AD
ঢাকা, শুক্রবার, ২৮ জুলাই ২০১৭

২২০০ প্রতিনিধির কারো বক্তৃতা নেই

সারাবেলা প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ১৭ জুলাই ২০১৭ সোমবার, ০৮:১০ এএম
২২০০ প্রতিনিধির কারো বক্তৃতা নেই

দীর্ঘদিনের বিরোধ ভুলে চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা আওয়ামীলীগের দুটি ধারা এক হয়ে আয়োজন করেছিলেন প্রতিনিধি সম্মেলন। দুই ধারার দুই কান্ডারি ভূমি প্রতিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী জাবেদ এমপি ও জেলা আওয়ামীলীগ সভাপতি মোছলেম উদ্দিন আহমদ ছিলেন মঞ্চে। ছিলেন তৃণমূলের ২২শ’ প্রতিনিধি। কিন্তু তাদের একজনও বক্তব্যের সুযোগ পাননি। কেন্দ্রীয় ও জেলার নেতারাই শুধু বললেন। এ নিয়ে ক্ষোভ ঝেড়েছেন খোদ অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি আওয়ামীলীগের সাধারণ সম্পত ওবায়দুল কাদেরও।

বাকলিয়াস্থ কেবি কনভেনশন সেন্টারে রোববার সকালে আয়োজিত প্রতিনিধি সম্মেলনে চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা আওয়ামীলীগের ৮ টি উপজেলা ও ৫টি পৌরসভার ২২ শ’ প্রতিনিধি উপস্থিত ছিলেন। এসব প্রতিনিধির উপস্থিতিতে সম্মেলন ছিল উৎসবমুখর। সম্মেলনে সাংসদের বক্তব্যের পরই আমন্ত্রিত কেন্দ্রীয় নেতারা বক্তব্য দেন। সব নেতাই তাদের বক্তব্যে তৃণমূলকে গুরুত্ব দিয়েছেন এবং বিভিন্ন সময় তৃণমূলের অবদানের কখা তুলে ধরেন। এছাড়া তৃণমূলকে শক্তিশালী করার জন্য নানা দিকনির্দেশনাও দিয়েছেন। সম্মেলনে তৃণমূল নেতা-কর্মীদের নিয়ে এমন প্রশংসায় আনন্দে উদ্বেলিত হয়ে উঠেন তৃণমূল নেতা-কর্মীরা।

দুপুর ১২টায় জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি মোছলেম উদ্দিন আহমেদের সূচনা বক্তব্যের মাধ্যমে শুরু হওয়া দুই ঘন্টা ১০ মিনিটের সম্মেলনের মূল অনুষ্ঠানে নিজেদের দাবি দাওয়া নিয়ে কিছু বলতে না পারায় হতাশ হয়েছেন তৃনমূল নেতাদের অনেকে।

তৃণমূলের নেতা-কর্মী প্রসঙ্গে সম্মেলনে প্রধান অতিথি আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেন, সভায় এতলোকের উপস্থিতি দেখে ভালো লাগছে। নেতার এমন বক্তব্যে নেতাকর্মীদের করতালিতে মেতে উঠে পুরো সম্মেলন কক্ষ। এ সময় ওবায়দুল কাদের বলেন, তালি বাজাবেন না। পরের লাইনটি বললে আপনারা আর তালি বাজাবেন না।

তিনি বলেন, আপনাদের এই উপস্থিতির কোন দাম আমার কাছে নেই। সভার নাম হচ্ছে তৃণমূল। কিন্তু তৃণমূণের একজনও এখানে বক্তব্য দিতে পারেননি। এমপি সাহেবেরা ও কেন্দ্রীয় নেতারা বললেন। কিন্তু যারা এ সমাবেশের প্রাণভোমরা তারা কিছুই বলতে পারেননি। আয়োজকদের উদ্দেশ্যে মন্ত্রী বলেন, আপনারা ৮ টি উপজেলার ৮ জনকে ২ মিনিট করে বক্তব্য দেয়ার সুযোগ তৈরি করে দিলে কি হত। তিনি বলেন, দক্ষিণ জেলার ৮ টি উপজেলায় তৃণমূল নেতাকর্মীদের নিয়ে আপনারা শীঘ্রই বর্ধিত সভার আয়োজন করবেন। বর্ধিত সভা ডেকে আপনারা তৃণমূলের কথা শুনবেন। তৃণমূলের কথা একটু খারাপ লাগবে। সমালোচনা থাকবে। সমালোচনা আমাদের শুনতে হবে। সমালোচনা যদি আওয়ামী লীগের জেনারেল সেক্রেটারির বিরুদ্ধে হয়ে থাকে তারপরও আমি শুনব। কেউ কেউ মনে করেন সমালোচনা করলে যে একটা পদ সেটা চলে যেতে পারে। এ কারণে অনেকেই মনের কথা বলতে পারে না। এদের মুখের ভাষা খুলে দিতে হবে। ভেতরে দগদগে ঘা রেখে আর বাইরে রোজ পাউডার মাখলে সত্যকে ঢাকা যাবে না।

আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় যুগ্ম সম্পাদক মাহবুবুল আলম হানিফ বলেন, তৃণমূলের নেতাকর্মীদের এখানে বক্তব্য প্রদানের সুযোগ দেয়া হয়নি। এর ফলে তৃণমূল নেতা-কর্মীদের কি দাবি-দাওয়া, আমরা আসলে সেটা জানতে পারলাম না। তবে সামনে বর্ধিত সভা করে সেখানে তৃণমূল নেতা-কর্মীদের কথা আমরা শুনব।

কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক এনামুল হক শামীম বলেন, তৃণমূলের নেতা-কর্মীরা হচ্ছে সংগঠনের প্রাণ। অনেক জাতীয় নেতা বিশ্বাসঘাতকতা করে। কিন্তু আমাদের তৃণমূলের নেতা-কর্মীরা বিশ্বাসঘাতকতা করে না। তৃণমূল নেতা-কর্মীদের ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনের কারণে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কারাবাস থেকে মুক্ত হয়েছিলেন।

সাংগঠনিক সম্পাদক ব্যারিষ্টার মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল বলেন, খালেদা জিয়া লন্ডনে যতবার গিয়েছেন, ততবার বাংলাদেশ নিয়ে ষড়যন্ত্র হয়েছে। তাদের কোন ষড়যন্ত্রে কাজ হবে না জানিয়ে নওফেল বলেন, এজন্য নেতা-কর্মীদের মানুষের দুয়ারে দুয়ারে গিয়ে উঠান বৈঠক করে জননেত্রী শেখ হাসিনার উন্নয়ন কর্মকাণ্ড তুলে ধরতে হবে।

আওয়ামী লীগের প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক ড. হাছান মাহমুদ বলেন, আওয়ামী লীগের সাথে অনেকেই বিশ্বাসঘাতকতা করেছে। অনেকে দল ছেড়েছে। কিন্তু তৃণমূল নেতারা সবসময়ই পাশে থেকেছে। কেন্দ্র থেকে তৃণমূল পর্যন্ত ঐক্যবদ্ধ হওয়ার দরকার বলে জানিয়েছেন তিনি।

কেন্দ্রীয় উপ প্রচার সম্পাদক আমিনুল ইসলাম আমিন বলেন, রাজনীতি করে কি পেলাম আর কি পেলাম না- এমন ধারণা নিয়ে কোন রাজনীতি হতে পারে না। রাজনীতি হচ্ছে দেশ ও মানুষের জন্য ত্যাগ। জনগণের মুক্তির জন্যই হতে হবে রাজনীতি।

উপ দপ্তর সম্পাদক ব্যারিস্টার বিপ্লব বড়ুয়া বলেন, বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ সকল স্তরে আস্থার প্রতীক হয়েছে। ভাতের অধিকার ও ভোটের অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। আওয়ামী লীগের প্রাণ শক্তি হচ্ছে তৃণমূলের নেতৃবৃন্দ। তৃণমূল নেতা-কর্মীদের ওপর ভর করেই বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ বারবার ঘুরে দাঁড়িয়েছে। এই তৃণমূল নেতাদের ওপর ভর করেই আবারো আগামী জাতীয় নির্বাচনে বিজয় অর্জন করতে হবে।

তিনি বলেন, দক্ষিণ জেলা আওয়ামী লীগের যে রাজনৈতিক সমস্যা ছিল- সেখান থেকে আপনারা মুক্ত হয়ে ঐক্যবদ্ধ হয়েছেন। এটা আওয়ামী রাজনীতির জন্য ভালো খবর।

ভূমি প্রতিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী জাবেদ বলেন, সুশৃঙ্খল ঐক্যের কোনো বিকল্প নেই। আজকের সভা তারই প্রমাণ। বিভিন্ন জনের সাথে বিভিন্ন জনের মতপার্থক্য থাকতে পারে। কিন্তু আমরা যারা বঙ্গবন্ধুর সৈনিক, আমরা প্রমাণ করেছি দলের প্রশ্নে কোন ছাড় নয়। সকল পর্যায়ের নেতা-কর্মীদের ঐক্যবদ্ধ পদ ক্ষেপে আগামী নির্বাচনে দক্ষিণ চট্টগ্রামের ৬টি আসন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার হাতে তুলে দেবার আহ্বান জানান ভূমি প্রতিমন্ত্রী।

প্রধান অতিথির বক্তৃতায় আগামী নির্বাচনের প্রস্তুতি শুরুসহ আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন দলের সাধারণ সম্পাদক, সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের। তিনি বলেছেন, ‘আপনারা ঐক্যবদ্ধ না হলে, আপনারা দুর্বল হলে আওয়ামী লীগের যে ক্ষতি হবে ২০০১ সালের চেয়েও ভয়ংকর হবে পরিস্থিতি। আওয়ামী লীগ ঐক্যবদ্ধ থাকলে আওয়ামী লীগের বিজয় কেউ ঠেকাতে পারবে না, ইনশা আল্লাহ।’

ওবায়দুল কাদের বলেন, যদি বিএনপি ও তার মিত্ররা আবার ক্ষমতায় আসে তাহলে তারা হত্যাকাণ্ড শুরু করবে, আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের বাড়িঘরে আগুন দিবে এবং ২০০৪ সালের মতো গ্রেনেড হামলা চালাবে। তিনি ২০০১ সালের নির্বাচনের মতো ‘দুর্ভাগ্য’ এড়াতে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের নেতাকর্মীদের প্রতি আগামী নির্বাচনে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানান। আগামী  নির্বাচনকে কেন্দ্র করে নতুন ইস্যু সৃষ্টির জন্য বিএনপি এখন ষড়যন্ত্র করছে এবং ওই দলটি আবারও পরাজিত হবে বলে তিনি মন্তব্য করেন।

আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক তৃণমূলের নেতাকর্মীদের প্রতি দলীয় নিয়মনীতি মেনে চলার আহ্বান জানান এবং সতর্ক করে দিয়ে বলেন, দলীয় আদর্শ ও চেতনা থেকে বিচ্যুতি কঠোরভাবে মোকাবিলা করা হবে।

দেশের ব্যাপক উন্নয়নে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভূমিকা এবং তাঁর অর্জনের কথা উল্লেখ করে ওবায়দুল কাদের বলেন, কিছু লোকের নেতিবাচক কর্মকাণ্ডের জন্য সেগুলো ম্লান হয়ে যেতে পারে।
আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক দলের নেতাকর্মীদের প্রতি আগামী নির্বাচনের জন্য প্রস্তুতি নেওয়ার আহ্বান জানান এবং নির্বাচনে যথাযথভাবে অংশগ্রহণের জন্য প্রত্যেক ওয়ার্ড ও ইউনিয়নে কমিটি গঠনের নির্দেশনা দেন।