প্রকাশিত: ২৩ এপ্রিল ২০১৯ মঙ্গলবার, ০৯:১৪ এএম

স্ত্রীর স্বীকৃতি চাইতে গিয়ে পুড়ল নুসরাত

স্বামীর কাছে স্ত্রীর অধিকার আদায় করতে চট্টগ্রামের রাউজান থেকে লক্ষ্মীপুরে আসার পর আগুনে দগ্ধ  হয়ে মারা গেলেন রাউজানের শাহীনুর আকতার (২২)।

ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে চিকিৎসাধীন শাহীনুর আক্তার (২২) নামের এই তরুণী সোমবার সকাল সাড়ে ১১টার দিকে মারা যান বলে হাসপাতাল পুলিশ ফাঁড়ির পরিদর্শক মো. বাচ্চু মিয়া জানান।

চিকিৎসকের বরাত দিয়ে তিনি বলেন, শাহীনুরের শরীরের ৪০ শতাংশ দগ্ধ হয়েছিল। রোববার রাত ২টার দিকে বার্ন ইউনিটের আইসিইউতে ভর্তি করা হয়েছিল শাহীনুরকে। তার বাড়ি রাউজান উপজেলার নতুনহাট এলাকার সোনাগাজী গ্রামে।

রোববার লক্ষ্মীপুরের কমলনগর উপজেলার পাটারিরহাট এলাকায় রোববার আগ্নিদগ্ধের ঘটনা ঘটে বলে লক্ষ্মীপুরের পুলিশ সুপার আ স ম মাহাতাব উদ্দিন জানিয়েছিলেন।

প্রথমে লক্ষ্মীপুর সদর হাসপাতালে প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়ে ঢাকা মেডিকেলে পাঠানো হয় শাহীনুরকে।
লক্ষ্মীপুর সদর হাসপাতালে শাহীনুর সংবাদকর্মীদের জানিয়েছিলেন, দুই বছর আগে মোবাইল ফোনে কমলনগরের পাটারীরহাট এলাকার মোহর আলীর ছেলে সালাহ উদ্দিনের সঙ্গে তার প্রেম হয় এবং এর কয়েকমাস পরে রাউজানে তাদের বিয়ে হয়।

বিয়ের পর থেকে তার স্বামী এক বছর শ্বশুরালয়ে আসা-যাওয়া করলেও স্ত্রীকে কখনই নিজের বাড়ি নেওয়ার আগ্রহ দেখায়নি বলে মেয়েটির ভাষ্য।

শাহীনুরের জানিয়েছিলেন, বিভিন্ন সময়ে তিনি শ্বশুরবাড়ি আসার তাগিদ দিলেও তাতে সাড়া দেননি স্বামী সালাহ উদ্দিন। এ অবস্থায় খোঁজখবর নিয়ে গত শুক্রবার রাতে তিনি একাই আসেন স্বামীর বাড়ি। সেখানে এসে দেখতে পান সালাহ উদ্দিন দুই সন্তানসহ অন্য স্ত্রী নিয়ে অনেক আগে থেকেই সেখানে সংসার করছেন।

শাহীনুর নিজেকে স্ত্রী হিসেবে পরিচয় দিলে সালাহ উদ্দিন তা অস্বীকার করেন। এরপর তিনি স্ত্রীর স্বীকৃতি আদায়ের আশায় দুই দিন ধরে এলাকায় বিভিন্নজনের কাছে ধর্না দেন বলে জানান।

বিষয়টি তিনি স্থানীয় চরফলকন ইউনিয়নের চার নম্বর ওয়ার্ড সদস্য মো. হাফিজ উল্যা ও গ্রাম পুলিশ আবু তাহেরকে জানান। তারা বিষয়টি সুরাহা করার কথা বলে দুই দিন সময়ক্ষেপণ করেন বলে মেয়েটির অভিযোগ ছিল।

শাহীনের গায়ে আগুন দেওয়া নিয়ে পরস্পর বিরোধী বক্তব্য পাওয়া গেছে। শাহীনুর মারা যাওয়ার আগে একটি গণমাধ্যমে জানান, তার স্বামী সালাউদ্দিনই আগুন লাগিয়েছে। অপরদিকে সালাউদ্দিনের এলাকার লোকজন বলছে শাহীন নিজে গায়ে আগুন দিয়েছে। 

রোববার বিকালে সালাহ উদ্দিন তাদের বাড়ির পাশের একটি সয়াবিন ক্ষেতে ডেকে নিয়ে গায়ে কেরোসিন ঢেলে আগুন লাগিয়ে দেন বলে শাহীনুর বলেছিলেন।

তবে প্রত্যক্ষদর্শীদের বরাত দিয়ে ইউপি সদস্য হাফিজ উল্যা বলেছেন, ওই তরুণী নিজেই নিজের গায়ে কেরোসিন ঢেলে আগুন দিয়েছেন। গায়ে আগুন ছড়িয়ে পড়লে পাশের এক বাড়িতে গামলার পানিতে ঝাঁপ দিয়েছিলেন।

শাহীনুরের পারিবারিক সূত্র জানায়,  ‘জাফর আলমের দুই সংসার। আগের ঘরে শাহীনুররা ছিল দুই বোন এক ভাই। পরের সংসারে ছিল ৩ ছেলে। শাহীনুরের মা মারা গেলে ৮-৯ বছর আগে শাহীনুর মামার বাড়ি (একই উপজেলার হলদিয়া ইউনিয়নে) চলে যায়। সেখান থেকে ৫-৬ ধরে চট্টগ্রাম শহরে খতিবের হাট এলাকায় ফুফুর সঙ্গে থেকে গার্মেন্টসে চাকুরি করে আসছিলেন শাহীনুর। পোশাক কারখানায় শ্রমিকের কাজে নিয়োজিত থাকা অবস্থায় গত প্রায় দেড়বছর আগে মোবাইলে পরিচয় সূত্রে প্রেম হয় চট্টগ্রাম শহরের বসবাসরত লক্ষ্মীপুরের কমলনগর উপজেলার লদুয়া নতুন বাড়ির মনোহর আলীর ছেলে মো. সালা উদ্দিনের সঙ্গে।’

এ প্রসঙ্গে রাউজান থানার ওসি কেপায়েত উল্লাহ, সেকেন্ড অফিসার নুরুন্নবী লক্ষ্মীপুর থানার বরাত দিয়ে এবং লক্ষ্মীপুর কমলনগর থানার এসআই জাহাঙ্গীর বলেন ‘শাহীনুর তার স্বামী সালাউদ্দিনের বাড়িতে গেলে স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা তাকে বিয়ের কাগজপত্র নিয়ে আসতে বলেন। পরে ওই তরুণী বাজারে গিয়ে কেরোসিন নিয়ে সালাউদ্দিনের বাড়ির পাশের একটি সয়াবিন ক্ষেতে গিয়ে নিজের শরীরে আগুন দিয়ে একটি গোয়াল ঘরে গিয়ে বসেন। ওই সময় এলাকার নারীরা ছুটে গিয়ে পানি দিয়ে আগুন নেভান। তারা জানান, ঘটনার শুরুর দিকে শাহীনুর বলেছেন তিনি নিজে তার শরীরে আগুন দেন। আবার হাসপাতাল আসার পর বলছেন স্বামী আগুন দিয়েছেন। বিষয়টি রহস্যজনক।’

এদিকে মৃত্যুর আগে এবং লক্ষ্মীপুর সদর হাসপাতালে চিকিৎসাধীন থাকা অবস্থায় শাহীনুর একটি সংবাদ মাধ্যমে বলেছেন বিয়ের স্বীকৃতি চাওয়ায় তার স্বামী সালাউদ্দিন কেরোসিন তেল দিয়ে শরীরে আগুন ধরিয়ে দেয়। এই ঘটনায় কমলনগর থানা পুলিশ চারজনকে আটক করেছে বলে জানা গেলেও শাহীনুরের স্বামী এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত পলাতক রয়েছেন।

এদিকে  সোমবার সকালে শাহীনুরের রাউজানের বাড়িতে আসেন লক্ষ্মীপুর থানার এসআই জাহাঙ্গীরসহ একদল পুলিশ। তারা শাহীনুরের বাড়ি থেকে জাফর আলম ও মামা কামাল উদ্দিনকে রাউজান থানার মাধ্যমে লক্ষ্মীপুর নিয়ে যান। রাউজান থানার ওসি কেপায়েত উল্লাহ বলেন ‘আইন প্রক্রিয়া এবং লাশ বুঝে নেয়ার জন্য নিহতের বাবা ও মামাকে লক্ষ্মীপুর থানা নিয়ে গেছে। এ ঘটনায় ওই থানা এবং জেলা পুলিশ বিষয়টি ভালোভাবে তদন্ত শুরু করেছে বলে ওসি জানান।’

নিহতের বাবা জাফর আলম বলেন ‘আমি মেয়ের হত্যার বিচার চাই। আর যেন এ ধরনের ঘটনা না ঘটে, সেজন্য অপরাধীর সর্বোচ্চ মৃত্যুদন্ড দাবি করছি।’