ঢাকা, শনিবার, ২১ এপ্রিল ২০১৮

চট্টগ্রামের প্রাণ মহিউদ্দিন

সারাবেলা প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ১৫ ডিসেম্বর ২০১৭ শুক্রবার, ০৯:০০ পিএম

চট্টগ্রামের প্রাণ মহিউদ্দিন

কয়েক দশক ধরে চট্টগ্রামে আওয়ামী লীগের ‘প্রাণ’ তিনি; এখন ছেলে দলের কেন্দ্রীয় পদে; দ্বিতীয় প্রজন্ম দায়িত্ব নিয়েছে, তবুও চট্টগ্রামবাসীর জন্যর রাজনীতিতে সক্রিয় থাকতে চান এ বি এম মহিউদ্দিন চৌধুরী।

“টিল ডেথ, আই উইল ডু ফর দ্য পিপল অব চিটাগং, চট্টগ্রামের মানুষকে আমি ভালোবাসি,” নিজের ৭২তম জন্মবার্ষিকীকে সবার শুভেচ্ছা নিয়ে বলেছেন তিনি।

এক সময়ে চট্টগ্রামে আওয়ামী লীগ তথা বন্দরনগরীর রাজনীতিতে একচ্ছত্র আধিপত্যম থাকলেও এখন সে তুলনায় কিছুটা ম্রিয়মান সাবেক এই মেয়র।

“শরীর বেশি ভালো না। কথা বলতে পারছি না....বয়স বাড়ছে,” জন্মদিন উদযাপনে নেতা-কর্মীদের ভিড়ের মধ্যে ই নগরীর চশমা হিলের বাড়িতে সাংবাদিকদের িএভাবে দিয়েছিলেন তার সবশেষ জন্মদিনের প্রতিক্রিয়া।

১৯৪৪ সালের ১ ডিসেম্বর রাউজান উপজেলার গহিরা গ্রামে জন্ম নেওয়া মহিউদ্দিন চৌধুরী ছাত্রলীগ, আওয়ামী লীগের বিভিন্ন পদের দায়িত্ব সামলে তিন বার চট্টগ্রামের মেয়র নির্বাচিত হন।
পঁচাত্তরে জাতির জনক শেখ মুজিবুর রহমান হত্যাাকাণ্ডের প্রতিশোধ নিতে ‘মুজিব বাহিনী’ গঠন করেছিলেন এই মুক্তিযোদ্ধা। তখন কয়েক বছর ভারতে পালিয়েও থাকতে হয়েছিল তাকে।
১৯৭৮ সালে দেশে ফিরে রাজনীতিতে ফের সক্রিয় হয়ে চট্টগ্রামে আওয়ামী রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হন মহিউদ্দিন।

বয়সের ভার নিয়েও এখন পালন করছেন মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতির দায়িত্ব; যদিও কারও কারও অভিযোগ রয়েছে, পদ ছাড়তে চান না তিনি।

মহিউদ্দিনের ভাষ্য, “সারাজীবন দরিদ্রের সন্তান, সেবকের সন্তান, সাধারণ পরিবারের সন্তানদের শিক্ষার জন্য কাজ করেছি। অন্যায়-অবিচার দেখলে এখনও কথা বলি। যতদিন বেঁচে থাকব চট্টগ্রামের মানুষের জন্য কাজ করব।”

জন্মদিনে  রাত ১২টা ১ মিনিটে নগর ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীরা বাড়িতে হাজির হয়ে কেক কাটেন নেতা মহিউদ্দিনের সঙ্গে।

পরদিন সকালে তিনি হাজির হন চট্টগ্রাম নগর পুলিশ আয়োজিত কমিউনিটি পুলিশের এক সমাবেশে। সেখান থেকে বেরিয়ে দুপুর সোয়া ২টার দিকে পৌঁছান চশমা হিলে ‘মেয়র গলি’ নিজের বাড়িতে।
তখন তার বাড়ির সামনে কয়েক হাজার নেতাকর্মীর ভিড়; সবার হাতে ফুল আর কেক।

সমর্থকদের ভিড় ঠেলে নিচ তলার বৈঠকখানায় বসেন মহিউদ্দিন। সেখানে নগর আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে সাধারণ সম্পাদক আ জ ম নাছির উদ্দিনের নেতৃত্বে নেতারা ফুল দেন।

চট্টগ্রামের রাজনীতিতে মহিউদ্দিনবিরোধী হিসেবে পরিচিত বর্তমান মেয়র নাছির বলেন, “শ্রদ্ধাভাজন মহিউদ্দিন ভাই আমাদের কর্মপথের পাথেয়। তার নেতৃত্বে নগর আওয়ামী লীগ সুসংহত। তার দীর্ঘায়ু কামনা করছি।”

গত ১০ বছর ধরে নগর আওয়ামী লীগ সভাপতি মহিউদ্দিন চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের তিন বারের নির্বাচিত মেয়র।

দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে বারবার দল এবং সরকার বিভিন্ন পদের জন্য প্রস্তাব থাকলেও চট্টগ্রাম ছেড়ে যেতে চাননি অন্য কোথাও।
আওয়ামী লীগের পর দীর্ঘ সময় ধরে যুবলীগ, ছাত্রলীগ, মহিলা আওয়ামী লীগসহ বিভিন্ন সংগঠনের নেতাকর্মীরা তাকে ফুল দিয়ে শুভেচ্ছা জানান। অনেকে সেলফিও তোলেন।

মহিউদ্দিনের জন্ম রাউজানের গহিরা গ্রামের বক্স আলী চৌধুরী বাড়িতে। বাবা রেল কর্মকর্তা হোসেন আহমদ চৌধুরী এবং মা বেদুরা বেগম।

ছাত্রাবস্থায় রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়া মহিউদ্দিন ১৯৬২ সালে এসএসসি, ১৯৬৫ সালে এইচএসসি এবং ১৯৬৭ সালে ডিগ্রি পাস করেন।

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগ এবং পরে আইন কলেজে ভর্তি হলেও শেষ করেননি। জড়িয়ে পড়েন ছাত্র আন্দোলনে।

১৯৬৮ ও ১৯৬৯ সালে চট্টগ্রাম নগর ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক ছিলেন মহিউদ্দিন।
একাত্তরে গঠন করেন ‘জয় বাংলা’ বাহিনী। গ্রেপ্তার হন পাকিস্তানি সেনাদের হাতে। পাগলের অভিনয় করে কারাগার থেকে ছাড়া পেয়ে পালিয়ে যান ভারতে।

উত্তর প্রদেশের তান্ডুয়া সামরিক ক্যাম্পে প্রশিক্ষণরত মুক্তিযোদ্ধাদের একটি স্কোয়াডের কমান্ডার নিযুক্ত হন মহিউদ্দিন।

সম্মুখ সমরের যোদ্ধা মহিউদ্দিন স্বাধীনতার পর শ্রমিক রাজনীতিতে যুক্ত হন। যুবলীগের নগর কমিটির সাধারণ সম্পাদক পদ পান।

পঁচাত্তরে জাতির জনকের হত্যার পর প্রতিশোধ নিতে মৌলভি সৈয়দের নেতৃত্বে গঠন করেন ‘মুজিব বাহিনী’। ‘চট্টগ্রাম ষড়যন্ত্র মামলা’র আসামি করা হয় তাকে। কলকাতায় পালিয়ে যান মহিউদ্দিন।
১৯৭৮ সালে দেশে ফেরেন। পাঁচ দশকের রাজনৈতিক জীবনে অনেক কিছু পেলেও কখনও সংসদ সদস্যব হতে পারেননি মহিউদ্দিন। ১৯৮৬ সালে রাউজান থেকে এবং ১৯৯১ সালে নগরীর কোতোয়ালি আসনে ভোট করে হারেন তিনি।

১৯৯৪ সালে প্রথমবার চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়র পদে প্রার্থী হয়েই বিজয়ী হন। ২০০০ সালে দ্বিতীয় দফায় বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় এবং ২০০৫ সালে তৃতীয় দফায় মেয়র নির্বাচিত হন মহিউদ্দিন।
২০০৬ সালের ২৭ জুন নগর আওয়ামী লীগের সভাপতি হন মহিউদ্দিন। এর আগে প্রায় দুই যুগ সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন।

২০১৪ সালের নভেম্বরে হওয়া কমিটিতেও তিনি সভাপতি পদ পান। সদ্য ঘোষিত আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কমিটিতে বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদকের পদ পায় মহিউদ্দিনের বড় ছেলে মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল।