ঢাকা, মঙ্গলবার, ১৯ জুন ২০১৮

রোগী অন্তপ্রান একজন ডা. ইকবাল

সারাবেলা প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ২১ ফেব্রুয়ারি ২০১৮ বুধবার, ০৭:৫২ পিএম

রোগী অন্তপ্রান একজন ডা. ইকবাল মৃত্যুর দুয়ার থেকে ফিরে আসা জাকিরের পাশে ডা. ইকবাল

বাংলাদেশে চিকিৎসকদের বিষয়ে নেতিবাচক ধারণা আছে প্রায় সবার। সাম্প্রতিক সময়ে ‘লোভী ডাক্তার’ প্রসঙ্গটি পরীক্ষায় প্রশ্নপত্রেও এসেছে। খারাপের ভিড়ে ভাল ডাক্তার কয়জন ? একবাক্যে উত্তর আসবে হাতেগোণা। তবুও কেউ কেউ আছেন যারা চিকিৎসা পেশাকে নিয়েছেন সেবার ব্রত হিসাবে। চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজের চিকিৎসক ইকবাল মাহমুদ তেমনই একজন। গত ২৯ জানুয়ারি চট্টগ্রাম মেডিকেলের হৃদরোগ বিভাগে আসা মৃত্যুপথ যাত্রী একজন রোগীর জীবন বাঁচাতে ডা. ইকবাল মাহমুদের লড়াই মনে করে দিয়েছে মানবতাবাদী চিকিৎসক এখনও আছেন। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের কল্যাণে অসাধ্য সাধনের সেই বর্ণণা সামনে এসেছে। এভাবে চলছে তাঁর প্রতিদিনের সংগ্রাম। 

পাঠকের জন্য হুবহু তুলে ধরা হল ডা. ইকবাল মাহমুদের সেদিনের চেষ্টার আদ্যপান্ত।

২৯/০১/১৮ তারিখ, সোমবার। প্রতিদিনের চেয়ে একটু বেশিই ব্যস্ততা দিয়েই আমাদের নাইট ডিউটি শুরু।চমেকের সবচেয়ে ব্যস্ততম ওয়ার্ড,কার্ডিওলজি সিসিইউ।

সাড়ে ১০ টার দিকে প্রচন্ড বুক ব্যথা নিয়ে জাকির হোসেন নামে একজন রোগী আসলেন,দুই দিনের বুকে ব্যথার হিস্ট্রি,ইসিজিতে হার্ট অ্যাটাক স্পষ্ট।

কেন দেরি করে আসলেন তার জন্য বকতে বকতে আমি পুওর ফান্ড থেকে ক্যানুলা আর চেস্ট লিড দিয়ে রোগীকে বেডে পাঠাচ্ছিলাম।রোগীকে বেডে নিতে না নিতেই ধপাস করে শব্দ,সাথে সাথে দৌঁড়ে গিয়ে দেখি রোগী ফ্লোরে পড়ে গেছেন।তার দুই মেয়ে কান্নাকাটি করছে।ওয়ার্ডবয় তাকে বেডে টেনে নেয়ার চেষ্টা করছে।তাড়াতাড়ি চেষ্ট লিড লাগিয়ে মনিটর অন করলাম,দেখি রোগীর হার্ট বন্ধ(#কার্ডিয়াক_এরেস্ট)।
পৃথিবীর যে কোন দেশেই এই অবস্থা থেকে বাঁচার সম্ভাবনা ১০% এর নীচে, বাংলাদেশে একটা সরকারী হাসপাতালে এই হার ১% ও হবে না।

রোগীকে ফ্লোরে রেখেই #সিপিআর(বাইরে থেকে চাপ দিয়ে হার্ট চালু করার প্রক্রিয়া,যা অনেক হলিউড মুভ্যিতে দেখা যায়) দেয়া শুরু করলাম।এই অবস্থায় অনেকটা ফ্লোরে শুয়ে রোগীর শ্বাসনালীতে টিউব দিলাম( ইনটিবিউশন)। একেবারে প্রস্তুতিসহ সবার সাপোর্ট নিয়ে ও এই টিউব দেয়া অনেক কঠিন একটা কাজ।সেটা করতে হলো মাটিতে বসে,শুয়ে।

ইনটিবিউশন নিয়ে কিছু কথা বলার আছে।গতবছর যখন কার্ডিওলজি ডিপার্টমেন্টে জয়েন করি,অনেক কমবয়সী রোগীকে হার্ট এটাকে চোখের সামনে মারা যেতে দেখতাম।আইসিইউতে আগে ট্রেনিং করার কারণে ব্যাপারটা মেনে নিতে কষ্ট হত।আমার মনে হত কিছু কিছু রোগীর ক্ষেত্রে আরেকটু চেষ্টা করতে পারলে ভালো হত।কিন্তু তার জন্য দরকার কৃত্রিম শ্বাসযন্ত্র(ভেন্টিলেটর)।যা চট্রগ্রাম মেডিকেল কার্ডিওলজিতে নাই।বিকল্প হিসেবে যদি একটা ভেইন সার্কিট কেনা যায়( বেলুনসহ ছবির সবুজ টিউব টা) তবে সাময়িকভাবে এসব রোগীকে কৃত্রিম শ্বাস চালু করে পরবর্তীতে কোন আইসিইউতে পাঠানো যেত।অনেক রোগীর এক্ষেত্রে বেঁচে যাওয়ার সম্ভাবনা বাড়ে।তাই এসেই একটা ভেইন সার্কিট কিনলাম।এরপর আমি বেশ কয়েকজন রোগীকে ইনটিবিউশনের পর ওই সার্কিট দিয়ে আইসিইউ তে পাঠিয়েছিলাম।যার মধ্যে আমার খুবই শ্রদ্ধেয় একজন সিনিয়র চিকিৎসকের বাবাও ছিলেন।

কিন্তু কেউ দুই তিন দিনের বেশি বাঁচে নি। মাঝে মাঝে হতাশ হয়ে যেতাম।একদিন ঔ বড় ভাইকে বললাম,ভাই এই পর্যন্ত কেউ তো ফিরলো না।উনি বললেন,তোর ইনটিবিউশনের পর আমার বাবা আরো পাঁচ ঘন্টা দুনিয়াতে ছিলেন,এটা অনেক কিছুরে ভাই।তুই চালিয়ে যা।
তারপর থেকে ভাবি কারো আপনজন বাড়তি দুই তিনদিন বেঁচে ছিল,এটাও কম কি?
আমার খু্ব ইচ্ছা ছিল,অন্তত একজন রোগী হলেও আমার এই সার্কিট দিয়ে কার্ডিয়াক এরেস্ট থেকে ফিরে আসবে।

একজন ডাক্তারের সিপিআর,ইন্টিবিউশনের পর যদি কোন রোগী বেঁচে যান। তার যে অনুভূতি, তৃপ্তি, বেঁচে থাকার জন্য আমার মত ক্ষুদ্র একজন চিকিৎসকের আর বেশি কিছু দরকার নাই।তাই লেগে থাকতাম,আল্লাহ যদি এই সৌভাগ্য দেন কখনো।

যা বলছিলাম সেই সোমবার, সিপিআরের পর রোগীর হার্টবিট চালু হলো কিন্তু ছন্দপতন শুরু।জীবনঘাতি হার্টের ছন্দপতন (ভেন্টিকুলার ফিব্রিলেশন) শুরু হলো, দৌঁড়ে এসে সহকর্মী ডা.রাজীব দে কয়েকবার ইলেকট্রিক শক( ডিসি শক) দিলেন।এরপর রোগীর হার্ট এবং শ্বাস চালু হল।মেডিকেল আইসিইউ তে সিট না পেয়ে আমার সেই সার্কিটসহ রোগী একটা প্রাইভেট আইসিইউ তে ভর্তি হলেন।পরের দিন লাইফসাপোর্ট অবস্থায় রোগীকে দেখে আসলাম।তারপর সিনিয়র স্কেল পরীক্ষা দিতে ঢাকা গেলাম,মন পড়ে রইলো আইসিইউ তে।দোয়া করতে থাকলাম,যেন এই রোগী অন্তত বেঁচে যান।প্রতিদিন রোগীর খবর নিচ্ছিলাম। ৪ ফেব্রুয়ারি রোগীকে লাইফসাপোর্ট থেকে খোলা হলো। ৭ তারিখ রোগী হাসপাতাল থেকে ছুটি নিয়ে বাড়ি যাবেন।সকালবেলা রোগীর ছেলের ফোন,স্যার বাবা মা আপনাকে দেখতে চান।আমারো জাকির হোসেনকে দেখার খুব ইচ্ছে। দুপুরের দিকে গেলাম ঐ ক্লিনিকে।ঢুকে সালাম দিতেই সেই রাতে কান্না করতে থাকা রোগীর মেয়ে বললেন আব্বু,উনাকে ছিনসো?জাকির হোসেন মুচকি হেসে আমাকে বললেন,আজকে থেকে যত দিন বাঁচি আপনাকে আমি বাবা ডাকতে চাই।আপনি আজকে থেকে আমাদের আপনজন।

আপনি না থাকলো আজকে আমার বাচ্চারা হয়ত এতিম হয়ে যেত।অনেক কথা হল,জাকির সাহেব পেশায় চিংড়ি মাছের পোনা ব্যবসায়ী,ফৌজদারহাটের স্থায়ী বাসিন্দা, তিন কন্যা এক পুত্রের জনক।আমাকে অনেক করে সপরিবারে বাসায় দাওয়াত দিলেন,পরবর্তী চিকিৎসার ব্যাপারে পরামর্শ চাইলেন।ক্লিনিকের মালিককে বলে আমার এই বুড়ো ছেলের আইসিইউ`র বিলও কিছু কমিয়ে দিলাম।

যখন হাসপাতাল থেকে ফিরছিলাম অনন্য এক ভালোলাগায় মনটা বারবার নেঁচে উঠছিল।চাকুরীর পাঁচবছরে অনেক ক্যাডার বন্ধুরা ইউএনও,এডিশনাল এসপি,অনেককে সরকার বিদেশে স্কলারশীপে পড়তে পাঠিয়েছে,ম্যাক্সিমাম ক্যাডার ষষ্ঠ গ্রেডে বেতন পাচ্ছেন।আর আমাদের দশজন মেডিকেল অফিসার বসার একটা রুম পর্যন্ত নাই,সেই নবম গ্রেডেই আছি।বুড়ো বয়সেও মাটিতে বসে রোগী দেখি......আরো কত অপ্রাপ্তি।

তাতে কি?? কিচ্ছু যায় আসে না।আমি এমন অসংখ্য জাকির হোসেনের বাবা হতে চাই।

আল্লাহর কাছে অনেক অনেক কৃতজ্ঞ।
আলহামদুলিল্লাহ।
ভালো আছি।।
ভলোবাসি,
সরকারী হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা এদেশের হত দরিদ্র সকল মানুষকে।