ঢাকা, শনিবার, ২১ অক্টোবর ২০১৭

নোবেলের চেয়ে জীবন বাঁচানো বড়

হামিদ উল্লাহ

প্রকাশিত: ২২ সেপ্টেম্বর ২০১৭ শুক্রবার, ১১:০৪ পিএম

নোবেলের চেয়ে জীবন বাঁচানো বড়

শেখ হাসিনা শান্তিতে নোবেল পুরস্কার পাচ্ছেন অথবা শেখ হাসিনাকে শান্তিতে নোবেল পুরস্কার দেওয়ার দাবি ওঠেছে। এই কথায় ফেসবুক এবং রাজনীতির মাঠ সরগরম।

চলুন শান্তিতে নোবেল পুরস্কার নিয়ে একটু খোঁজ খবর নিই।

ভিয়েতনাম যুদ্ধ তখনও শেখ হয়নি। নোবেল শান্তি কমিটি পুরস্কারের জন্য দুইজনের নাম ঘোষণা করে বসল। একজন হলেন বিশ্বব্যাপী যুদ্ধ বাধিয়ে চলা যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হেনরি কিসিঞ্জার, অন্যজন ভিয়েতনামের বিপ্লবী ও রাজনীতিবিদ লী ডাক থো। লী ডাক থো হেনরি কিসিঞ্জারের সঙ্গে পুরস্কার গ্রহনে অস্বীকৃতি জানান। শান্তি পুরস্কার প্রত্যাখ্যান করে লী বলেন, পুরস্কার নিতে আসার মতো সময় আমার হাতে নেই।

যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক রাষ্ট্রপতি বারাক ওবামা শান্তিতে নোবেল পুরস্কার গ্রহনের সময় দেওয়া ভাষনে বলেন, পৃথিবীতে শান্তির জন্য যুদ্ধের প্রয়োজন রয়েছে। অথচ আমরা সবাই বিশ্বাস করি, যুদ্ধ কখনও শান্তির বিকল্প নয়।

মহাত্মা গান্ধি শান্তিতে নোবেল পাওয়ার জন্য বিবেচিত হননি। অথচ নোবেল শান্তি পুরস্কার পেয়েছেন ইসরাইলের মানবতাবিরোধী প্রধানমন্ত্রী আইজ্যাক রবিন। বলা হয়ে থাকে, মহাত্মা গান্ধিকে শান্তিতে নোবেল না দেওয়ায় এ পুরস্কার সবচেয়ে কলঙ্কিত হয়েছে।

কেবল শান্তিতেই নয়-অন্যক্ষেত্রেও নোবেলের কী অবস্থা আসুন জেনে নিই।

লিও টলস্টয় নোবেল শাহিত্য পুরস্কার পাননি। অথচ দেওয়া হয়েছিল ড. জিভাগো’র লেখক বরিস প্যাস্তারনাককে। বলা হয়েছিল ‘ড. জিভাগো’ ওয়ার এন্ড পিস’র সমকক্ষ একটি গ্রন্থ। যারা বই পড়েন নিয়মিত, আমি নিশ্চিত তাদের সিংহভাগই এ বইটির নাম জানেন না। আর ওয়ার এন্ড পিস বইটি সংরক্ষণে নেই এমন মানুষ মেলা ভার সারাবিশ্বে। পৃথিবীর সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ ১০ উপন্যাসের তালিকায় টলস্টয়ের দুইটি বই আছে। একটি আন্না কারেনিনা, অন্যটি ওয়ার এন্ড পিস। আহমদ ছফা বলেছিলেন, আমি কম করে হলেও ওয়ার এন্ড পিস একশ’বার পড়েছি।

দার্শনিক জ্যাঁ পল সার্ত নোবেল সাহিত্য পুরস্কার প্রত্যাখ্যান করে বলেছিলেন, এ পুরস্কার নিলে আমি আমার শিল্পীর স্বাধীনতা হারাব এবং আমার মানবতাবাদী চেতনা আহত হবে।

আরেক দার্শনিক জর্জ বার্নাড শ নোবেল পুরস্কার প্রত্যাখ্যান করেন।

নোবেল পুরস্কারের সমালোচনা করে দার্শনিক ও লেখক বার্ট্রান্ড রাসেল বলেন, নোবেল পুরস্কার স্নায়ুযুদ্ধে পশ্চিমা শিবিরের হাতে একটি মোক্ষম অস্ত্র। এই পুরস্কারের প্রবর্তক আলফ্রেড নোবেল আজ যদি বেঁচে থাকতেন, তবে হয় এ পুরস্কারদান ব্যবস্থা বাতিল করতেন, অথবা এ পুরস্কার থেকে নিজের নাম প্রত্যাহার করে নিতেন।

শেখ হাসিনা এমন একটি জনগোষ্ঠিকে নিজ দেশে আশ্রয় দিয়েছেন, যারা সারা পৃথিবীতে সবচেয়ে বেশি নির্যাতিত। এই রোহিঙ্গা সম্প্রদায় নিজেদের সব ধরণেই অস্থিত্ব থেকে প্রত্যাখ্যাত হতে চলেছে বর্মী শাসকদের অন্যায্য সিদ্ধান্তের কারণে। ঠিক সেই মুহূর্তে তাদের সহযোগিতার হাত বাড়িয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি জানেন, বর্মার সঙ্গে আমাদের ক্রমবর্ধমান বাণিজ্য এতে ক্ষতির মুখে পড়তে পারে। তাতেও তিনি পিছ পা হননি। বরং রোহিঙ্গাদের সঙ্গে দেখা করে এবং তাদের সঙ্গে থাকার ঘোষণা দিয়ে তিনি বর্মা ও ভারতকে কুটনীতিক যুদ্ধে অস্বস্থিতে ফেলে দিয়েছেন। বিশ্ববিবেককে রোহিঙ্গামুখী করেছেন।

শেষ লাইনটি লিখতে চাই-একজন রোহিঙ্গাকে বাঁচানো হাজার নোবেল শান্তি পুরস্কারের চেয়ে শ্রেষ্ঠতর। সেটি রোহিঙ্গা কিংবা মুসলমানের জন্য নয়-মানুষ হিসেবে।

কোরআন শরীফের সুরা মায়েদায় আল্লাহ বলেছেন, যে বিনা কারণে একজন মানুষকে খুন করলো, সে যেন সারা দুনিয়ার মানুষকে খুন করলো। আর যে একটি মানুষকেও রক্ষা করল, সে যেন সারা দুনিয়ার মানুষকে রক্ষা করলো।

লক্ষ্য করুন, কোরআনে `মানুষ` শব্দটি বলা হয়েছে ...

লেখক : ব্যুরো প্রধান, দৈনিক আমাদের সময়, চট্টগ্রাম।