ঢাকা, মঙ্গলবার, ১৭ জুলাই ২০১৮

১২ বছরের শিশু ইলহামের কী দোষ

সারাবেলা প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ২৮ জুন ২০১৮ বৃহস্পতিবার, ০৮:৪৪ এএম

১২ বছরের শিশু ইলহামের কী দোষ

বাসার ভেতরে জবাই করে খুন করা হয়েছে বারো বছরের এক কন্যা শিশুকে। খুন করার পর শিশুটির মুখ বালিশচাপা দিয়ে রাখা হয়। গতকাল বুধবার সকালে নগরীর বাকলিয়ায় সৈয়দ শাহ রোডের ল্যান্ডমার্ক আবাসিক এলাকার এমএস লায়লা ভবনের ষষ্ঠ তলায় এ ঘটনা ঘটেছে। সকাল (বুধবার) আটটা থেকে নয়টার মধ্যে এ ঘটনা সংঘটিত হয়।

তবে কি কারণে শিশুটিকে খুন করা হয়েছে তা নিশ্চিত হতে পারেনি পুলিশ। নিহত শিশু ইলহাম বিনতে নাসির সাতকানিয়ার ঢেমশা ইউনিয়নের উত্তর মাইজপাড়া গ্রামের মাস্টার বাড়ির সৌদি আরব প্রবাসী নাসির উদ্দিনের মেয়ে। ইলহাম মা নাসরিন আক্তার খুশবুর সঙ্গে সৈয়দশাহ রোডের নিজেদের বাসায় থাকতো। সে চকবাজার মেরন সান স্কুল এন্ড কলেজের ৬ষ্ঠ শ্রেণীর ছাত্রী। তিন বোনের মধ্যে ইলহাম সবার বড়।

গতকাল বুধবার দুপুরে ঘটনাস্থলে গিয়ে দেখা যায়, ঘরের মেঝেতে ফোটা ফোটা রক্তের দাগ তখনো লেগে আছে। ঘরের যে কক্ষে শিশুটিকে খুন করা হয়েছে সেই কক্ষের বিছানা রক্তে ভিজে আছে। পাশের কক্ষে ঘরের জিনিসপত্র ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। পরিবারের দাবি, খুনের ঘটনায় জড়িতরা স্বর্ণালংকার লুট করেছে। সিআইডি তদন্ত সংশ্লিষ্ট আলামত সংগ্রহ করেছে।
থানা পুলিশের পাশাপাশি পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিশন (পিবিআই) ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছে।

ঘটনাস্থল লায়লা ভবনের পঞ্চম ও ষষ্ঠতলায় নাছির ও তার তিন ভাইয়ের পরিবার থাকে।
চট্টগ্রাম নগর পুলিশের অতিরিক্ত উপ কমিশনার (দক্ষিণ) শাহ মো.আব্দুর রউফ বলেন, ওই ঘরের আলমারির কাপড়চোপড় এলোমেলো অবস্থায় ছিল। পরিবারের সদস্যরা জানিয়েছেন, আলমারি থেকে তাদের বেশ কিছু গয়না খোয়া গেছে। তবে শোবার ঘরের ওয়ারড্রব ভাঙার কোনো আলামত পাওয়া যায়নি।

পুলিশ ও স্থানীয় সূত্র জানায়, মোহাম্মদ নাছির ও নাসরিন আক্তার খুশবু দম্পতির তিন মেয়ের মধ্যে ইনহাস সবার বড়। লায়লা ভবনের ৬ষ্ঠ তলায় তিন কক্ষের বাসায় তিন মেয়ে ও শাশুড়িকে নিয়ে থাকতেন খুশবু। ভবনটি তাদের নিজস্ব। ঈদে গ্রামের বাড়ি সাতকানিয়ার ঢেমশায় যাওয়ার পর এখনও ফেরেননি তার শাশুড়ি। সকাল ৮টার দিকে মেজো মেয়েকে স্কুলে দিতে বাইরে যান খুশবু। ঘরে তখন ইনহাস আর আড়াই বছর বয়সি ছোট মেয়ে ছিল। সকাল ৯টার দিকে বাসায় ফিরে তিনি ঘরের দরজা চাপানো অবস্থায় পান। পরে ইনহাসের ঘরে গিয়ে তাকে বালিশ চাপা অবস্থায় শোয়ানো দেখতে পান। ডাকাডাকি করে সাড়া না পেয়ে বালিশ তুলে খুশবু দেখেন রক্তে ভেসে যাচ্ছে। এরপর তার চিৎকারে পাশের বাসা থেকে অন্যরা ছুটে এসে ইনহাসকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যান। সেখানে চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। খবর পেয়ে বাকলিয়া থানা পুলিশ, সিআইডি, পিবিআই ও নগর গোয়েন্দা পুলিশ ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন।

বাকলিয়া থানার ওসি প্রণব চৌধুরী বলেন, প্রবাসীর বাড়ি হওয়ায় কেউ মূল্যবান জিনিসপত্র লুটের জন্য এ ঘটনা ঘটিয়েছে কিনা,অথবা পারিবারিক কোনো বিষয় আছে কিনা তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। এ ঘটনায় সন্ধ্যা সাড়ে ৬টা পর্যন্ত কাউকে আটক করা হয়নি। তবে মেয়ের মাসহ ওই ভবনের বাসিন্দাদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। মামলা দায়েরের প্রস্তুতি চলছে।
সরেজমিনে গতকাল বিকেল চারটার দিকে পশ্চিম বাকলিয়া সৈয়দশাহ রোডের ল্যান্ডম্যার্ক সোসাইটি এলাকার এমএস লায়লা ভবনে গিয়ে দেখা যায়, ইনহাসের পিতা মো. নাছিরের পরিবার ৬ষ্ঠ তলায় পশ্চিম পাশের বাসাটিতে থাকে। পঞ্চম ও ষষ্ঠ তলার চারটি ফ্ল্যাটে নাছির ও তার তিন ভাইয়ের পরিবার থাকে। তারা চার ভাই বিদেশে থাকেন। আরেক ভাই থাকেন গ্রামের বাড়িতে। ফ্ল্যাটের বিভিন্ন কক্ষ ঘুরতে ঘুরতে ঘটনাস্থল বেডরুমে প্রবেশ করতে যেতেই সিআইডি বাধা দেয়। তবু জানালাম আপনাদের ঘেরা দেওয়া স্থানে যাবই না, শুধু পরিবেশটা দেখে যাই। রাজি হলেন তারা। দেখা গেল, ইনহাস নেই ঠিকই, কিন্তু তার ব্যবহৃত জিনিসপত্র, পড়ার টেবিলে এলোমেলো বই খাতা তার উপস্থিতি জানান দিচ্ছে। তার খেলনা, মিউজিক্যাল ডল আর বাজে না; ইনহাসের শোকে তারাও স্তব্ধ যেন।

ঘটনাস্থল পরিদর্শনকারী সিআইডি কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, সকাল ৮টা থেকে ৯টার মধ্যে ইনহাস খুন হয়। বাসার আলমারি পাওয়া গেছে ভাঙা এবং কাপড়গুলো এলোমেলো।
ইনহাসের মা নাছরিন আক্তার খুশবু গতকাল বিকেলে প্রশ্নের উত্তরে কান্নায় ভেঙে পড়েন। পরে একটু সামলে উঠে বলেন,তিনি মেঝো মেয়ে জারিন বিনতে নাছিরকে (৫) স্কুলে দিতে বাসা থেকে বের হন সকাল ৭টা ৫০মিনিটে। এ সময় তিনি ইনহাসকে দরজা বন্ধ করে দিতে বলেন। জারিনকে স্কুলে দিয়ে বাসায় আসেন ৯টায়। বাসায় ঢুকে দেখতে পান মুখের উপর বালিশ রাখা অবস্থায় বিছানায় শোয়া ইনহাস। তাকে ডাকতে গিয়ে দেখতে পান তার গলা দিয়ে রক্ত ঝরছে। পরে তিনি চিৎকার দিলে সামনের ফ্ল্যাট থেকে তার ছোট দেবরের শ্যালক রাজু দৌঁড়ে ওই বাসায় যান।

দেখা গেছে, ইনহাস যে রুমে খুন হয় ঠিক তার পাশের রুমে ঘুমিয়ে ছিল ২ বছর বয়সী ইননাছ। বাসার ফ্লোর এবং উঠার সিঁড়িজুড়ে রক্তের ছাপ দেখা গেছে। ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে এডিসি (দক্ষিণ) শাহ মোহাম্মদ আবদুর রউফ বলেন, বাকলিয়া থানার পাশাপাশি ঘটনাটি তদন্ত করছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন, সিআইডি, পুলিশের কয়েকটি টিম। প্রাথমিকভাবে পুলিশ ধারণা করছে, কোনো পেশাদার খুনী এ কাজ করতে পারে। এছাড়া, এ ঘটনার পেছনে পরিবারিক বিরোধ জড়িয়ে থাকার সম্ভাবনাও উড়িয়ে দিচ্ছে না পুলিশ। এই দু’টি বিষয়কে মাথায় রেখেই তদন্ত চলছে বলে পুলিশ জানিয়েছে।

এডিসি রউফ বলেন, প্রধান দু’টি ক্লু ছাড়াও আরো কয়েকটি বিষয় নিয়ে কাজ শুরু করেছি। কিন্তু স্থির সিদ্ধান্তে আসতে পারছি না। আমরা শুনেছে ইনহাসের বাবা দেশের পথে রওনা দিয়েছেন। তিনি এলে তাকে বাদী করে মামলা দায়েরের ইচ্ছে আছে আমার। যেহেতু কোনো কারণই আমরা বাদ দিতে চাইছি না।

এরই মধ্যে ইনহাসের মা নাসরিনকে জিজ্ঞাসাবাদ করেছেন নগর পুলিশের অতিরিক্ত উপকমিশনার (এডিসি–দক্ষিণ) শাহ মো. আব্দুর রউফ। এ দুটি কারণ এত অধিক গুরুত্ব পাওয়া প্রসঙ্গে এডিসি বলেন, ইনহাসকে হত্যার পাশাপাশি দুর্বৃত্তরা ওই বাসা থেকে ৫–৬ ভরি স্বর্ণালংকার নিয়ে গেছে বলে দাবি করেছেন ইনহাসের মা। তবে ল্যাপটপ বা মোবাইল ফোন নিয়ে যায়নি তারা। আর বাসার একটি রুমের আলমারি খোলা ও কাপড়চোপড় এলোমেলো অবস্থায় পাওয়া গেছে। তিনি বলেন, শহরে পেশাদার একটি অপরাধী চক্র আছে যারা ভোরে বের হয়। যেসব বাসায় তালা থাকে কিংবা বাসার দরজা খোলা থাকে, সেগুলো খুঁজে খুঁজে বের করে। তারপর বাসায় ঢুকে চুরি–ডাকাতি করে। একবছর আগে বাকলিয়ার মাস্টারপুলে শাহীনূর আক্তার নামে এক গৃহবধূ নিজ বাসায় এই চক্রের হাতে খুন হন। ওই ঘটনার সাথে এই ঘটনার মিল রয়েছে। তিনি আরো বলেন, পেশাদার খুনি এই কাজ করতে পারে। আবার পারিবারিক কোনো বিরোধ আছে কিনা, সেটাও আমরা খতিয়ে দেখছি।

এদিকে, নাসরিন আক্তারের হাতে কাটা দাগ দেখা গেছে। নাসরিনের ননদ পাখি আক্তার বলেছেন, মেয়েকে রক্তাক্ত দেখে নাসরিন আত্মহত্যার চেষ্টা করেন। পুলিশের কাছে জিজ্ঞাসাবাদেও নাসরিন আত্মহত্যার চেষ্টার কথা নিশ্চিত করেছেন বলে জানিয়েছেন বাকলিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) প্রণব চৌধুরী। তিনি বলেন, নাসরিন জিজ্ঞাসাবাদে বলেছেন, ‘আমার স্বামীকে আমি কী জবাব দেবো?তাই আমি আত্মহত্যার চেষ্টা করেছিলাম। তার এমন বক্তব্যকে সন্দেহের চোখে দেখছেন পুলিশ কর্মকর্তারা। জিজ্ঞাসাবাদে নাসরিনের দেওয়া বিভিন্ন তথ্যের সূত্র ধরে পারিবারিক বিরোধের বিষয়টিকেও তদন্তে রেখেছে পুলিশ।

ওসি প্রণব চৌধুরী বলেন, ‘যে রুমে মেয়েটি খুন হয়েছে, তার পাশের রুমে কাপড়ের ভেতরে আলমারির চাবি পেয়েছি। আবার পাশেই ইমিটেশনের গহনার বাক্স ছিল। কিন্তু সেখান থেকে কিছু নেওয়া হয়নি। ওসি বলেন, খুনি যদি নিছক ডাকাতি করতে আসত, তাহলে ইমিটেশনের অলংকার ফেলে স্বর্ণালংকারগুলো চিনল কিভাবে? তারা তো অলংকারের সব বাক্সই নিয়ে যেত। আবার নাসরিন বলছেন,বাসায় ঢুকে ছোট মেয়েকে ঘুমন্ত অবস্থায় দেখেছেন। আলমারি খোলা বা ভাঙার শব্দে শিশুটি জেগে উঠল না কেন? এসব প্রশ্নও আমরা খতিয়ে দেখছি। এদিকে, সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরি করা পিবিআই টিমের এক সদস্য জানিয়েছেন, ইনহাসের গলায় কাটা দাগ ছাড়া শরীরে আর কোনো আঘাতের চিহ্ন তারা পাননি।

ওসি বলেন, স্বজনরা জানিয়েছে মেয়ের মৃত্যুর সংবাদ পেয়ে বাবা নাসির সৌদি আরব থেকে দেশের উদ্দেশ্যে রওয়ানা দিয়েছেন। নাসির আসলে মামলা করা হবে বলে জানিয়েছেন স্বজনরা।