ঢাকা, সোমবার, ১১ ডিসেম্বর ২০১৭

চট্টগ্রামে অভিজাত আবাসিক এলাকায় ফ্ল্যাটের দাম কমেছে

সারাবেলা প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ১১ নভেম্বর ২০১৭ শনিবার, ০৯:৪৫ পিএম

চট্টগ্রামে অভিজাত আবাসিক এলাকায় ফ্ল্যাটের দাম কমেছে

চট্টগ্রাম নগরীর অভিজাত আবাসিক এলাকার মধ্যে খুলশী অন্যতম। গত কয়েক বছর আগেও এ এলাকায় প্রতি বর্গফুট ফ্ল্যাটের দাম ছিল ৮-১০ হাজার টাকা। কিন্তু গত দু-তিন বছর এ এলাকায় ফ্ল্যাট বিক্রি নেই বললেই চলে। এজন্য মন্দা কাটিয়ে উঠতে ফ্ল্যাটের দাম কমিয়ে দিয়েছে আবাসন নির্মাতা প্রতিষ্ঠানগুলো। বর্তমানে এর দাম নেমে এসেছে প্রতি বর্গফুট ৫-৭ হাজার টাকায়। এতে ফ্ল্যাট কিনতে গ্রাহকদের আগ্রহ বাড়ছে।

চট্টগ্রামে শীর্ষস্থানীয় আবাসন কোম্পানির মধ্যে রয়েছে— সানমার প্রপার্টিজ লিমিটেড, ইকুইটি প্রপার্টি ম্যানেজমেন্ট লিমিটেড, বিটিআই, ইপিক প্রপার্টিজ লিমিটেড, এবিসি ফিনলে প্রপার্টিজ লিমিটেডসহ আরো কয়েকটি প্রতিষ্ঠান। চট্টগ্রাম নগরীর অভিজাত আবাসিক এলাকাগুলোয় এসব প্রতিষ্ঠানের বিভিন্ন প্রকল্পে ফ্ল্যাটের দাম আগের চেয়ে কমিয়ে এনেছে।
আবাসন খাতের উদ্যোক্তারা বলেন, ২০০৮ সাল থেকে চট্টগ্রামে আবাসন খাতে উত্থান শুরু হয়। আবাসন খাতে উত্থান দেখে এর সঙ্গে যুক্ত হন অনেক মৌসুমি ব্যবসায়ী। ব্যবসায়ীদের মধ্যে প্রতিযোগিতা বাড়ায় জমির মূল্য বৃদ্ধি পায়। জমির মালিকেরাও সাইনিং মানি বা নগদ অর্থের এবং অংশীদারি বেশি দাবি করতে থাকেন। এসবের ফলে নির্মাণ ব্যয়ও বেড়ে যায়। এরপরও ঋণের সহজলভ্যতা ও নগদ অর্থের প্রবাহের কারণে চাহিদা ছিল ফ্ল্যাটের।

উদ্যোক্তারা বলেন, শেয়ারবাজার ধসসহ নানা কারণে নগদ অর্থের প্রবাহ কমে গেলে ২০১২ সালের শেষে এ খাতে মন্দা শুরু হয়। মৌসুমি ব্যবসায়ীরাও ফ্ল্যাট বিক্রি করতে না পারায় অর্ধনির্মিত বা উপরিকাঠামো নির্মাণ করেই অনেকে পিছু হটেন। ফ্ল্যাট বুঝে দিতে না পারায় গ্রাহকের আস্থায়ও চিড় ধরে। গত বছর পর্যন্ত চট্টগ্রামে রিহ্যাবের সদস্যভুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর অবিক্রীত পড়ে ছিল পাঁচ হাজার ফ্ল্যাট। সদস্যের বাইরে এ সংখ্যা আরও বেশি বলে ধারণা করছেন রিহ্যাবের নেতারা।

উদ্যোক্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, গত এক-দেড় বছরের মধ্যে ফ্ল্যাটের দাম কমে যায় ২০ থেকে ২৫ শতাংশ। একাধিক প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তারা বলেন, নাছিরাবাদে প্রতি বর্গফুট ফ্ল্যাটের দাম ১১ হাজার টাকা থেকে কমে এখন বিক্রি হচ্ছে ৮ থেকে সাড়ে ৮ হাজার টাকায়। চট্টগ্রাম কলেজ রোডে বর্গফুটপ্রতি সাড়ে ছয়-সাত হাজার থেকে কমে পাঁচ হাজার টাকা, পাঁচলাইশ এবং ওআর নিজাম রোডে আট-নয় হাজার থেকে কমে সাত হাজার টাকায় বিক্রি হচ্ছে। জামারখান এলাকায় সাড়ে ৫ হাজার টাকা থেকে কমে ৪ থেকে সাড়ে ৪ হাজার, মুরাদপুর এলাকায় সাড়ে ৩ থেকে ৪ হাজার টাকায় বিক্রি হচ্ছে। দাম কমার কারণে ফ্ল্যাটের বিক্রিও কিছুটা বেড়েছে।

রিহ্যাবের সহসভাপতি এসএম আবু সুফিয়ান বলেন, আবাসন শিল্পের মন্দা কাটিয়ে উঠতে চেষ্টা করছে ভালো মানের নির্মাতা প্রতিষ্ঠানগুলো। এর মধ্যে ভুঁইফোড় অনেক প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে গেছে। গ্রাহকদের আস্থা অর্জন করতে প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি রিহ্যাবও কাজ করছে। শীর্ষপর্যায়ের অনেক প্রতিষ্ঠান ফ্ল্যাটের দাম বৃদ্ধি না করে বরং কমিয়ে দিয়েছে। অথচ এ কয়েক বছরে নির্মাণসামগ্রীর দামসহ ফ্ল্যাট নির্মাণে খরচ অনেক বেড়ে গেছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একটি আবাসন কোম্পানির উদ্যেক্তা পরিচালক জানান, আসকার দীঘির পাড়ে বহুতল ভবনের কাজ শুরু করলেও ৪ হাজার টাকা বর্গফুট দামেও ক্রেতা মিলছে না। আস্থার সংকট এজন্য প্রধানভাবে দায়ি বলে তিনি জানান।

দীর্ঘদিন ধরে চট্টগ্রামে আবাসন ব্যবসার সঙ্গে জড়িত ইপিক প্রপার্টিজ লিমিটেড। নগরীর নাসিরাবাদ ইস্পাহানি এলাকায় প্রতিষ্ঠানটির নির্মিত প্রকল্প ‘ইপিক কলোজিয়াম’। ১৮০০-২১০০ বর্গফুটের ফ্ল্যাটে বর্তমানে প্রতি বর্গফুটের দাম রাখা হচ্ছে সাড়ে ৭ থেকে ৮ হাজার টাকা। গত দু-তিন বছর আগে একই এলাকায় তাদের অন্য একটি প্রকল্পে ফ্ল্যাট বিক্রি করেছেন প্রতি বর্গফুট ৯-১০ হাজার টাকায়। প্রতিষ্ঠানটির এনায়েত বাজার এলাকায় ইপিক ইত্তেহাদ পয়েন্ট, চট্টেশ্বরী রোডে ইপিক ইমদাদ হাইটস্, আগ্রাবাদ সিডিএ আবাসিক এলাকায় ইপিক আফরোজা, চকবাজার এলাকায় ইপিক নূরজাহানসহ নির্মিত ও নির্মাণাধীন সব প্রকল্পে আগের চেয়ে কম দামে ফ্ল্যাট পাওয়া যাচ্ছে।

এপিক প্রপার্টিজ লিমিটেডের বিপণন কর্মকর্তা আবদুল হামিদ বলেন, নির্মাণ খরচ বেড়ে যাওয়ায় দু-তিন বছরের ব্যবধানে ফ্ল্যাটের দাম কমপক্ষে ২০-৩০ শতাংশ বৃদ্ধি পাওয়া স্বাভাবিক। কিন্তু বিক্রি বাড়াতে ফ্ল্যাটের দাম বৃদ্ধি না করে বরং আগের চেয়ে কম দামে বিক্রি করছি। তবে চলতি অর্থবছরে ফ্ল্যাট বিক্রিতে গ্রাহকদের কাছ থেকে ভালো সাড়া পাওয়া যাচ্ছে।

চট্টগ্রাম নগরীর আসকার দীঘির পাড় এলাকায় এবিসি মাহবুব ভবনে ফ্ল্যাট নির্মাণ করেছে এবিসি রিয়্যাল এস্টেট লিমিটেড। প্রতিষ্ঠানটি প্রতি বর্গফুটের দাম রাখছে সর্বোচ্চ ৬ হাজার ৮০০ টাকা। প্রতিষ্ঠানটির সহকারী ব্যবস্থাপক (বিপণন) জুনায়েদ আহসান বলেন, চট্টগ্রামে এবিসি মাহবুব হিল ও এবিসি ক্রস উইনডোসে বর্তমানে অত্যাধুনিক ফ্ল্যাট বিক্রি চলছে। আগের তুলনায় ফ্ল্যাটগুলো অত্যাধুনিক সুবিধা নিশ্চিত করে তৈরি হচ্ছে। কিন্তু গত দু-তিন বছরে যে দামে ফ্ল্যাট বিক্রি হতো, বর্তমানেও একই দাম রাখা হচ্ছে।

২০১০ সালে চট্টগ্রামে আবাসন ব্যবসার সঙ্গে জড়িত ছিল দুই শতাধিক প্রতিষ্ঠান। এর মধ্যে রিহ্যাবের সদস্য ছিল মাত্র ১০২ প্রতিষ্ঠান। তবে গত কয়েক বছরের ব্যবসা মন্দা, গ্রাহক ও ভূমি মালিকদের সঙ্গে প্রতারণা, মামলা জটিলতা ও লোকসানে পড়ে প্রায় অর্ধশতাধিক প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে গেছে। ফ্ল্যাট বিক্রি না হওয়ায় অনেক প্রতিষ্ঠানই ধুঁকছে; ব্যবসায় টিকে রয়েছে ভালো মানের ২০-৩০টি প্রতিষ্ঠান।

উদ্যোক্তারা বলেন, চট্টগ্রামে আবাসন খাতে এখনো গ্রাহকদের বড় অংশ উচ্চবিত্ত ও উচ্চমধ্যবিত্ত শ্রেণির। এই তালিকায় আছেন ছোট-বড় ব্যবসায়ী ও উচ্চ আয়ের পেশাজীবীরা। প্রকৃত মধ্যবিত্ত শ্রেণির লোকজন এখনো আসছেন না। আবার মৌসুমি ব্যবসায়ীরা ফ্ল্যাট বুঝে দিতে না পারায় মধ্যপ্রাচ্যকেন্দ্রিক প্রবাসী গ্রাহকদের আস্থা কমে গেছে। চাহিদা না বাড়ায় ফ্ল্যাটে বিনিয়োগকারীরাও এখনো বাজারে ফিরে আসেননি। মধ্যবিত্ত শ্রেণি ও প্রবাসীদের আস্থা ফেরানো গেলে এই খাতে ব্যবসা আরও বাড়বে বলে জানান তাঁরা।

উদ্যোক্তারা বলেন, চট্টগ্রামে রিহ্যাবের সদস্যভুক্ত ৯৮টি প্রতিষ্ঠান রয়েছে। রিহ্যাবের বাইরে রয়েছে দুই শতাধিক প্রতিষ্ঠান। আবাসন ব্যবসায় যুক্ত প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা বেশি হলেও এই খাতে নেতৃত্ব দিচ্ছে হাতে গোনা ১০-১২টি প্রতিষ্ঠান। আবাসন খাতের উত্থান দেখে যেসব ব্যবসায়ী হঠাৎ করে এই বাজারে এসেছিলেন, তাঁদের ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ এখন বাজারে নেই বলে জানান আবাসন খাতের শীর্ষস্থানীয় উদ্যোক্তারা।

গেল বছরের শেষ দিক থেকে আবাসন খাতে আবারো ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছে প্রায় অর্ধশতাধিক প্রতিষ্ঠান। গ্রাহকদের আস্থা ফিরিয়ে আনতে এসব প্রতিষ্ঠান বিভিন্ন সময়ে প্রণোদনা প্যাকেজ, বিশেষ ছাড়, রিহ্যাব ফেয়ার, প্রতিষ্ঠানভিত্তিক ফেয়ারের আয়োজন করছে। আগের মতো যেকোনো জায়গায় প্রকল্প হাতে না নিয়ে অভিজাত আবাসিক এলাকায় প্রকল্প বাছাই করছে এসব প্রতিষ্ঠান।