ঢাকা, মঙ্গলবার, ১৭ জুলাই ২০১৮

হালিশহরে আতংকের নাম হেপাটাইটিস ই

সারাবেলা প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ২৬ জুন ২০১৮ মঙ্গলবার, ০৮:৩৯ এএম

হালিশহরে আতংকের নাম হেপাটাইটিস ই

চট্টগ্রামের হালিশহরে মারাত্মকভাবে নানা ধরণের পানিবাহিত রোগ ছড়িয়ে পড়েছে। বিশেষ করে জন্ডিসসহ হেপাটাইটিস ই রোগে আক্রান্তের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি। এর মধ্যে গত সপ্তাহে অন্তত ১০ জনের মৃত্যু হয়েছে বলে দাবি করেছে স্থানীয়রা।

তবে, সিভিল সার্জন জন্ডিস আক্রান্ত হয়ে তিনজনের মৃত্যুর তথ্য নিশ্চিত করেছে। এক্ষেত্রে ওয়াসার দূষিত পানি সেবন করে রোগে আক্রান্ত হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠলেও ওয়াসা কর্তৃপক্ষ তা অস্বীকার করেছে। ওয়াসা এমডির দাবি টানা জলাবদ্ধতার কারণে ভূগর্ভস্থ পানির টাংকি ডুবে যাওয়ায় সেখানকার পানি দূষিত হয়েছে।

প্রাথমিক অনুসন্ধানে হালিশহর বসুন্ধরা এলাকার শিপিং কর্মকর্তা শামসুল আজম খান সেলিমের স্কুল পড়ুয়া এক মেয়ে, বি ব্লকের বাসিন্দা ব্যাংক কর্মকর্তা কামরুল হাসানের ছেলে আসিফুল হাসান রিসাদ জন্ডিসে মারা গেছে বলে নিশ্চিত হওয়া গেছে। এছাড়া গত কিছুদিনে মোট ৪ জন ও এছাড়া আরো অন্তত শতাধিক রোগী হাসপাতালে ভর্তি আছেন বলে জানা গেছে। এ নিয়ে এলাকায় এক ধরনের আতংক বিরাজ করছে।
নগরীর হালিশহরে হেপাটাইটিস ই এর প্রকোপ ধরা পড়ে গত দেড় মাস আগে।

এলাকার বিভিন্ন বয়সী মানুষ এ সময় জন্ডিসে আক্রান্ত হয়ে পড়ে। জাতীয় রোগতত্ত্ব ও নিয়ন্ত্রণ গবেষণা প্রতিষ্ঠান বিশেষজ্ঞ প্রতিনিধি দল সে সময় জন্ডিস আক্রান্ত কয়েক শত মানুষের রক্তের নমুনা সংগ্রহ করে নিয়ে যায়।

গত কয়েক দিন ধরে এই এলাকায় আবারো হেপাটাইটিস ই এর প্রাদুর্ভাব মারাত্মক আকার ধরা দিয়েছে।

এপ্রিলের শেষদিকে হালিশহরের ঘরে ঘরে জন্ডিস ধরা পড়ার খবর ছড়িয়ে পড়লে সিভিল সার্জন কার্যালয়সহ স্বাস্থ্য সেবাদাতা সরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের তৎপরতা বাড়ে। মে মাসের শুরুতে ওই এলাকার ৩১ জনের রক্তের নমুনা সংগ্রহ করে ঢাকার রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটে(আইইডিসিআর) নিয়ে যাওয়া হয়। রক্তের নমুনা পরীক্ষা করা ৩১ জনের শরীরেই জন্ডিস (হেপাটাইটিস–ই) ধরা পড়ে আইইডিসিআর’র রিপোর্টে।

রক্তের নমুনার পাশাপাশি ওই এলাকার ৫টি পয়েন্ট থেকে পানির নমুনাও সংগ্রহ করে নিয়ে যাওয়া হয় ঢাকার আইইডিসিআরে। পরীক্ষার জন্য ওই নমুনা পাবলিক হেলথ ল্যাবরেটরিতে পাঠায় আইইডিসিআর। ৫টি পয়েন্ট থেকে সংগ্রহ করা পানির নমুনাকে আলাদাভাবে পরীক্ষা করে পাবলিক হেলথ ল্যাবরেটরি। পানিতে তিন ধরনের

ব্যাকটেরিয়ার অস্তিত্ব রয়েছে কিনা তা দেখা হয় পরীক্ষায়। ইনস্টিটিউট অব পাবলিক হেলথ ল্যাবরেটরির সিনিয়র মেডিকেল টেকনোলজিস্ট মো. আজিজুল হক, মেডিকেল অফিসার ডা. মাহমুদা খাতুন ও ল্যাবরেটরির প্রধান ডা.শাহানা আলম স্বাক্ষরিত রিপোর্টে দেখা যায়– ৫টির মধ্যে ৪টি পয়েন্টের পানিতে ব্যাকটেরিয়ার ক্ষতিকর পর্যায়ের অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি। এই ৪ পয়েন্টের পানি পরীক্ষার ফলাফল সন্তোষজনক উল্লেখ করা হয়। তবে বাকি একটি পয়েন্টের পানিতে স্বাভাবিক সীমাবদ্ধ প্যারামিটারের তুলনায় একটু বেশি সংখ্যক ব্যাকটেরিয়ার অস্তিত্ব ধরা পড়ে। সেটি ছিল হালিশহরের নয়া বাজার পয়েন্ট থেকে সংগ্রহ করা পানি এবং এ নমুনা পরীক্ষার ফলাফলকে সন্তোষজনক নয়(আনসেটিসফেক্টরি) বলে উল্লেখ করা হয় রিপোর্টে।

চট্টগ্রামের সিভিল সার্জন ডা. আজিজুর রহমান সিদ্দিকী জানান, ‘জন্ডিস আক্রান্ত হয়ে ইতোমধ্যে তিনজনের মৃত্যু হয়েছে। ওয়াসার পানি থেকেই পানি বাহিত রোগ ছড়িয়ে পড়ছে বলে অভিযোগ থাকলেও ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রকৌশলী এ কে ফজলুল্লাহ তা মানছেন না। তার দাবি, স্থানীয় বাসিন্দাদের সবগুলো ভূগর্ভস্থ পানির ট্যাঙ্কি ডুবে থাকে। আর সেখান থেকেই রোগ ছড়াচ্ছে।’

তবে হেপাটাইটিস-ই ভাইরাসের কারণে সংক্রমিত জন্ডিস নিরাময়যোগ্য বলে উল্লেখ করেন সিভিল সার্জন।এই সিভিল সার্জন আরও বলেন, আমরা হালিশহরে বাসায় বাসায় যাচ্ছি। তারা কোথাকার পানি ব্যবহার ও পান করে, সেই পানির নমুনা সংগ্রহ করছি। তাদের জীবনযাত্রা দেখছি।

জন্ডিসে আক্রান্ত হলেও এতে আতঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই বলছেন সিভিল সার্জন ডা. আজিজুর রহমান সিদ্দিকী। সিভিল সার্জনের দাবি– জন্ডিস পানিবাহিত রোগ। আবার ঘরে কিংবা হোটেলে বাসি খাবার খেলেও জন্ডিস হয়ে থাকে। জন্ডিসের মধ্যে ৫টি ক্যাটাগরি রয়েছে। হেপাটাইটিস–এ, বি, সি, ডি এবং ই। এর মধ্যে হেপাটাইটিস-‘বি’ ও ‘সি’ আক্রান্ত হলে সেটি গুরুতর বলা হয়। হেপাটাইটিস-‘ডি’ কে মধ্যম পর্যায় ধরা হয়।

আর হেপাটাইটিস ‘এ’ এবং ‘ই’–কে প্রাথমিক পর্যায় ধরা হয়ে থাকে। হালিশহরে যাদের রক্ত পরীক্ষা করা হয়েছে সবার শরীরে হেপাটাইটিস– ‘ই’ ধরা পড়েছে। অর্থাৎ জন্ডিসের প্রাথমিক পর্যায়। ততটা গুরুতর নয়। তাই এতে আতঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই। অবশ্য, জন্ডিসে আক্রান্ত গর্ভবতী নারীর ক্ষেত্রে সতর্ক হতে হবে জানিয়ে ডা.আজিজুর রহমান সিদ্দিকী বলেন, গর্ভবতী নারী জন্ডিসে আক্রান্ত হলে কিছুটা ভয় থাকে। তাই কোন গর্ভবতী নারীর জন্ডিসে আক্রান্ত হওয়ার আলামত পাওয়া মাত্র হাসপাতালে ভর্তি করতে হবে। এটাতে কোন ধরণের অবহেলা করা যাবে না। পাশাপাশি জন্ডিস হওয়ার পর ২/৩ সপ্তাহেও না সারলে ওই রোগীকে দ্রুত সময়ের মধ্যে হাসপাতালে ভর্তি করার পরামর্শ দিয়েছেন সিভিল সার্জন।

আর ওই এলাকার মানুষদের বিশুদ্ধ পানি পান করার পরামর্শ দিয়ে সিভিল সার্জন বলেন, সবাইকে আমরা ওয়াসার পানি কমপক্ষে ৩০ মিনিট ফুটিয়ে পান করার পরামর্শ দিয়েছি। আর বাসার পানির ট্যাঙ্ক বিহ্মচিং পাউডার দিয়ে পরিস্কারের কথা বলেছি। অন্তত চার মাস পরপর বাসার পানির ট্যাঙ্ক পরিষ্কার করতে হবে।

একদিকে জলাবদ্ধতা অন্যদিকে ওয়াসার খোঁড়াখুঁড়ি ও পানির লাইন লিকেজ হয়ে ময়লা আবর্জনা প্রবেশ করায় হালিশহর এলাকায় এ রোগ ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে বলে জানান এলাকাবাসী।

নগরীর হালিশহর এলাকায় অন্তত ৫ লাখ লোকের বসবাস রয়েছে। আর পুরো বর্ষা মৌসুমে এখানে বৃষ্টির পানি জমে গিয়ে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়। আর সারা বছরই জোয়ারের পানিতে এখানকার বেশ কিছু এলাকা ডুবে থাকে।

সারাবেলা/এসএ/এএম