ঢাকা, সোমবার, ১১ ডিসেম্বর ২০১৭

কেইপিজেডে ২০ হাজার শ্রমিকের দিনবদল

এম নুরুল ইসলাম, আনোয়ারা

প্রকাশিত: ১৯ নভেম্বর ২০১৭ রবিবার, ০৭:২৬ এএম

কেইপিজেডে ২০ হাজার শ্রমিকের দিনবদল

এক সময়ের নীরব পাহাড়ি দেয়াঙ এলাকায় এখন ভোর হয় হাজারো মানুষের ব্যস্থতায়। সকাল সাতটা থেকে কোরিয়ান রপ্তানি প্রক্রিয়াজাতকরণ এলাকার (কেইপিজেড) ২৩ ফ্যাক্টরিতে ২০ হাজারেরও বেশি শ্রমিক-কর্মচারীর কর্মচাঞ্চল্য পাল্টে দিয়েছে এলাকার চেহারা। শুধুমাত্র শ্রমিকদের বেতন থেকে বছরে ২০০ কোটি টাকারও বেশি যোগ হচ্ছে স্থানীয় অর্থনৈতিক প্রবাহে। তাতে পরিবর্তন এসেছে এলাকার সাধারণ মানুষের জীবনমানে।

স্থানীয় বৈরাগ গ্রামের রুখসানা একসময় কাফকো কলোনিতে বাসাবাড়িতে ঝিয়ের কাজ করতেন। বেতন পেতেন মাসে ২ হাজার টাকা। তার ছোট বোন জয়নাব একই বাসার স্কুল পড়–য়া ছেলে মেযেদের আনা নেওয়া করতেন। এক বেলা খাবারের সাথে সে বেতন পেত ৫শ’ টাকা। দুই বোন এখন কাজ করেন কেইপিজেডের জুতা কারখানায়। আয় প্রায় ২২ হাজার টাকা। খাওয়া-দাওয়া আর বাদ বাকী খরচের পরও তাদের সঞ্চয় থাকে ৮ হাজার টাকার বেশি। সেই টাকায় স্থানীয় একটি বেসরকারি ব্যাংকে দুই বোন মিলে মাসিক সঞ্চয়ী হিসাব খুলেছেন।

রুখসানা-জয়নাবের মতোই আনোয়ারায় প্রত্যন্ত গ্রামের শত শত নারী-পুরুষ কেইপিজেডে চাকরি করে ঘুরাচ্ছেন জীবনের চাকা। পরিবারে এসেছে আর্থিক সচ্ছলতা । গত ৩ বছর ধরে আনোয়ারার গ্রামীণ জনপদে এতটা পরিবর্তন এসেছে যে সেখানে এখন কম টাকায় বাসাবাড়ির কাজ করার মানুষ মিলছে না। প্রায় প্রতিটি গ্রামের ৫০ থেকে ১০০জন নারী পুরুষ কাজ করছে এসব কারখানায়। কাজ করতে আসেন পার্শ্ববর্তী কর্ণফুলী, চন্দনাইশ, পটিয়া, বাঁশখালীর লোকজনও।

কর্ণফুলী সু ফ্যাক্টরি কেইপিজেডের প্রথম কারখানা। সেখানে এখন প্রায় ১৮ হাজার শ্রমিক কাজ করেন। তাঁদের মধ্যে প্রায় ১৫ হাজার শ্রমিক আশপাশের গ্রামের। পরিকল্পনা অনুযায়ী সব কারখানা তৈরি হলে কেইপিজেডে সরাসরি এক লাখের বেশি শ্রমিকের কর্মসংস্থান হবে বলে মনে করে কর্তৃপক্ষ।

জীবনমান পরিবর্তনের সত্যতা মিলল শ্রমিকদের কন্ঠেও। ৩ সন্তানের মা জুতা কারখানার কর্মী লুৎফুন্নেছা। তার সংসারে কী পরিবর্তন এসেছে জানতে চাইলে বলেন, তিন বছর ধরে চাকরি করছেন। আগে ঘরে থাকা যেত না, পানি পড়ত। ঘর বসবাসের উপযোগী করেছেন। আগের চেয়ে এখন খাওয়া-দাওয়া ভালো। সব মিলিয়ে বেশ সুখে আছে তাঁদের পরিবার।

সত্যতা মিলল স্থানীয় সরকারি-বেসরকারি ব্যাংকের কর্মকর্তাদের কথায়ও। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ব্যাংক কর্মকর্তা জানান, কেইপিজেড এলাকার চাতরী চৌমুহনি ও বন্দর সেন্টার এলাকায় এখন সরকারি-বেসরকারি মিলিয়ে ১০ টি ব্যাংকের শাখা রয়েছে। আমানত পাওয়ার সুযোগ থাকায ব্যাংকগুলো নতুন নতুন শাখা করতে হুমড়ি খেয়ে পড়ছে। এসব ব্যাংক শাখায় শুধুমাত্র কেইপিজেডকর্মীদের ২০ হাজার সঞ্চয়ী হিসাব রয়েছে। এতে বুঝা যাচ্ছে জীবনমান কতটা বদলে গেছে।

কেইপিজেডের নির্বাহী পরিচালক মোহাম্মদ শাহজাহান বলেন, এই রপ্তানি প্রক্রিয়াজাতকরণ অঞ্চল ঘিরে পাল্টে গেছে এলাকার চেহারা। নারী কর্মসংস্থানে বড় ধরনের সুযোগ তৈরি হয়েছে। প্রস্তুতকত জমিতে এখনই বিনিয়োগ আনা সম্ভব হবে।

কর্ণফুলী নদীর দক্ষিন তীর তথা আনোয়ারাতে অবস্থিত কোরিয়ান ইপিজেড (কেইপিজেড) বাংলাদেশের সর্ববৃহৎ পরিবেশ বান্ধব প্রাইভেট ইপিজেড। ১৯৯৯ সালের অক্টোবর মাসে তৎকালীন ও বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এই প্রকল্পটি উদ্বোধন করেন।

চট্টগ্রামের আনোয়ারায় এ রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চলটি প্রতিষ্ঠার জন্য ১৯৯৯ সালে ২ হাজার ৪৯২ একর জমি অধিগ্রহণ করে সরকার কোরিয়া সরকারের মনোনীত প্রতিষ্ঠান ইয়াংওয়ান করপোরেশনকে বুঝিয়ে দেয়। ইয়াংওয়ান প্রতিষ্ঠা করে কেইপিজেড করপোরেশন নামের একটি কোম্পানি। পরিবেশ অধিদপ্তর কেইপিজেডকে ছাড়পত্র দেয় ২০০৯ সালে।

কেইপিজেডের পৃষ্ঠপোষক কোম্পানি ইয়াংওয়ান করপোরেশন বাংলাদেশের পোশাক খাতে প্রথম বিদেশি বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠান। এটি ১৯৮৭ সালে প্রথম চট্টগ্রাম রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চলে কারখানা করে। বর্তমানে বাংলাদেশে ইয়াংওয়ানের ১৭টি শিল্প ইউনিট আছে। এতে কাজ করেন প্রায় ৬৫ হাজার কর্মী। বাংলাদেশসহ ১৩টি দেশে ইয়াংওয়ানের কার্যক্রম আছে।

কর্তৃপক্ষ জানায়, কেইপিজেড পরিবেশ ছাড়পত্রের নির্দেশনা মেনে নিয়ে সকল প্রকার উন্নয়ন কার্যক্রম পরিচালনা করছে। বর্তমানে মোট বরাদ্দ প্রাপ্ত জমির মধ্যে ২২৯২ একর জমির উন্নয়ন কার্যক্রম সম্পন্ন করা হয়েছে। তৎমধ্যে পরিবেশ ছাড়পত্রের শর্ত মোতাবেক মোট জমির ৩৩ শতাংশ জমিতে বিভিন্ন প্রকারের বৃক্ষরোপনের মাধ্যমে সবুজায়ন করা হয়েছে, ১৯ শতাংশ জমি সবুজ মাঠ ও লেক তৈরী করে উন্মুক্ত স্থান হিসাবে রাখা হয়েছে অর্থাৎ ৫২ শতাংশ জমি তথা প্রায় ১৩০০ একর জমির সম্পুর্ন উন্নয়ন কাজ সমাপ্ত করা হয়েছে। বাকী ৪৮ শতাংশ বা ১১৯২ একর জমি শিল্প স্থাপনের জন্য নির্ধারন করা হয়েছে, যার মধ্যে ৯৯২ একর জমির শিল্প স্থাপনের জন্য সম্পুর্নরূপে প্রস্তুত করা হয়েছে । কেইপিজেড বলছে, পুরো উন্নয়নকাজ শেষ হতে দুটি শুকনো মৌসুম লাগবে।

কেইপিজেডের পরিকল্পনা অনুযায়ী, সব মিলিয়ে অবকাঠামো উন্নয়নে মোট ব্যয় হবে ২০ কোটি ডলার। আর বিনিয়োগ আসবে প্রায় ১২০ কোটি ডলারের। সেখান থেকে বছরে ১০০ কোটি ডলারের বেশি মূল্যের পণ্য রপ্তানি হবে বলে আশা করছে কেইপিজেড কর্তৃপক্ষ।

এই মুহুর্তে ইয়ংওয়ান কর্পোরেশানের অর্ন্তভুক্ত পাঁচটি কোম্পানী কর্ণফুলী সু ইন্ডস্ট্রিজ লিমিটেড, কর্ণফুলী পলিয়েষ্টার প্রোডাক্ট , এভারটপ প্রোডাক্ট ডেভেলাপমেন্ট কোম্পানী, গায়া প্রোডাক্ট ডেভেলাপমেন্ট কোম্পানী ও দেই-গু প্রোডাক্ট ডেভেলাপমেন্ট কোম্পানী কেইপিজেড-এ বিনিয়োগ করেছে। উৎপাদনে আছে ২৩টি ফ্যাক্টরী ইউনিট ।

কেইপিজেড সূত্র জানায়, এখন পর্যন্ত ২৩টি কারখানা ভবন নির্মাণ করেছে, যার আয়তন ২৫ লাখ বর্গফুট। তিনটি ডিজাইন অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট সেন্টারের নির্মাণকাজ চলছে। বিনিয়োগকারীদের থাকার জন্য একটি গেস্টহাউস চার বছর আগেই নির্মাণ করা শেষ হয়েছে। আরও একটি নির্মাণের কাজ চলছে। ১৬ কিলোমিটার লাইন বসিয়ে পুরো এলাকায় বিদ্যুতের আওতায় আনা হয়েছে। নারী শ্রমিকদের থাকার জন্য কেইপিজেড এলাকায় ১২টি ডরমেটরি নির্মাণ করা হবে, এর মধ্যে তিনটির কাজ চলছে।

তবে সরকারী দাপ্তরিক জটিলতার কারনে কেইপিজেড জমির নামজারি সম্পন্ন করতে পারেনি। বাংলাদেশে প্রচলিত আইন অনুসারে জমির নামজারি হলেই কেইপিজেড অপরাপর বিনিয়োগকারীদের অনুকুলে শিল্প স্থাপনের জন্য জমি বরাদ্দ প্রদান করতে পারবে। এক্ষেত্রে জমির নামজারি সংক্রান্ত বিষয়ে কেইপিজেড কর্তৃপক্ষ সরকারের সুদৃষ্টি ও সুবিবেচনা একান্তভাবে কাম্য করছে এবং আশা করা হচ্ছে অচিরেই বিষয়টির একটি অনুকুল সুরাহা হবে।

কেইপিজেডের সহকারী ব্যবস্থাপক মো. মুশফিকুর রহমান জানান, বর্তমানে স্থাপিত ফ্যাক্টরীগুলোতে কর্মরত প্রায় ২০ হাজার স্থানীয় শ্রমিকের আয়ের মাধ্যমে বাৎসরিক প্রায় ২০০ কোটি টাকার নগদ সঞ্চালন হচ্ছে। যা এ অঞ্চল সহ দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে সহায়তা করছে।