ঢাকা, শনিবার, ২১ এপ্রিল ২০১৮

বীর মহিউদ্দিন চট্টলার...

আজাদ মঈনুদ্দীন

প্রকাশিত: ১৫ ডিসেম্বর ২০১৭ শুক্রবার, ০৫:৪১ পিএম

বীর মহিউদ্দিন চট্টলার...

অফিস থেকে মহিউদ্দিন চৌধুরীর সাক্ষাতকারের এসাইনমেন্ট দেওয়া হলে ভয়ে থাকতাম। কখন কী বলে বসেন। তাঁর সঙ্গে ব্যক্তিগত পর্যায়ে ঘনিষ্ঠ কাউকে সঙ্গে নিতাম, সহজে নিউজের বক্তব্য আদায়ের জন্য।এখনকার মত টিভি চ্যানেলের দাপট তখনও শুরু হয় নি। সম্ভবত ২০০৩ সালের দিকের কথা। সুপ্রভাত বাংলাদেশের উদ্বোধনী সংখ্যায় লিড নিউজের জন্য একটি সাক্ষাতকার নেওয়ার দায়িত্ব দেওয়া হলো আমাকে। কয়েক বার ফেল মেরে তখনকার কেন্দ্রীয় যুবলীগ নেতা মাসুম ভাইকে সাথে নিয়ে সিটি কর্পোরেশনে মেয়রের  অফিসে গেলাম। সেটাই ছিল প্রথম মহিউদ্দিন চৌধুরীর সামনা সামনি বসা। কথার শুরুতে বলে বসলেন ‘বেতন ঠিক মত পর না ?’

২০০৫ সালে মেয়র নির্বাচনে ভোট পাহারার সেই রাতে পেশাগত কারণে অনেকের সঙ্গেও আমিও ছিলাম স্টেডিয়ামের সেই কন্ট্রোল রুমে। চূড়ান্ত ফলাফলের পর ভোরে গেলাম নবনির্বাচিত মেয়রের বাসায়। প্রতিক্রিয়া জানার জন্য। মহিউদ্দিন চৌধুরী তখন বেডরুমে বিশ্রাম নিচ্ছিলেন। আমরা ছিলাম ৩/৪ জন। বেডরুমে ডেকে নিয়ে লাচ্ছা সেমাই খেতে দিলেন। কথা বলতে বলতে তাঁর চোখে গড়িয়ে পড়ছিল পানি। সেই প্রথম চট্টলবীরের চোখে পানি দেখেছিলাম। আনন্দাশ্রু, জনগণের ভালবাসার অশ্রু এমনই হয়।

পেশাগত কারণে আরো কয়েক বার মহিউদ্দিন চৌধুরীর বাসায় যাওয়ার সুযোগ হয়েছে। যত বার তাঁর সামনে যেতাম মুখের ভাষা হারিয়ে ফেলতাম। এমন ব্যক্তিত্ববান চট্টল দরদীর সামনে দাঁড়ানোটাই যেন সাহসের ব্যাপার। ওয়ান ইলাভেনের রাতে সারাদেশে যখন ব্যাপক ধরপাকড় চলছিল আমি তখন জনকন্ঠে কাজ করি। ব্যুরো প্রধান মোয়াজ্জেম ভাইয়ের নির্দেশে রাত ১১ টায় যেতে হলো তাঁর বাসায়। সিনিয়র সব নেতারা তখন আত্মগোপনে যেতে ব্যস্থ। সবার মোবাইল বন্ধ। একজন মহিউদ্দিন তখনও অসীম দৃঢ়তায় বসে ছিলেন তাঁর বাসার দো’তলার প্রিয় চেয়ারটিতে।সেই রাতে খুব কাছাকাছি বসার সুযোগ হয়েছিল প্রিয় নেতার সামনে।

সেদিন তিনি বলেছিলেন, আমি পালানোর মানুষ নই। আমি ননীর পুতুল নই। চট্টগ্রামেই আছি, এখানেই থাকব। তৎকালীন মেয়র ও নগর আওয়ামীলীগের সাধারণ সম্পাদক মহিউদ্দিন চৌধুরীর কথাগুলো নিয়ে পরদিন জনকন্ঠের প্রথম পৃষ্ঠার অনেক বড় অংশজুড়ে আমার বাই লাইনে ছাপা হলো সাক্ষাৎকারধর্মী রিপোর্ট “ ননীর পুতুল নই, আমি পালাতে শিখিনি -মহিউদ্দিন ” । ওয়ান ইলাভেনের পরদিন এটি শুধু চট্টগ্রাম নয়, সারাদেশের যে কোন নেতার প্রথম প্রতিবাদী বক্তব্য।

এই রিপোর্টের কয়েকদিন পর আমার বাই লাইনে ছাপা হলো সেই সময়ে আইনশৃংখলা বাহিনীর হাতে আটকের পর মারা যাওয়া বায়েজিদ এলাকার এক ওয়ার্ড কাউন্সিলরের মৃত্যুর খবর লিড নিউজ হিসাবে। এর এক মাসের মাথায় সেনা নিয়ন্ত্রিত সরকারের সময়ে তিন লাইনের এক চিঠিতে আমি-সহ সারাদেশে জনকন্ঠের ৬২জন সাংবাদিক চাকরি হারালাম। অনেক দিন বেকার ছিলাম।

বেকারত্বের সেই দিনেও সান্ত্বনার বাণী শুনিয়েছিলেন মহিউদ্দিন চৌধুরী। বলেছিলেন, জনকন্ঠ সম্পাদক আতিক উল্লাহ খান মাসুদ জেল থেকে ছাড়া পেলে নিজেই কথা বলব। কিছুদিন পর গ্রেফতার হন মহিউদ্দিন চৌধুরীও।

দীর্ঘদিন কারাবাসের পর চট্টলবীর ছাড়া পেলেন জেল থেকে। ততদিনে আমার চাকরি জুটে যায় যাযযায়দিন পত্রিকায়। জনকন্ঠের ইমরান ভাইসহ দেখা করতে গেলে মজা করে তিনি বললেন ‘তুইও বাঁশ হাইয়্যু, আরেও বাঁশ দিয়ি।ন ডরাইয়্যু।’

মহিউদ্দিন চৌধুরী আমার আত্মীয় নন। ব্যক্তিগতভাবে ঘনিষ্ঠতাও তেমন ছিল না। তারপরও আজ মনের অজান্তে কেন যেন চোখের পানি আসছে। মনে হচ্ছে আমার অতি আপনজন কেউ দুনিয়া ছেড়ে গেছে। জন মানুষের নেতারা তো এমনই হন। আপোষকামী স্বার্থবাজদের ভিড়ে আপোষহীন নেতা তো মহিউদ্দিন চৌধুরী একজনই।

বীরেরা মরতে পারে না। চন্দন হয় না বনে বনে, মহিউদ্দিন হয় না জনে জনে। একজন মহিউদ্দিন বছরে বছরে জন্মায় না। তাই তো মহিউদ্দিন চৌধুরীর মত একজন নেতার জন্য অপেক্ষা করতে হয় শত বছর। জাতি, ধর্ম দলমত নির্বিশেষে একজন নেতার জন্য সময় কেঁদেছেন, আক্ষেপ করেছেন এমন নেতা কি বাংলাদেশে আর কেউ আছেন ? সম্ভবত বঙ্গবন্ধুর পর এমন নেতা স্বাধীনতার ৪৬ বছরে মহিউদ্দিন ছাড়া আর কেউ জন্মায়নি। চট্টগ্রাম ছাড়া জীবনে তিনি আর কিছু বুঝতে চান নি। তাই চট্টগ্রামবাসীর কাছে তিনি আওয়ামীলীগের মহিউদ্দিন নয়, তিনি চট্টগ্রামের মহিউদ্দিন। মেয়র না থাকলেও তিনি মেয়র, এমনকি তার বাড়ির গলিটার নামও হয়ে গেছে মেয়র গলি। চট্টগ্রামবাসীর কাছে তিনি অধিকার আদায়ের সর্বশেষ বাতিঘর।তাই তো আজ চট্টগ্রামে সবার মুখে একটাই শ্লোগান ‘বীর মহিউদ্দিন চট্টলার, রুখে মহিউদ্দিন সাধ্য কার’। 

আমরা বঙ্গবন্ধুকে দেখিনি। তাই একজন মহিউদ্দিনই আমাদের কাছে বঙ্গবন্ধুর প্রতিচ্ছবি। আমৃত্যু আপনি আমাদের গল্পের মানুষ, স্বপ্নের মানুষ হয়েই থাকবেন প্রিয় নেতা।

লেখক : সাংবাদিক