শনিবার, ২১ সেপ্টেম্বর ২০১৯

একুশের রাতে চকবাজারে লাশের পাহাড়

প্রতিবেদক, ঢাকা

প্রকাশিত: ২১ ফেব্রুয়ারি ২০১৯ বৃহস্পতিবার, ০৯:২৮ এএম

একুশের রাতে চকবাজারে লাশের পাহাড়

একুশের রাতে পুরান ঢাকার চকবাজারে চার তলা একটি বাড়িসহ কয়েকটি ভবনে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে অন্তত ৭০ জনের মৃত্যু হয়েছে।

বুধবার রাত সাড়ে ১০টার দিকে অগ্নিকাণ্ডের সূত্রপাত হওয়ার নয় ঘণ্টা পরও তা পুরোপুরি নেভানো সম্ভব হয়নি। অগ্নি নির্বাপক বাহিনীর ৩৭টি ইউনিট আগুন নেভাতে কাজ করছে। সকালে হেলিকপ্টারে করে উপর থেকে পানি ছিটানোর পর আগুন আর দেখা যাচ্ছে না। 

চকবাজারের চুড়িহাট্টা শাহী মসজিদের পেছনের ভবনগুলোতে এই আগুন লাগে। গাড়ির সিলিন্ডার বিস্ফোরণে তা প্রথমে রাস্তার পাশের একটি খাবার দোকানে ছড়িয়ে পড়ে। এরপর কেমিক্যালের গোডাউনে আগুন লাগে, যা আশে পাশে আরও পাঁচটি ভবনে ছড়িয়ে পড়েছিলো তারই ধ্বংসস্তুপ বের করে আনা হচ্ছে এই লাশগুলো।

ভোররাত সাড়ে ৪টার দিকে ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের মেয়র সাঈদ খোকন জানান, এখন পর্যন্ত ২৬ জনের মরদেহ তারা শনাক্ত করেছেন। সেগুলো তারা ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে পাঠিয়েছেন। আহত ও দগ্ধ ৪১ জন সেখানে চিকিৎসা নিচ্ছেন।

এর আগে, ভোররাত ৪টার দিকে ফায়ার সার্ভিসের পরিচালক (ডেভেলপমেন্ট) জুলফিকার বলেন, ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ১২টি ব্যাগে ১২টি মরদেহ আনা হয়েছে। তাদের মধ্যে নারী ও শিশু রয়েছে। ৪টা ১০ মিনিটের দিকে মরদেহগুলো অ্যাম্বুলেন্সে করে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে আনা হয়।

মৃতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে জানান ফায়ার সার্ভিসের পরিচালক জুলফিকার। তিনি বলেন, আমাদের সার্চিং অপারেশন চলছে। আগুনটা রাতে লেগেছিল। সেসময় অনেকে ঘুমিয়ে পড়ছিলেন। এ কারণে হতাহতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে।

ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের মহাপরিচালক (ডিজি) ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) আলী আহমদ খান এর আগে জানান, রাত ৩টা দিকে আগুন নিয়ন্ত্রণে এসেছে। এখন পর্যন্ত নয় থেকে ১০ জনের মরদেহ বিক্ষিপ্তভাবে উদ্ধার করা হয়েছে। তবে মৃতের সংখ্যা এখনও নিশ্চিত নয়। এটি বাড়তেও পারে।

বুধবার রাত পৌনে ১১টার দিকে চুড়িহাট্টা শাহী মসজিদের পেছনের একটি ভবন থেকে আগুনের সূত্রপাত বলে স্থানীয়রা জানান। পরে তা পাশের ভবনগুলোতে ছড়িয়ে পড়ে। সর্বশেষ রাত ৩টার দিকে স্থানীয়দের সহায়তায় আগুন নিয়ন্ত্রণে আনেন ফায়ার সার্ভিসের প্রায় ২০০ কর্মী। তবে ছোট গলি ও পানির স্বল্পতার কারণে আগুন নিয়ন্ত্রণে প্রচণ্ড বেগ পেতে হয়।

ভবনের নীটতলায় ২৪ লাশ

ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স ঢাকা বিভাগের উপপরিচালক দেবাশীষ বলেন, আমার জীবনে অনেক ঘটনা দেখেছি। অসংখ্যা আগুন নেভানোর অভিযানে অংশ নিয়েছি। কিন্তু এটা সম্পূর্ণ আলাদা অভিজ্ঞতা। ভূমিকম্প হলে যেমন মুহূর্তের মধ্যে সব ধ্বংস হয়ে যায়, এখানকার অবস্থাও তেমন। এখানে চারতলা একটি ভবনের নিচতলায় আমরা ২৪টি মরদেহ পেয়েছি আমরা। আগুন লাগার পরে সম্ভবত সবাই নামার চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু কেমিক্যাল, গ্যাস সিলিন্ডার, ট্রান্সফর্মার, প্লাস্টিক দানা- সমস্ত দাহ্য পদার্থ এক সঙ্গে বিস্ফোরণ হওয়ায় কয়েক মুহূর্তে আগুন ছড়িয়ে পড়ে।

মোট ছয়টি ভবনে আগুন লেগেছে। একটি পুরো পুড়ে গেছে, বাকিগুলো আংশিক। ভবনগুলোতে যারা আটকে পড়েছিলেন তারা মারা গেছেন। এখানে উল্লেখ করার মতো বিষয় হলো, ওয়াহেদ ম্যানসন, এর পাশে ফুটপাত, চায়ের দোকান, যেখানে যারা ছিলেন সবাই ঝলসে গেছে। সারি সারি লাশ আমরা উদ্ধার করেছি। মোটরসাইকেল, পিকআপ ভ্যান, প্রাইভেট কার সব যেমন ছিল তেমন আছে। ধ্বংসস্তূপে আমরা কঙ্কাল পেয়েছি। অনেকে হয়তো উদ্ধার পেয়েছেন, বলেন তিনি।

স্বজনদের খুঁজছে অনেকে

চকবাজারে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় বেশ কয়েকজন নিখোঁজ রয়েছে। নিখোঁজদের খুঁজতে হাসপাতালে ভীড় করছেন স্বজনরা। বৃহস্পতিবার সকালে নিখোঁজের ছবি নিয়ে ঢাকা মেডিকেলসহ রাজধানীর হাসপাতালগুলোতে ঘুরছেন অনেকে।

জানা গেছে, আগুনের সূত্রপাত হওয়া রাজ্জাক ভবনের সামনে ভবনের সামনে তিনটি মোটরসাইকেলে ছয়জন ছিল। তাদের চারজনের খোঁজ পাওয়া গেছে। তবে রোহান ও সিয়াম নামের দুইজনের খোঁজ পাওয়া যায়নি।

ওই এলাকার বাসিন্দা মো. মাহিরকে খুঁজে পাচ্ছে না তাঁর পরিবারের লোকজন। ভাইকে খুঁজতে ঢাকা মেডিকেলে ঘুরে বেড়াচ্ছেন বোন নূর এ আনহা।

এদিকে জহির উদ্দিন নামের একজনও নিখোঁজ রয়েছেন। তার খোঁজে ঢাকা কমেডিকেল কলেজে ভাগ্নে রিফাত নেওয়াজ। আগুনে জহির উদ্দিনের দোতলা বাড়ি পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। ভাগ্নে রিফাত জানান জহিরের মুঠোফোন বাজলেও কেউ উত্তর দিচ্ছে না।

গিয়াস উদ্দিন নামের আরেকজন এসেছেন তাঁর ভাবির খোঁজে। অগ্নিকাণ্ডের পর ভাবি নিখোঁজ রয়েছেন বলে তিনি জানান। চুরিহাট্টার একটি ফার্মেসিতে ওষুধ কিনতে গিয়েছিলেন গিয়াসের ভাবি।

খেলনার দোকানের মালিক আবদুর রহিম। আগুন লাগার সময় দোকান বন্ধ করছিলেন। কিন্তু তাকে আর পাওয়া যাচ্ছে বলে জানালেন তার ভাই ইসমাইল।