ঢাকা, মঙ্গলবার, ১৭ জুলাই ২০১৮

চ্যাম্পিয়ন মানেই কি অভিশাপ !

ক্রীড়া ডেস্ক :

প্রকাশিত: ২৭ জুন ২০১৮ বুধবার, ১০:৪০ পিএম

চ্যাম্পিয়ন মানেই কি অভিশাপ !

জোয়াকিম লো অধোবদন হয়ে বসে আছেন। জার্মানির সাইডবেঞ্চে একেকজন যেন পাথরের নিশ্চল মূর্তি। মাটিতে শুয়ে পড়েছেন হামেলসরা, যেন বিশ্বাসই করতে পারছেন না কী হয়েছে। রাজ্যহারা রাজার মতো একেকজন যেন দীনহীন। জার্মানি বিশ্বকাপের প্রথম রাউন্ড থেকে বিদায় নেবে, মাঠে দাঁড়িয়েও যেন বিশ্বাস করতে পারছিলেন না সমর্থকেরা। কিন্তু শেষ পর্যন্ত চ্যাম্পিয়নদের অভিশাপটাই হয়েছে সত্যি, ১৯৩৮ সালের পর এই প্রথম বিশ্বকাপের প্রথম পর্ব থেকে বিদায় নিয়েছে জার্মানি। রাশিয়া থেকে তাদের আরও একবার বিদায় নিতে হলো মাথা নিচু করে।

গত কয়েকটি বিশ্বকাপেই চ্যাম্পিয়ন মানেই যেন অভিশাপ। ২০০২ সালে ফ্রান্স। ২০১০ সালে ইতালি। ২০১৪ সালে স্পেন। দক্ষিণ কোরিয়ার কাছে ২-০ গোলে হেরে এবার সেই ভাগ্য বরণ করতে হলো জার্মানিকে।

অথচ আগের ম্যাচেও যেভাবে শেষ মুহূর্তে গোল দিয়েছে, তাতে মনে হচ্ছিল ভাগ্য এবার জার্মানির পক্ষেই। কোরিয়ার সাথে ম্যাচে যখন প্রথমার্ধ গোলশূন্য, জার্মানির আক্রমণ যখন নিস্ফলা মাঠের কৃষকের মতো মাথা খুঁটে মরছে, তখনও জাগেনি শঙ্কা। এই জার্মানি তো শেষ মুহূর্তে গোল করতেই পারে, সময় তো অনেক আছে।

বিশ্বকাপে গ্রুপ পর্ব চালুর পর জার্মানি কখনো বাদ পড়েনি। কথাটা এখন থেকে ভুল। দক্ষিণ কোরিয়ার কাছে ২-০ গোলের অবিশ্বাস্য হারে বিশ্বকাপের প্রথম রাউন্ড থেকেই ছিটকে পড়ল গতবারের বিশ্ব চ্যাম্পিয়নরা! এই বিশ্বকাপে এটাই সবচেয়ে বড় অঘটন।
সেই সময়ও ফুরিয়ে এলো একটু একটু করে। জার্মান সমর্থকদের ঘড়ির কাঁটা হয়ে এলো একেকটি দুশ্চিন্তার দীর্ঘ প্রহর হয়ে। ওদিকে সুইডেন একে একে তিন গোল দিয়েছে মেক্সিকোর জালে, জার্মানিকে তখন জিততেই হবে। আগের ম্যাচেও প্রথমার্ধে কিছু করতে পারেনি। আজও দ্বিতীয়ার্ধের শুরু থেকে আবার তেঁড়েফুড়ে খেলতে থাকে জার্মানি।

‘এফ’ গ্রুপে ভীষণ জটিল সমীকরণের মধ্যে পড়েছিল চার দল। শেষ ষোলোয় উঠতে কাজানে দক্ষিণ কোরিয়ার বিপক্ষে ম্যাচটা জিতে নিজেদের কাজটা সেরে রাখতে হতো জার্মানিকে। পাশাপাশি তাকিয়ে থাকতে হতো মেক্সিকো-সুইডেন ম্যাচের ফলেও। ইয়েকাতেরিনবুর্গে সুইডেন ৩-০ ব্যবধানে মেক্সিকোকে হারানোয় জার্মানির জন্য কাজটা অনেক কঠিন হয়ে পড়ে। কোরিয়ার বিপক্ষে জিততেই হতো জার্মানিকে। কিন্তু জোয়াকিম লোর শিষ্যরা এই কাজটাই করতে পারলেন না!

জার্মানির এই অবিশ্বাস্য বিদায়ে একটি ধারাবাহিকতা বজায় থাকল। ২০০২ বিশ্বকাপ থেকে ইউরোপের দলগুলো চ্যাম্পিয়ন হওয়ার পরের টুর্নামেন্টেই বাদ পড়েছে প্রথম রাউন্ড থেকে। জার্মানি এবার সেই ধারাটাই বজায় রাখল। বিশ্বকাপের ইতিহাসে এর আগে জার্মানি কখনোই প্রথম রাউন্ড থেকে বাদ পড়েনি। ব্যতিক্রম শুধু ১৯৩৮ বিশ্বকাপ। সেবার টুর্নামেন্ট শুরুই হয়েছিল শেষ ষোলোর নকআউট পর্ব থেকে। সুইজারল্যান্ডের কাছে টাইব্রেকারে হেরে সেবার বাদ পড়েছিল জার্মানি।

বিরতির পর আরেকটু হলেই গোল দিয়ে দিয়েছিল জার্মানি। কিন্তু কিমিখের ক্রস থেকে লিওন গোরেতস্কার হেড দারুণভাবে ঠেকিয়ে দিয়েছেন কোরিয়া গোলরক্ষক চো ইউন হু। বার্লিনের দেয়াল ভেঙে গেলেও আজ চো ইউন হুর দেয়াল ভাঙতে পারেনি জার্মানি, সব আক্রমণ শেষ হয়ে গেছে সেখানেই।

বরং ৬৫ মিনিটে গোল পেয়েই গিয়েছিল কোরিয়া, কিন্তু বক্সের ভেতর ঢুকেও গোলরক্ষককে একা পেয়ে শট নিতে দেরি করে ফেললেন মুন সিউন মিন।

৮০ মিনিটের পর আবার জার্মানি সাঁড়াশির মতো শুরু করে আক্রমণ। ৮২ মিনিটে গোমেজের হেড চলে যায় পোস্টের বাইরে দিয়ে। রয়েস, ক্রুস দূর থেকে চেষ্টা করছিলেন, কিন্তু এদিন যে কিছুই হওয়ার নয়। তবে ৮৭ মিনিটে হামেলস যেটা মিস করলেন, সেটা ভুলতে হয়তো সময় লাগবে অনেক। ওজিলের ক্রসটা ফাঁকায় পেয়েও মাথায় লাগাতে পারেননি, কাঁধে লেগে চলে গেছে বাইরে।

বরং যোগ করা সময়েই সবকিছু তছনছ হয়ে যায় জার্মানদের। হামেলসদের ভুল বোঝাবুঝিতে বক্সে সুযোগ পেয়ে গিয়েছিলেন কিম ইয়ং গুন। বলটা জালে জড়িয়ে দেওয়ার পর সহকারি রেফারি অফসাইড দেখিয়েছিলেন কিন্তু ভিডিও সহকারী রেফারি সিদ্ধান্তটা বাতিল করে গোলের রায় দেন। তবে নাটক বাকি ছিল তখনো। শেষ সময়ে নয়্যারের ভুল বল পেয়ে যায় কোরিয়া। ফাঁকা পোস্টে গোল দিয়ে জার্মানির হৃদয়ে শেষ পেরেকটি ঠুকে দেন হিউ মিন সন। যোগ করা সময়ের খেলা যখন নয় মিনিট, জার্মানি প্রাণপণ হয়েও চেষ্টা করছিল। কিন্তু হামেলসের হেড পোস্টে লেগে চলে গেছে বাইরে। অভিশাপের দিনে যে জার্মানির কিছুই হওয়ার নয়!

‘এফ’ গ্রুপের শেষ দিনে ২ ম্যাচে ৬ পয়েন্ট নিয়ে টেবিলের শীর্ষে ছিল মেক্সিকো। সমান ৩ পয়েন্ট নিয়ে যথাক্রমে দ্বিতীয় ও তৃতীয় অবস্থানে ছিল জার্মানি ও সুইডেন। কিন্তু সুইডেন নিজেদের ম্যাচটা জিতে শেষ ষোলোয় উঠেছে ‘এফ’ গ্রুপের চ্যাম্পিয়ন দল হিসেবে। ৩ ম্যাচে তাদের সংগ্রহ ৬ পয়েন্ট। ‍+৩ গোল ব্যবধান দলটির। সুইডেনের সমান ৬ পয়েন্ট নিয়ে এই গ্রুপের রানার্সআপ হিসেবে শেষ ষোলোয় উঠেছে মেক্সিকো। আর জার্মানি ৩ ম্যাচে ৩ পয়েন্ট নিয়ে এই গ্রুপের চতুর্থ দল হয়ে বিদায় নিল বিশ্বকাপ থেকে। জার্মানদের সমান ৩ পয়েন্ট পেলেও গোল ব্যবধানে এগিয়ে গ্রুপের তৃতীয় দল হওয়ার সান্ত্বনা নিয়ে বাড়ি ফিরল দক্ষিণ কোরিয়া।