মঙ্গলবার, ১৯ ফেব্রুয়ারি ২০১৯

কর্ণফুলীতে মাতম, ছেলে ফিরবে আশায় বাবা-মা

প্রতিবেদক, চট্টগ্রাম

প্রকাশিত: ০৯ ফেব্রুয়ারি ২০১৯ শনিবার, ১২:০৩ পিএম

কর্ণফুলীতে মাতম, ছেলে ফিরবে আশায় বাবা-মা

“আঁর মনে টানের, আঁর উগ্গা পোয়া, আঁর পোয়া আঁর বুকুত ফিরি আইবু” (আমার মনে হচ্ছে, আমার একমাত্র ছেলে, আমার ছেলে আমার বুকে ফিরে আসবে)। বঙ্গোপসাগরে মাছ ধরার নৌকাডুবিতে নিঁখোজ একমাত্র সন্তান জাবেদকে হারিয়ে পাগলপ্রায় নুর নাহার বেগম প্রতিবেদককে চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষায় এসব কথা বলেন।

গত ৪ ফেব্রুয়ারি সোমবার ভোরে বঙ্গোপসাগরের সেন্টমার্টিন থেকে ৩০ মাইল পশ্চিমে গভীরে দূর্ঘটনায় মাছ ধরার ‘এফবি শাহ বদর-২’ নামে একটি জাহাজ ডুবিতে ১৪ জন নিঁখোজ হন। এতে কর্ণফুলী উপজেলা চরপাথরঘাটা ৭নং ওয়ার্ড ইছানগর এলাকার এজাহার মিয়ার বাড়ির জাবেদসহ ৪জন নিঁখোজ রয়েছে।  শুক্রবার পর্যন্ত তাদের কোন খোঁজ পাওয়া যায়নি।

শুক্রবার সকালে কথা হলে নুর নাহার বেগম বলেন, জাবেদের বয়স যেত্তে দুই বছর আছিল, তার বাপ মারা গেইয়্যি। হস্ট গরি আঁই জাবেদরে বড় গইরগি। আঁর উগ্গামাত্র পোয়ারলাই আঁর পাশান ফাডি যারগুই। আরে এহন হনে চাইবু। জামাই নাই, উগ্গা পোয়া আছিল ইবাও নাই, সম্বল ত কিছু নতাগিল। কেয়াই ত হন হবর লইতু ন আইয়্যি। আঁই হনডে যাই বাইচ্ছুম। (জাবেদের বয়স যখন দুই বছর ছিল, তখন স্বামী মারা যায়। অনেক কষ্টে জাবেদকে বড় করেছি। আমার একমাত্র ছেলের জন্য পাষাণ ফেটে যাচ্ছে। আমাকে এখন কে দেখবাল করবে। স্বামী নেই, একটা ছেলে ছিল সেও নেই, সম্বলতো কিছুই রইল না। কেউ খবর নিতে আসেনি। আমি এখন কোথায় গিয়ে বাঁচব।) কথা বলতে বলতে নুর নাহারের চোখে পানিতে টল টল করছিল। 

ইছানগর এজাহার মিয়ার বাড়ির আবদুল হাশেমের তিন ছেলের মধ্যে দুই সন্তান আবদুল খাইর (২৬) ও আবদুল হাকিম (১৯) একই জাহাজে নিখোঁজ রয়েছে। শুক্রবার সকালে তাদের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায় এক হৃদয়বিদারক দৃশ্য। বাড়িতে একদিকে নিরবতা অন্যদিকে বাঁশের কুঁড়ে ঘরের এক রুমে চলে কোরআন খতম। কথা হলে দুই সহোদরের বড় ভাই আবদুল হালিম বলেন, দুই ভাইয়ের নিখোঁজের খবর পেয়ে বয়োবৃদ্ধ বাবা গত কয়েকদিনে শারীরিক ভাবে অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। গত এক বছর আগে মাছ ধরার জাহাজে চাকরি নেয় দুই ভাই। তাদের কোন উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ না দিলেও অন্তত দুই ভাইয়ের লাশ তারা দেখতে চায়। ঘটনার চারদিন ফেরিয়ে গেলেও জাহাজের মালিকের পক্ষ থেকে কোন ধরনের খোঁজ খবর নেয়া হয়নি বলে তিনি দাবী করেন।

ডাহাজ ডুবি থেকে প্রাণে বেঁচে ফিরে আসা আলাউদ্দীনের বরাত দিয়ে তিনি আরো বলেন, বিগত ১ ফেব্র“য়ারি মাছ ধরার জন্য ‘শাহ বদর-২’ জাহাজটি  গভীর সাগরে যায়। ৪ ফেব্র“য়ারি সোমবার ভোরে ঘটনার দিন ভোরে ‘শাহ বদর-২’ জাহাজে প্রায় ৪ টন মাছ ধরা হয়। ভোর যখন সাড়ে ৪টা ঠিক তখন একটি বড় জাহাজের আলো এসে তাদের জাহাজে পড়ে। ওই সময় ক্যাপ্টেন জাহাজটি স্থান পরিবর্তন করতে চাইলে মুহূর্তেই একটি বড় ঢেউ এসে জাহাজকে আঘাত করে। ঢেউ এর আঘাতে জাহাজটি ডুবে গেলে ২০ জন সাগরে নিখোঁজ হলে কোস্টগার্ড ৬জনকে উদ্ধার করে। এদের মধ্যে ৫জনকে জীবিত ও একজনকে মৃত উদ্ধার করা হয়।

কর্ণফুলী উপজেলার শিকলবাহা এলাকার নিখোঁজ এনামুল হকের বাবা আবদুস ছালামের সাথে কথা হলে তিনি বলেন, তার ছেলে এনামুল হকের কোন খোঁজ পাওয়া যায়নি। এনামুল হকের স্ত্রী ও তিন সন্তান রয়েছে। জাহাজের মালিকের সাথে এ বিষয়ে যোগাযোগ করা হলেও তেমন সহযোগিতা পাচ্ছেন না বলে তিনি অভিযোগ করেন।  

কোস্ট গার্ড পূর্ব জোনের (অপারেশন) লে. কমান্ডার শুভাশীষ বলেন, জাহাজের নিখোঁজ ১৪ জনের সন্ধানে উদ্ধার অভিযান চলছে। এখনো  কোনো খবর পাওয়া যায়নি

এফবি শাহ বদর-২ জাহাজের মালিক তৈয়ব আলী বলেন, ট্রলার ডুবে যাওয়ায় আমাদের তিন কোটি টাকার ক্ষয়ক্ষতি সাধিত হয়েছে। যেহেতু এটা দূর্ঘটনার কারনে ট্রলার ডুবি হয়েছে আমাদের গুছিয়ে উঠতে সময় লাগছে। নিখোঁজের পরিবারগুলোকে সহযোগিতা প্রদান করা হবে বলে তিনি জানান।