ঢাকা, সোমবার, ১১ ডিসেম্বর ২০১৭

সৌদি আরবে যেভাবে নির্যাতিত হন গৃহবধু…

সারাবেলা ডেস্ক

প্রকাশিত: ২৭ আগস্ট ২০১৭ রবিবার, ১১:৫৪ পিএম

সৌদি আরবে যেভাবে নির্যাতিত হন গৃহবধু…

অর্থ-উপার্জনের জন্য সৌদি আরবে গিয়ে নিয়োগকর্তার হাতে  দিনের পর দিন নির্যাতনের শিকার হয়েছেন বলে জানিয়েছেন চুয়াডাঙ্গার এক গৃহবধূ। তিনি বলেন, ‘আমি হাবলু দালালের মাধ্যমে সৌদি আরব যাই। দুই মাস চাকরি করার পর বেতন চাইলে মালিক বললেন, তিনি আমাকে দুই বছরের জন্য ৬ লাখ টাকায় কিনে নিয়েছেন। এরপর কাজ করব না বলে জানালে মালিক আমার ওপর নির্যাতন শুরু করেন।’ রবিবার তিনি এসব কথা বলেন।

নির্যাতনের শিকার গৃহকর্মী বলেন, ‘গত ৯ মাস আগে আমি ও আমার স্বামীকে সৌদি আরবে মোটা বেতনের চাকরি দেওয়ার কথা বলে দেড় লাখ টাকা নেন হাবলু। টাকা নেওয়ার একমাস পর আমার ভিসা এলেও  আমার স্বামীর আসেনি। তার ভিসা পরে আসবে বলে জানান দালাল। এরপর আমাকে ঢাকা গুলশান-২ নতুন বাজারের আল জাহান এজেন্সির মাধ্যমে সৌদি আরবে তিনি। সেখানে একটি বাড়িতে রাখা হয় আমাকে। এরপর গৃহ-পরিচারিকার কাজ শুরু করি।’

গৃহবধূ বলেন, ‘মাস দুয়েক পর যখন বেতনের কথা বলি, তখনই মালিক বেতনের টাকা দিতে অস্বীকৃতি জানিয়ে বলেন, তোমাকে ২ বছরের জন্য ৬ লাখ টাকা দিয়ে বাংলাদেশের দালালের কাছ থেকে কিনে নিয়েছি। একথা শুনে কাজ করতে অস্বীকৃতি জানাতেই শুরু হয় নির্যাতন। প্রতিদিন ছয় থেকে সাতবার  ছ্যাঁকা দেওয়া হতো। ওই ছ্যাঁকাতেই হাতে ফোস্কা পড়েছে। দীর্ঘ সাত মাস নির্যাতনের পর একই ফ্ল্যাটে থাকা চট্টগ্রামের এক নারীকে ঘটনাটি খুলে বলি। এরপর তার সহযোগিতায় হাসপাতালে ভর্তি হই। ৩ দিন পর হাসপাতালে উপস্থিত সাংবাদিকদের কাছে নির্যাতনের কথা জানাই। তারাই আমাকে বাংলাদেশের দূতাবাসে পাঠান। সেখান থেকে গত বৃহস্পতিবার (২৪ আগস্ট) বিকালে বিমানযোগে দেশের মাটিতে পা রাখি। পরদিন সকালে বাড়ি ফিরে হাসপাতালে ভর্তি হই।’ তিনি আরও বলেন, ‘হাবুলের সঙ্গে আমার স্বামী মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করলে দালাল তাকে হত্যার হুমকি দেয়।’

নির্যাতনের বর্ণনা দিতে দিতে এই নারী তার হাত ও পায়ের ছ্যাঁকা দেওয়া ক্ষত দেখিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন। তিনি বলেন, ‘দালাল চক্রের সদস্যদের শাস্তি না হলে আমি মরেও শান্তি পাব না। তাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চাই।’

এই প্রসঙ্গে নির্যাতনের শিকার নারীর স্বামী বলেন, ‘এ ব্যাপারে দালাল হাবলুসহ অন্যদের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করা হবে।’

হাসপাতালে গৃহবধূকে দেখতে যান চুয়াডাঙ্গা জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি জাতীয় সংসদের হুইপ সোলায়মান হক জোয়ার্দ্দারের প্রতিনিধি হিসেবে জেলা ছাত্রলীগের সভাপতি মোহায়মেন হাসান জোয়ার্দ্দার অনিক। তিনি  বলেন, ‘বিদেশে নির্যাতনের বর্ণনা শুনে দুঃখ প্রকাশ করে চিকিৎসার যাবতীয় ব্যয়ভার বহনের ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন হুইপ। তার নির্দেশে এই নারীর চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হচ্ছে।’

এদিকে রবিবার বেলা সাড়ে ১১টার দিকে চুয়াডাঙ্গা জেলা প্রশাসক জিয়াউদ্দীন আহমেদ চুয়াডাঙ্গা সদর হাসপাতালে চিকিৎসাধীন এই নারীর  শয্যার পাশে দাঁড়িয়ে ঘটনার বর্ণনা শোনেন। তিনি ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির বিষয়টি নিশ্চিত করতে  প্রয়োজনীয় আইনি সহায়তার আশ্বাস দেওয়ার পাশাপাশি নগদ ১০ হাজার টাকা দেন। প্রয়োজনে আরও অর্থ দেওয়া হবে বলেও তিনি প্রতিশ্রুতি দিয়ে বলেন, ‘তোমার পাশে পুরো চুয়াডাঙ্গা রয়েছে। ভেঙে পড়ার কারণ নেই। হাবলু ও তাদের মতো দালালদের উপযুক্ত শাস্তিই হবে। আল জাহান এজেন্সির সনদ বাতিলসহ তার স্বত্বাধিকারীদেরও আইনের আওতায় নেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।’

আলমডাঙ্গার থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আকরাম হোসেন জানান, ‘যে কাজ দেওয়ার কথা বলে আল-জাহান এজেন্সি এই গৃহবধূকে সৌদি পাঠিয়েছিল, তিনি সে কাজ পাননি। আর সে কারণেই সৌদিতে গিয়ে নির্যাতনের শিকার হন। আল-জাহান এজেন্সি তাদের শর্ত ভঙ্গ করেছে, তাদের ব্যাপারে ঊর্ধ্বতনদের জানানো হয়েছে। নির্দেশ ফেলে এজেন্সির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এছাড়া আল জাহান এজেন্সির আলমডাঙ্গা প্রতিনিধি হাবলুর বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

এই বিষয়ে বাংলাদেশ দূতাবাসের শ্রম কাউন্সিলর সরওয়ার আলম বলেন, ‘আমরা ওই নারীর নির্যাতনের ভিডিও সম্পর্কে জানার পর তদন্ত শুরু করেছি। আমরা বাংলাদেশ ও সৌদি আরব, দু`জায়গায়ই যোগাযোগ করেছি৷ এখন ওই নারী গৃহকর্মীর বক্তব্য শুনব।’ তিনি আরও বলেন, ‘ওই নারী এখন বাংলাদেশেই তার গ্রামের বাড়িতে আছেন৷ তার বক্তব্য নেওয়া হচ্ছে। আর আমরা সরকারের সঙ্গেও যোগাযোগ করেছি।’

উল্লেখ্য, নির্যাতনের শিকার নারী গত ২২ জানুয়ারি সৌদি আরব যান। সৌদিতে তার নিয়োগকর্তা আজিজা নাশহাত মোহাম্মদ আলী কাকা।

নির্যাতনের শিকার গৃহবধূ গত বৃহস্পতিবার (২৪ আগস্ট) দেশে ফিরে আসেন।  দেশে ফেরার আগে তিনি রিয়াদ বিমানবন্দরে উড়োজাহাজে বসে এক আরবকে ওই নির্যাতনের বর্ণনা দেন। তার বক্তব্য দেওয়ার সময় ওই সৌদি নাগরিক তা ভিডিও করেন। ভিডিওতে ওই তার এক হাতে ক্ষতচিহ্ন, আরেক হাতে গোটা গোটা ফোস্কা দেখা যায়। ভিডিওটি ইউটিউবে আপলোডের পর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে।