AD
ঢাকা, শুক্রবার, ২৮ জুলাই ২০১৭

মেসির রাজকীয় বিয়ে

ক্রীড়া প্রতিবেদক:
প্রকাশিত: ০২ জুলাই ২০১৭ রবিবার, ০৭:৩০ এএম
মেসির রাজকীয় বিয়ে

দু’জনার সম্পর্কের শুরুটা একেবারে ছোটবেলা থেকেই। বন্ধনটাও বেশ পুরনো, ১৯৯৬ সালে। লিওনেল মেসি তখন ৯ বছরের বালক। প্রেম, ভালবাসা এই শব্দগুলোর সঙ্গে তখন আলাপ হয়নি। বন্ধু লুকাস স্ক্যাগলিয়ার সঙ্গে রোজারিওতে ফুটবল খেলেই সময় কাটত মেসির।

শেষমেশ স্ক্যাগলিয়ার কাজিন আন্তোনেলা রোকুজ্জোর সঙ্গে মেসির দেখা। প্রথম দেখাতেই প্রেমে পড়া, ভালো লাগা। ধীরে ধীরে সেটা ভালোবাসায় রূপ নেয়। ২০০৭ সালে জানাজানি হয় এই সম্পর্কের কথা। এরপর তিন বছর চলে প্রেমের লুকোচুরি খেলা। খবরটা মিডিয়ার নজরে আসলে মেসিও কোন লুকোছাপা করেননি। আন্তোনেলা রোকুজ্জো ও লিওনেল মেসি ছিলেন দু’জনে দু’জনার।

বার্সেলোনা একাদশকে পায়ের কারুকাজে মেসি যেমন ট্রফি ভান্ডারে পরিণত করেছেন তেমনি যোগ্য বন্ধু ও বাবা হিসাবেও মেসির সুখ্যাতি আছে। তবে মেসি এখন আর ছেলেবন্ধু নন, স্বামী। কারণ পরশু আলোচিত এই জুটি বিয়ের মাধ্যমে সম্পর্কটাকে আরও জোরদার করলেন। শুধু তাদের সম্পর্ক জোরদার হলো না, রাজসিক আয়োজনে মাঠের জাদুকর মেসি বিয়ের চাকচিক্যময় আয়োজন দিয়েও পুরো বিশ্বকে মোহিত করেছেন। ৩০ বছর বয়সী মেসি ও ২৯ বছর বয়সী রোকুজ্জো দীর্ঘদিন ধরে এক ছাদের নিচেই ছিলেন। ২০১২ সালে এই জুটির ঘর আলো করে আসে প্রথম সন্তান তিয়াগো, ২০১৫ সালে জন্ম নেয় দ্বিতীয় সন্তান মাতেও।

‘আই ডু’- প্রায় ২৫ বছর ধরে চেনাজানা প্রাণপ্রিয় প্রেয়সী ও দুই সন্তানের মা আন্তোনেলা রোকুজ্জোকে বললেন লিওনেল মেসি। প্রেমিক–প্রেমিকার সম্পর্ক রূপ নেয় ‘অনন্ত জীবনের’। আর্জেন্টিনায় নিজ জন্মস্থান রোজারিওতে এক জমকালো আয়োজনের মধ্য দিয়ে গাঁটছাড়া বাঁধলেন মেসি ও রোকুজ্জো। শুক্রবার তারকা ফুটবলার ও সেলেব্রেটিদের উপস্থিতিতে হয়ে গেল সংবাদমাধ্যমে মর্যাদা পাওয়া ‘শতাব্দীর সেরা বিয়ে’।

‘অন্য গ্রহের’ ফুটবলারের বিয়েতে হাজির হয়েছিলেন বন্ধু ও পরিবারের ২৫০ জনেরও বেশি সদস্য। বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আর্জেন্টিনার বিমান ধরেছিলেন ফুটবলের বেশ ক’জন বড় তারকা। ৩০ বছরের মেসি ও ২৯ বছর বয়সী রোকুজ্জোর এ ঝলমলে বিয়ের অনুষ্ঠানে কোনও প্রভাব রাখতে পারেনি শাশুড়ি ও হবু বউয়ের বিরোধের গুঞ্জন। রোজারিওর বিলাসবহুল হোটেলে অনুষ্ঠিত এ ইভেন্টে মোবাইল ফোন নিষিদ্ধ করেছিলেন নবদম্পতি। হোটেল কর্মচারীদেরও সব ধরনের

গোপনীয়তা রক্ষা করতে বলা হয়েছিল। বড় এ দিনে নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল সাড়ে চারশ পুলিশকে। প্রায় ১৫০ জন সাংবাদিক উপস্থিত ছিলেন। তবে তাদের হোটেলের ভেতরে প্রবেশাধিকার ছিল না। হোটেলের মূল ফটকের সামনে লাল গালিচার একপাশে থেকে তারা যতটুকু পেরেছেন সংবাদ সংগ্রহ করেছেন, তারকা অতিথিদের ছবি তুলেছেন। অতিথিদের ছবি তোলা বা সাক্ষাৎকার দেওয়ার ব্যাপারটি তাদের ইচ্ছার উপর নির্ভর করছিল।

অনুষ্ঠানে প্রথম অতিথি হিসেবে লাল গালিচায় পা রেখেছিলেন স্যামুয়েল ইতো। গণমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলেননি তিনি। এর পর একে একে আসেন সার্হিয়ো আগুয়েরা ও তার বান্ধবী কারিনা, সেস ফ্যাব্রিগাস ও বাগদত্তা ড্যানিয়েলা সিমান, রোকুজ্জোর বন্ধু ও মেসির জাতীয় দলের সতীর্থ এজেকুয়েল লাভেজ্জি, লুই সুয়ারেজ ও তার স্ত্রী সোফিয়া বালবি এবং পপ তারকা শাকিরা ও তার স্বামী জেরার্ড পিকেসহ ফুটবলের আরও অনেক গণ্যমান্য তারকারা। মেসির বার্সেলোনা সতীর্থ নেইমার একাই এসেছিলেন। এর কারণ হিসেবে আর্জেন্টাইন গণমাধ্যম জানিয়েছে, কিছুদিন আগে বান্ধবী ব্রুনা মাকুইজাইনকে প্রস্তাব দিয়ে প্রত্যাখ্যাত হয়েছেন ব্রাজিলিয়ান অধিনায়ক। অতিথি সারিতে সবার সামনে ছিল কিন্তু মেসি–রোকুজ্জোর দুই ছেলে থিয়াগো ও মাতেও।

মূল অনুষ্ঠান শুরু হওয়ার আগে বর–কনের সাজে মঞ্চে ওঠেন মেসি–রোকুজ্জো। বরের গায়ে ছিল নীল রঙের আরমানি স্যুট, যার নকশা করেছেন আর্জেন্টাইন ডিজাইনার ক্লাউদিও কোসানো। আর রোকুজ্জোর মারমেইড গাউনটি এসেছে স্পেন থেকে। স্প্যানিশ ডিজাইনার রোসা ক্লারার নকশা করা এ পোশাক বিয়ের আগের রাতে দুজন দেহরক্ষীর পাহারায় পৌঁছায় আর্জেন্টিনায়।

অতিথিদের পোশাক নিয়ে ছিল মেসি–রোকুজ্জোর আলাদা পরিকল্পনা। সংবাদমাধ্যমের খবর, রঙে–ঢঙে একজনের সঙ্গে আরেকজনের পোশাক যেন মিলে না যায় সে জন্য মেয়ে অতিথিদের তিনটি পোশাক সঙ্গে আনার অনুরোধ করেছিলেন তারা। তিনটি করে ভিন্ন ভিন্ন শার্ট আনতে বলা হয়েছিল ছেলে অতিথিদেরও। তবে আর্জেন্টিনা ও ম্যানসিটির সাবেক ডিফেন্ডার মার্টিন ডেমিচেলিসের স্ত্রী ও মডেল এভানজেলিনা অ্যান্ডারসন পোশাকের ব্যাপারে একটু বেশি সতর্ক ছিলেন। অন্য ‘ওয়াগ’দের সঙ্গে যেন মিল না হয়, সেজন্য তিনি পাঁচটি পোশাক সঙ্গে এনেছিলেন বলে জানিয়েছে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম।

বিয়ের অনুষ্ঠানে একটু আধটু বাধা পড়েই। মেসির বেলাতেও তার ব্যতিক্রম হয়নি। বিশ্বের নানা প্রান্তের সাংবাদিকদের দেখে ৬০০ জনের শ্রমিকের একটি দল হাজির হন হোটেলের সামনে। তারা সবাই ছিলেন পেপসিকো কোম্পানির কর্মী। ব্যানার নিয়ে তারা তাদের বরখাস্তের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানিয়ে বিশ্বের নজর কাড়ার চেষ্টা করেছেন উপস্থিত মিডিয়া কর্মীদের মাধ্যমে।

সে যাই হোক, ‘শতাব্দীর সেরা বিয়ে’ ঝামেলা ছাড়াই সম্পন্ন হয়েছে। মেসি ও রোকুজ্জো তাদের বিয়ের শপথ করেন অনুষ্ঠানের শেষ পর্বে। ওই সময় তাদের কয়েক ইঞ্চি সামনে বসে ছিল বড় ছেলে থিয়াগো। তারা স্বামী–স্ত্রী ঘোষিত হওয়ার পর থিয়াগোর মাথায় হাত বুলিয়ে রোকুজ্জোকে চুমু খান মেসি। এর পর মেসি চমকে দেন তার স্ত্রীকে। জনপ্রিয় আর্জেন্টাইন গায়ক আবেল পিন্টোসকে হাজির করেন পাঁচবারের ব্যালন ডি’অরজয়ী। প্রিয় গায়কের কণ্ঠে প্রিয় গান ‘সিন প্রিন্সিপিও নি ফিনাল’ (শুরু বা শেষটা ছাড়াই) শুনতে পেরে ততক্ষণে রোকুজ্জোর আনন্দ আকাশ ছুঁয়েছে। নতুন জীবনের হাস্যোজ্জ্বল শুরুটা শেষ পর্যন্ত অটুট থাকবে এটাই কামনা মেসি ভক্তদের।

দাওয়াত পাননি ম্যারাডোনা! : ফুটবলের রাজা তিনি। জাদুর কাঠি নিয়ে ফুটবল বিশ্বকে অবাক করে দেয়া সেই লিওনেল মেসির বিয়েটাও হল রাজকীয় ঢঙে। রূপকথার রাজ্যে রাণীর মুকুটটা উঠল মেসির ছেলেবেলার খেলার সাথী আন্তোনেলা রোকুজ্জোর মাথায়। সতীর্থ, গুরু, বন্ধু আর শুভাকাঙক্ষীদের পদচারণায় বাড়তি রং লেগেছে বিয়েতে। হরেক রকম খাবার আর বাহারি আলোকসজ্জা কেড়েছে সবার মন। ছুঁয়েছে হৃদয়। উন্মাদনা, উত্তেজনা আর দুটি মনের আনুষ্ঠানিক মিল ফুটবল বিশ্বে স্থাপন করল অনন্য এক নজির।

তবে কয়েকটি বিষয়ে মেসির জমকালো আয়োজন মিডিয়ায়  সমালোচিত হচ্ছে। কারণ তার বিয়েতে দাওয়াত পাননি সাম্প্রতিক সময়ে তার কোচ থাকা কেউই। তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য বার্সেলোনার সাবেক কোচ পেপ গুয়ার্দিওলা। অনেকেই বলেন, আজকের মেসি নামের যে জাদু তাতে এই গুয়ার্দিওলা অবদান অনেকখানিই। তবে সবচেয়ে বিস্ময়কর হলো আর্জেন্টাইন কিংবদন্তি দিয়াগো ম্যারাডোনাও অপাংতেয় ছিলেন মেসি’র বিয়েতে। কেন মেসি ম্যারাডোনাকে দূরে রাখলেন সেটি নিয়ে মিডিয়ায় এখন চর্চা হচ্ছে। দাওয়াত না পাওয়ার তালিকা থেকে বাদ পড়েছেন লুইস এনরিকে।

খাবার মেন্যুতে যা ছিল : বিয়েতে অতিথিদের জন্য খাবার মেন্যুটা কেমন ছিল সেটা জানার আগ্রহ সবারই। আয়েঅজনটা যে চকমপ্রদ ছিল সেটা বলাই বাহুল্য। বাড়িরর মত বিরিয়ানি–ফ্রাইড রাইস হয়ত ছিল না, কিন্তু স্প্যানিশ খাবার থেকে আর্জেন্টাইন হিট রেসিপি সবই ছিল। ছিল শচীন টেন্ডুলকরের প্রিয় জাপানি খাবার সুশিও। খাবারের মধ্যে বিভিন্ন রকমের কোল্ড মিট, বিভিন্ন প্রকারের চিজ ও মাংসের কম্বিনেশন, নানা রকমের স্যালাড,বিভিন্ন রকমের রুটি। সব মিলিয়ে ভোজ সভা জমজমাট।