ঢাকা, শনিবার, ২১ অক্টোবর ২০১৭

সীমান্তে অনুপ্রবেশের চেষ্টায় ৫ হাজার রোহিঙ্গা

কক্সবাজার প্রতিনিধি

প্রকাশিত: ২৭ আগস্ট ২০১৭ রবিবার, ০৭:৫৩ এএম

সীমান্তে অনুপ্রবেশের চেষ্টায় ৫ হাজার রোহিঙ্গা দুই যমজ সন্তানসহ আমতলী পয়েন্টে অনুপ্রবেশকারী এক দম্পতি

মিয়ানমারের আরাকান রাজ্যে সাম্প্রতিক সহিংসতার ঘটনায় ফের বাংলাদেশে রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশ বেড়েছে।   সীমান্তের ১৮ পয়েন্টে যেভাবে পারছে ঢুকার চেষ্টা করছে ভাগ্যপীড়িত রোহিঙ্গারা। বালুখালী কাটা পাহাড়, ধামনখালী, আন্জুমানপাড়া এবং টেকনাফের উলুবনিয়া-সহ বিভিন্ন সীমান্ত পয়েন্ট দিয়ে প্রায় ৫ হাজার রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশের চেষ্টা করছেন বলে জানিয়েছে স্থানীয় সূত্রগুলো।

বিজিবি’র পক্ষ থেকে অবৈধ অনুপ্রবেশ হচ্ছে না বলে দাবি করা হয়েছে। তবে বাস্তবে শত শত রোহিঙ্গা বাংলাদেশে প্রবেশ করছেন। শনিবার সন্ধ্যায় বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলার ঘুমধুম তমব্রু সীমান্তের দুইটি পয়েন্ট দিয়ে এক হাজারের বেশি রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশের চেষ্টা করেন। গোরা মিয়া (৩০) নামের একজন রোহিঙ্গা স্ত্রী জুহুরা খাতুনকে সঙ্গে নিয়ে কুতুপালং-এ সন্ধ্যা ৬টার দিকে আশ্রয় নেন। তাদের উভয়ের কোলে ১৯ দিনের দুইটি জমজ শিশু মুমূর্ষ অবস্থায় দেখতে পাওয়া যায়।

মিয়ানমারের তমব্রু সীমান্ত এলাকা পরিদর্শন ও অনুপ্রবেশকারী রোহিঙ্গাদের কয়েকজনের সঙ্গে কথা হয় । তারা জানান, ২৬ আগস্ট ২০১৭ শনিবার দুপুরের পর থেকে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের ঢেঁকিবনিয়া এলাকায় রোহিঙ্গা মুসলিম গ্রামগুলোতে একযোগে তাণ্ডব চালায় সেনাবাহিনী ও বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী স্থানীয় রাখাইনরা। এতে সংখ্যালঘু রোহিঙ্গা মুসলিম সম্প্রদায়ের বহু মানুষ হতাহত হন। প্রাণ বাঁচাতে বিকালের পর থেকে সীমান্তের দীর্ঘ প্রায় ২০ কিলোমিটার জুড়ে হাজার হাজার রোহিঙ্গা বাংলাদেশে অনুপ্রবেশে চেষ্টা চালান। বিজিবি-সহ স্থানীয় প্রশাসনকে অনুপ্রবেশ ঠেকাতে রীতিমত হিমশিম খেতে দেখা গেছে।

উখিয়ার রহমতেরবিল ও ধামনখালী সীমান্তে গিয়ে দেখা যায়, বিজিবি’র কড়া নজরদারি সত্ত্বেও নৌকা নিয়ে নারী, শিশুরা অনুপ্রবেশ করছেন বাংলাদেশে। ছোট ছোট নৌকায় করে রাখাইন রাজ্য থেকে পালিয়ে আসছেন রোহিঙ্গারা। এছাড়াও বালুখালী কাটা পাহাড়, ধামনখালী, আন্জুমানপাড়া এবং টেকনাফের উলুবনিয়া-সহ ১৮টি সীমান্ত পয়েন্ট দিয়ে প্রায় ৫ হাজার রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশের চেষ্টা করছেন। ধারণা করা হচ্ছে শনিবার রাতের মধ্যেই এসব রোহিঙ্গা বিজিবি’র চোখ ফাঁকি দিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশে সক্ষম হবে।

শনিবার বিকাল ৪টা থেকে সন্ধ্যা ৭টা পর্যন্ত নাইক্ষ্যংছড়ি সীমান্তের ঘুমধুম জলপাইতলী নুরুল ইসলামের আম বাগানে রোহিঙ্গাদের অনুপ্রবেশ লক্ষ্য করা গেছে। ঘুমধুম-এর ওপারে মিয়ানমারের ঢেঁকিবনিয়া ফকিরাপাড়া গ্রামের নুরুল বশর (৬৫), মুজিবুর রহমান (৫০) সহ রোহিঙ্গা সম্প্রদায়ের অনেকের সঙ্গে কথা হয় এ প্রতিবেদকের। তারা জানান, শনিবার দুপুর ৩টার দিকে একটি সামরিক হেলিকপ্টার ঢেঁকিবনিয়া সেনা ও বিজিপি ক্যাম্পে আসে। দুপুর ২টার দিকে হেলিকপ্টারটি চলে যাওয়ার পরপরই সেনা, বিজিপি ও স্থানীয় রাখাইনরা যৌথভাবে সীমান্ত সংলগ্ন ঢেঁকিবনিয়া, চাককাটা, ঢেঁকিপাড়া, ফকিরাপাড়া, চাকমা কাটা-সহ বেশ কয়েকটি রোহিঙ্গা গ্রামে হামলা শুরু করে। এ সময় তারা নির্বিচারে গুলিবষর্ণ, ঘরবাড়ি ভাঙচুর করে। জীবন বাঁচাতে তাই সীমান্ত পেরিয়ে বাংলাদেশের ভূখণ্ডই তাদের ভরসা।

ঘুমধুম সীমান্ত থেকে উপরিউক্ত এলাকাগুলোর দূরত্ব প্রায় ১/২ কিলোমিটার। স্থানীয় নুরুল ইসলামের বাগানে প্রায় দুই হাজারের মতো রোহিঙ্গা নারী, শিশু ও বৃদ্ধ অবস্থান নিয়েছেন। ওই এলাকা থেকে মিয়ানমার সীমান্তের দূরত্ব মাত্র ১৫০ গজের মতো। একইভাবে কয়েকশ গজ দূরে তুম্ব্রু পশ্চিম পাড়ে পাহাড়ের ঢালে অবস্থান নিতে দেখা গেছে আরও প্রায় হাজার দেড়েক রোহিঙ্গাকে। সীমান্তের আমতলী পাহাড়ি এলাকা দিয়েও রোহিঙ্গারা বাংলাদেশে অনুপ্রবেশের জন্য জড়ো হচ্ছেন। সেখান থেকে অনেকে অটোরিক্সা, ইজিবাইক ও অন্যান্য যানবাহনে করে কুতুপালং শরণার্থী শিবিরে আশ্রয় নেন।

উখিয়ার রহমতেরবিল, ধামনখালী ও আনজুমানপাড়া নাফ নদী সংলগ্ন চিংড়ি ঘেরগুলোতে শুক্রবার সন্ধ্যা পর্যন্ত প্রায় তিন হাজারের অধিক রোহিঙ্গা নারী, শিশু ও বৃদ্ধকে অবস্থান নিতে দেখা গেছে। এদের সবাই সীমান্ত সংলগ্ন রোহিঙ্গা গ্রামগুলোর বাসিন্দা।

কক্সবাজার ৩৪ বিজিবি’র অধিনায়ক লে. কর্নেল মনজুরুল হাসান খান বলেন, সীমান্তে কোনও রোহিঙ্গাদের প্রবেশ করতে দেওয়া হচ্ছে না। যেসব রোহিঙ্গা পালিয়ে এসে সীমান্তের বিভিন্ন পয়েন্টে জড়ো হয়ে আশ্রয় নিয়েছেন তাদের রাতের মধ্যে ফেরত পাঠানো হবে।

সোমবার সন্ধ্যায় সীমান্ত অতিক্রম করে পালিয়ে এসে উখিয়ার কুতুপালং রোহিঙ্গা ক্যাম্পে আশ্রয় নেওয়ার চেষ্টাকালে ৬৭ জন রোহিঙ্গা নারী, পুরুষ ও শিশুকে আটক করেছে পুলিশ। উখিয়া উপজেলার কুতুপালং রোহিঙ্গা ক্যাম্পে প্রবেশের সময় পুলিশ তাদের আটক করে। এরা প্রত্যেকে মিয়ানমারের বিভিন্ন সীমান্ত দিয়ে অনুপ্রবেশ করে আশ্রয় নিতে কুতুপালং ক্যাম্পে প্রবেশের চেষ্টা করে। বিজিবি’র মাধ্যমে তাদের ফেরত পাঠানো হবে বলে জানিয়েছে পুলিশ।