ঢাকা, মঙ্গলবার, ২২ মে ২০১৮

উপকূলীয় বেড়িবাঁধ নিয়ে শুধুই হতাশা

আনোয়ারা প্রতিনিধি

প্রকাশিত: ২৯ এপ্রিল ২০১৮ রবিবার, ০৯:১৫ এএম

উপকূলীয় বেড়িবাঁধ নিয়ে শুধুই হতাশা

১৯৯১ সালের ২৯ এপ্রিলের প্রলয়ংকরী ঘূর্নিঝড়ের পর কেটে গেছে ১৭ বছর। সেই ঘূর্ণিঝড়ের পরে জন্ম নেওয়া শিশুটিও আজকের দিনে কৈশোর পেরিয়ে যুবক বয়স। তারা ঝড়ের ভয়াল দেখেনি হয়ত, যৌবনের উচ্ছ্বলতার এই সময়েও তাদের চোখের সামনে রয়েছে‘৯১ এর ঘূর্নিঝড়ের দগদগে স্মৃতি । হা করে থাকা বেড়িবাঁধের মুখ, বিভিন্ন জায়গায় লন্ডভন্ড অবস্থা, সংস্কারের নামে হরিলুট, জোয়ার-ভাটায় বাড়ির আঙ্গিনায় আঁছড়ে পড়া সাগরের লোনা জলের ঢেউ দেখে অভ্যস্ত উপকূলের মানুষগুলোর জন্য যেন আল্লাহ ছাড়া কেউ নেই।

সাধারণত এপ্রিল-মে এই দুই মাস প্রাকৃতিক দুর্যোগের জন্য বিপদজনক সময় হিসাবে ধরা হয়। চলতি এপ্রিল ও সামনের মে মাসে একাধিক নিম্মচাপসহ ঘূর্ণিঝড়ের পূর্বাভাস রয়েছে আবহাওয়া অধিদপ্তরের। এই পূর্বাভাস কাঁপন ধরিয়েছে উপকূলবাসীর বুকে।

উপকূল রক্ষায় সরকারের গৃহীত বেড়িবাঁধ নির্মাণে সরকারের ২৮০ কোটি টাকার প্রকল্পে ২৫০ কোটি টাকার কাজ হবে আনোয়ারায়। ২০২০ সালের জুন মাসে প্রকল্পের কাজ শেষ হওয়ার কথা। কিন্তু যেভাবে কাজ চলছে তাতে অগ্রগতি মোটেও সন্তোষজনক নয় বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা। এ অবস্থায় আসন্ন বর্ষা মৌসুমে আবারো জলোচ্ছাসের আশংকায় উদ্বিগ্ন উপক’লের মানুষ।

পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী বিদ্যুৎ কুমার সাহা অবশ্য বলেছেন , সামনের বর্ষা মৌসুমে সাগরের লোনাজলে বসতবাড়ি যাতে প্লাবিত না হয় সে বিষয়টি মাথায় রেখে কাজ চলছে। অতীতের অভিজ্ঞতায় বাঁধের যেসব পয়েন্ট ঝুঁকিপূর্ণ সেখানকার কাজে অগ্রাধিকার দেয়া হচ্ছে। এখন পর্যন্ত ৩৬ শতাংশ কাজ শেষ হয়েছে বলে জানান তিনি।

পানি উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তার বক্তব্যের সঙ্গে বাস্তবতার ব্যবধান বিস্তর। বাঁধের বিভিন্ন অংশে পানি উন্নয়ন বোর্ড নিয়োজিত একাধিক ঠিকাদার কাজ করলেও ভাঙ্গা বাঁধের কোন কোন অংশের জন্য এখনো কার্যাদেশও দেয়া হয়নি। আবার কার্যাদেশ পাবারও ঠিকাদার কাজ শুরু করেনি এমন এলাকাও রয়েছে। একই সঙ্গে নি¤œমানের ব্লক নির্মাণ ও বাঁধের কাজের ক্ষেত্রে নানা অনিয়মের অভিযোগও আছে।

প্রকল্পে বাঁধের কিছু অংশে ব্লক বসানোর কথা থাকলেও পুরো বেড়িবাঁধ ব্লকের আওতায় আসেনি। বাঁধের যেসব অংশ ঝুঁকিপূর্ণ সেসব এলাকা ব্লক বসানোর জন্য নির্ধারণ করা হয়েছে। বাকি অংশে হবে মাটির বাঁধ। চলমান কাজগুলোর পাশাপাশি দক্ষিণ গহিরা এলাকায় প্রায় ১৩শ মিটার এলাকায় ৬২ কোটি টাকা ব্যয়ে বাঁধ ও ব্লক বসানোর কাজ হাতে নেয়া হয়েছে। আগামী বছর এ কাজ শুরু হবে।

এলাকাবাসীর অভিযোগ, পানি উন্নয়ন বোর্ডের যথাযথ তদারকির অভাবে কাজের অগ্রগতি ও মান নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। বেড়িবাঁধের বার আউলিয়া থেকে পিচের মাথা পর্যন্ত প্রায় পাঁচ কিলোমিটার অংশে ব্লক বসানোর কাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে রয়েছে।
স্থানীয়রা দাবি করেন, উপক’লীয় রায়পুর ইউনিয়নের বেড়িবাঁধ নির্মাণে ঘাটকুল ও তেলিপাড়া এলাকায় প্রায় দুই কিলোমিটার বেড়িবাঁধের মাটি ভরাটের কাজ পায় ঠিকাদার সাহাবউদ্দিন । যার আনুমানিক মূল্য প্রায় ৩ কোটি টাকা। এছাড়া ফকির হাট ও হাড়িয়াপাড়া এলাকায় ৭১০ মিটার বেড়িবাঁধ নির্মাণ ও ব্লক বসানোর কাজ পান মশিউর রহমান। এটির আনুমানিক মূল্য প্রায় ১৮ কোটি টাকা। তারা উভয় ঠিকাদার গত তিন মাস আগে বেড়িবাঁধ নির্মাণের কার্যাদেশ পেলেও সঠিক সময়ে কাজ শুরু করেনি। ঠিকাদার সাহাবুদ্দিন গত এক সপ্তাহ আগে থেকে ঘাটকুল এলাকায় মাটি ভরাটের কাজ শুরু করে। কয়েকদিন আগে থেকে বৃষ্টি শুরু হওয়ায় বর্তমানে মাটি ভরাটের কাজ বন্ধ রয়েছে। পানি উন্নয় বোর্ডের নির্দেশনা মতে ভরাটকৃত মাটি রোলার দিয়ে চেপে মজবুত করার কথা থাকলেও সেটি মানছেননা ঠিকাদাররা। তারা শুধুমাত্র স্কেভেটর দিয়ে মাটি ভরাট করেই কাজ শেষ করছেন।

এদিকে বঙ্গোসাগর তীরে অবস্থিত আনোয়ারা উপকূলীয় বাঁধের দক্ষিণ পরুয়া পাড়া, উত্তর পরুয়া পাড়া ও বারআউলিয়া অংশে ব্লক বসানো হলেও বাঁধের বিরাট অংশ রয়েছে ভাঙ্গাচোরা অবস্থায়। পূর্ব গহিরা অংশে ফকির হাট ও হাড়িয়াপাড়া এলাকায় ৭১০ মিটার এলাকা বেড়িবাঁধ নির্মাণের পাশাপাশি ব্লক বসানোর কথা থাকলেও সেখানে কোন কাজ শুরু হয়নি। ঘাটকূল এলাকায় কিছুটা মাটি ভরাটের কাজ হলেও তা উল্লেখ করা মত নয়। তেলিপাড়ায় আধাকিলোমিটার এলাকায় এখনো মাটি ভরাটের কাজ শুরুই করেনি। অথচ এই অংশটি বর্তমানে সবচেয়ে ঝূকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে। আগামী পূর্ণিমার জোয়ারে শঙ্খ নদীর পানি বৃদ্ধি পেলে এই এলাকা দিয়ে লোকালয়ে পানি ঢুকে তলিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা করছেন স্থানীয়রা।

পানি উন্নয়ন বোর্ড সূত্র জানায় , ফকিরহাট ও ঘাটকুল এলাকায় গত তিন মাস আগে ঠিকাদাররা কার্যাদেশ পায়। আগামী জুন মাসে তাদের কাজের মেয়াদ শেষ হবে। এর মধ্যে কাজ শেষ করতে না পারলে ঠিকাদারদের পুনরায় আবেদন করে মেয়াদ বৃদ্ধি করতে হবে।

খোর্দ্দ গহিরা এলাকার বাসিন্দা আবু তাহের বলেন, বেড়িবাঁধ নিয়ে হরিলুটই নিয়মে পরিণত হয়েছে। অনেক ঠিকাদার অপেক্ষায় থাকেন বাঁধ বিলীন হওয়ার জন্য, যাতে সরকার থেকে বেশি টাকা নেওয়া যায়। অবস্থা এমন যে, উপকূলবাসীর যেন আল্লাহ ছাড়া যেন কেউ নেই। স্থানীয় ইউপি সদস্য মো. ঈসমাইল বলেন, একটি মজবুত বেড়িবাঁধের আশায় এলাকাবাসী স্থানীয় ঠিকাদারদের সব ধরণের সহায়তা দিচ্ছে। কিন্তু তাদের কার্যক্রমে হতাশ হচ্ছেন স্থানীয়রা।

সারাবেলা/এনআই/এএম