ঢাকা, সোমবার, ১১ ডিসেম্বর ২০১৭

একশ’ টাকা থেকে কোটিপতি নাজিম

রবিউল হোসেন, পটিয়া

প্রকাশিত: ২০ নভেম্বর ২০১৭ সোমবার, ১০:৪৬ পিএম

একশ’ টাকা থেকে কোটিপতি নাজিম

একটি মুরগি দিয়ে দিয়ে খামার ব্যবসায় শুরু করে শতাধিক গুরুর মালিক হয়েছে নবগঠিত কর্ণফুলী উপজেলার চরলক্ষ্যা ইউনিয়নের বাসিন্দা নাজিম উদ্দীন হায়দার। এক কথায় বলা যায় খামার বিপ্লব ঘটিয়ে একশ টাকা থেকে কোটিপতি হয়েছেন। নাজিমের কাছ থেকে উৎসাহ পেয়ে কর্ণফুলী উপজেলার গড়ে উঠেছে ৫ শতাধিক ছোট বড় গরুর খামার। আর এসব খামার থেকে প্রতিদিন হাজার হাজার লিটার দুধ যাচ্ছে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে। নাজিম এ কারনে বিভিন্ন সময়ে পেয়েছেন স্থানীয় ও জাতীয় পুরস্কার।

বর্তমানে দায়িত্ব পালন করছেন খামারীদের কয়েকটি সংগঠনে এবং বিগত দু বার নির্বাচিত হয়েছে বাংলাদেশ দুগ্ধ উৎপাদনকারী সমবায় ইউনিয়ন লিমিটেড (মিল্কভিটা)’র পরিচালক হিসেবে। তার একান্ত প্রচেষ্টায় কর্ণফুলী উপজেলাধীন চরলক্ষ্যায় গড়ে উঠেছে পশ্চিম পটিয়া দুগ্ধ শীতলীকরণ কেন্দ্র। যা একটি পূর্ণাঙ্গ দুগ্ধ শীতলীকরণ কেন্দ্র স্থাপনের জন্য একনেকে পাস হয়েছে।

নাজিম উদ্দিন হায়দার নবগঠিত কর্ণফুলী উপজেলার চরলক্ষ্যা ইউনিয়নের ৩নং ওয়ার্ডের পিতা মাস্টার রশীদ আহমদের সন্তান। তারা ৪ ভাই ২ বোনের মধ্যে নাজিম তৃতীয়। কিশোর জীবন থেকে শুরু করে নাজিমের প্রতিভা প্রতিটি কাজে সাফল্য এনেছে। ১৯৯১ সালে একটি মুরগি দিয়ে খামারের ব্যবসা শুরু করেন। একশ টাকা দিয়ে মুরগির খামার ব্যবসা শুরু করে যা মুনাফা হয়েছে সর্বমোট ৬’শ টাকা দিয়ে একটি ছাগল পালন শুরু করেন। যা কিছুদিন পর ৩ হাজার ৩’শ টাকা বিক্রি করে দেন। ছাগল বিক্রি করে একটি গরুর বাছুর কিনে বর্গা দিয়ে দেন। বাছুর বড় হলে সেটি বিক্রি করে ৩৫ হাজার টাকা পেলে সেখানে প্রায় ২৪ হাজার টাকা মুনাফা হয় তার। পরবর্তীতে ১৯৯৫ সালে ৫০ হাজার টাকায় শুরু করেন ব্রয়লার মুরগির খামার।

সেখান থেকে আর থেমে থাকতে হয়নি নাজিম উদ্দীন হায়দারকে। প্রবীন এক আওয়ামীলীগ নেতার অনুপ্রেরণায় সানোয়ারা ডেইরী ফার্মের মুরগীর পরিবেশক হিসেবে নিয়োগ পান তিনি। ১৯৯৬ সালে সানোয়ারা ডেইরী ফার্মের গরুর খামার পরিদর্শণে গেলে সেখান থেকে শুরু হয় নাজিমের গরু খামার গড়ার স্বপ্ন। সানোয়ারা ডেইরী ফার্ম থেকে ৪৪ হাজার টাকা দিয়ে একটি ফ্রিজিয়ান জাতের শংকর গাভী কিনেন। পাশাপাশি মুরগির খামারও চালিয়ে যাচ্ছিলেন। দীর্ঘ ১৪ বছরের মাথায় ২০১০ সালে বার্ড ফ্লু আক্রান্ত হয়ে নাজিমের মুরগির ব্যাপক ক্ষতি হয়। এতেও থেমে থাকেনি নাজিম।

গরুর খামারে মনোযোগ দেয়ায় বর্তমানে নাজিম উদ্দীন হায়দারের খামারে বর্তমানে ১০৭টি দুগ্ধ গাভী, ৪টি মহিষ, ৪টি ভেড়া, ৪টি উন্নত জাতের ছাগল ছাড়াও ১ হাজার বয়লার মুরগীর আলাদ ফার্ম রয়েছে। নাজিম উদ্দীন হায়দার জানান, তার খামার থেকে প্রতিদিন ৫ শ লিটার দুধ মিল্ক ভিটার কারখানায় যায়। তাছাড়া গরুর খামারের বর্জ্য দিয়ে বায়োগ্যাস প্ল্যান্ট করে ৩৫ পরিবারের মাঝে বাণিজ্যিক ভাবে সরবরাহ করে যাচ্ছে। যা বর্তমানে বন্ধ রয়েছে। শুধুই খামার নিয়েই বসে নেই নাজিম।

নাজিম উদ্দিন হায়দার বাংলাদেশ দুগ্ধ উৎপাদনকারী সমবায় লিমিটেডে (মিল্ক ভিটা)’র ২০১৫ সালে প্রথম পরিচালক নির্বাচিত হয়। পরবতীতে নির্বাচনের মাধ্যমে তিনি পুনরায় চট্টগ্রাম ও সিলেট বিভাগের পরিচালক নির্বাচিত হয়েছেন। এ পর্যন্ত নাজিম মিল্ক ভিটার তিনবার শ্রেষ্ঠ সমবায়ী হিসেবে পুরস্কারও পেয়েছেন। খামার শুরু করার সময় পশ্চিম পটিয়ার ডেইরী এসোসিয়েশন গড়ে সদস্য হন। পরবর্তীতে খামারীদের নির্বাচনের মাধ্যমে তিনি (নাজিম) কর্ণফুলী থানা ডেইরী এসোসিয়েশনের সাধারন সম্পাদক নির্বাচিত হন। এরপর নিজ উদ্যোগে গড়ে তোলে দক্ষিণ জেলা ডেইরী এসোসিয়েশন। বর্তমানে তিনি ওই এসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক।

এ সংগঠনের উদ্যোগে খামারীদের কল্যাণে তিনি বিভিন্ন আন্দোলন সংগ্রামেও ভূমিকা রেখেছেন। দুধের ন্যায্যমূল্যের দাবিতে রাস্তায় দুধ ঢেলে প্রতিবাদ জানান। যা সরকারের দৃষ্টিগোচর হয়। নাজিমের একান্ত প্রচেষ্টায় কর্ণফুলী চরলক্ষ্যা এলাকায় মিল্কভিটার দুুগ্ধ শীতলীকরন কেন্দ্র নির্মিত হয়েছে। যার পূর্ণাঙ্গ সহযোগিতা ছিল সাবেক স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী জাহাঙ্গীর কবির নানকের। বর্তমানে কর্ণফুলী উপজেলায় মিল্ক ভিটার একটি পূর্ণাঙ্গ কারখানা বাস্তবায়নাধীন। ২০১৩ সালে বিএনপি ও জাতায়াতের ডাকা হরতাল অবরোধ চলাকালে মিল্ক ভিটার দুধের গাড়ি চট্টগ্রাম থেকে ঢাকায় যেতে না পারার কারণে নাজিমের নেতৃত্বে খামারীরা ডোবায় দুধ ঢেলে প্রতিবাদ জানালে সরকারের উচ্চ পর্যায়ে দৃষ্টি আকর্ষণ হয়। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, তৎকালিন চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক, ভূমি প্রতিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী, পটিয়ার সংসদ সদস্য সামশুল হক চৌধুরীকে স্মারকলিপির মাধ্যমে খামারীদের বিষয়টি অবগত করান। পরবর্তীতে পুলিশ প্রশাসনের পটোকলে কর্ণফুলী মিল্ক ভিটার শীতলীকরণ কেন্দ্র থেকে থেকে ঢাকা মীরপুর মিল্ক ভিটার কারখানায় দুধ পাঠানো হতো।

সফল খামারী নাজিম উদ্দিন হায়দার বলেন, কিশোর জীবন থেকে তিনি সবকিছুতেই সফল হয়েছে। একটি মুরগী কিনেই প্রথমে তার ব্যবসা শুরু হয়। পরবর্তীতে ১টি দুগ্ধ গাভী কিনে লালন পালন শুরু করেন। যা বর্তমানে গাভীর সংখ্যা ১০০ পেরিয়েছে। খামারের দেখাশোনাসহ সব ক্ষেত্রে তিনি লেগেই থাকেন। দুগ্ধ শিল্পকে বাঁচিয়ে রাখতে মিল্ক ভিটার অর্থায়নে তার এলাকায় একটি দুধ শীতলীকরন কেন্দ্র স্থাপন করা হয়েছে। দুগ্ধ শীতলীকরন কেন্দ্রের ফলে এলাকার খামারীরা বিভিন্নভাবে লাভবান হচ্ছেন। তিনি (নাজিম) প্রান্তিক সমবায় কৃষকদের মুখে হাসি ফুটাতে দক্ষিণ জেলা ডেইরী এসোসিয়েশন নামের একটি সংগঠনও করেছেন। সুযোগ পেলেই তিনি খামারীদের যে কোন সহযোগিতায় এগিয়ে আসেন। তিনিও সকলের সহযোগিতা কামনা করেছেন।