AD
ঢাকা, শুক্রবার, ২৮ জুলাই ২০১৭

সমাজ বিচ্ছিন্নতা : একাকীত্ব থেকে শূন্যে

মোস্তাফিজুর রহমান লিটন
প্রকাশিত: ১৩ জুন ২০১৭ মঙ্গলবার, ১০:১৯ পিএম
সমাজ বিচ্ছিন্নতা : একাকীত্ব থেকে শূন্যে

আমরা যে প্রথা বা নিয়মগুলো জেনেছি, শিখেছি বা জানতাম তা ধীরে ধীরে ভাঙছে। যা আগে জেনেছি তা নতুন করে জানবার বা শিখবার অনিবার্যতা দেখা দিচ্ছে। এক সময় জানতাম মানুষ প্রকৃতিকে জয় করবে, জয় করবে পাহাড়, পর্বত, সমূদ্র, মহাসমূদ্র। প্রকৃতিকে জয় করতে করতে মানুষ আজ এমন এক বিরুদ্ধ অবস্থানে দাঁড়িয়েছে যে, প্রকৃতিকে জয় করবার চেয়ে রক্ষা করা আজ বেশি প্রয়োজন। একসময় কলম্বাস আমেরিকা আবিস্কার করেছিলেন, কলম্বাসের আবিস্কৃত প্রকৃতির নিবিড় কোল আজ বিশ্বের সবচেয়ে পরাক্্রমশালী রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠা পেয়েছে।

কলম্বাস একদিন অভিবাসি হিসেবে আমেরিকা আবিস্কার করলেও বর্তমান আমেরিকান প্রেসিডেন্ট সেখানে অভিবাসিদের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছেন। এ রকমভাবে বিশ্বব্যপী প্রকৃতি ও প্রতিবেশ আজ ধ্বংসের কিনারে পৌছে তার চীরচেনা শান্ত রুপটির বদলে ক্রুদ্ধ হয়ে ওঠছে সুনামিতে, বন্যায়, সাইক্লোনে। পরিবেশ বিজ্ঞানীরা ভাবছেন, হিমালয়ের সঞ্চিত বরফের পাহাড়গুলো অতি তাপমাত্রা বৃদ্ধিতে গলে গেলে বাঙলাদেশসহ দক্ষিন এশিয়ার অনেকগুলো দেশ পানিতে তলিয়ে যাবে। তাই আজ প্রকৃতিকে জয় করবার চেয়ে প্রকৃতিকে রক্ষা করা অনেক বেশী প্রয়োজনীয়।

একসময় জেনেছি, মানুষ সামাজিক জীব ও সমাজবদ্ধ হয়ে বসবাস মানুষের ধর্ম। বনে, জঙ্গলে বসবাসরত মানুষ পাহাড়ি জীবজন্তু থেকে রক্ষা পাবার জন্য ও পারস্পরিক সহযোগীতার জন্য একসাথে বসবাস করতো। শারীরিক যৌনতা ও বংশপরম্পরা রক্ষার তাগিদে মানুষ বিবাহ প্রথায় নিজেদের যুক্ত করল, তৈরী হলো পরিবার সূত্রের, সেই সঙ্গে গোত্র সূত্র বা সমাজ জন্ম নিল। শাসন ও শোসনের ভৌগলিক দাবী তৈরী করলো মানচিত্র, গঠিত হলো দেশ, মহাদেশ এবং খন্ড খন্ড মহাদেশ মিলে একটি মহাবিশ্ব। বিশ্বব্যপী মানুষের সামাজিক পরিচয় এতো বেশী প্রতিষ্ঠিত ছিলো যে, আশাবাদীরা একটি অখন্ড মহাবিশ্বের কথাও ভাবছিলেন, সকল নাগরিকের বিশ্ব নাগরিক হবার স্বপ্নও কেউ কেউ দেখিয়েছেন। এই স্বাপ্নিক মানুষদের মধ্যে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও একজন। তবুও মানুষ বিচিত্র, তার চেয়েও বিচিত্র তাদের মন ও মনন, মেধা ও রুচি।   

চিরচেনা সমাজবদ্ধতার সংজ্ঞা ধীরে ধীরে ঘুনে ধরতে শুরু করেছে। বিশেষ করে পশ্চিমা বিশ্বে- ইউরোপ ও আমেরিকায় মানুষ ভোগবাদীতার চরমে পৌছেছে। আত্মকেন্দ্রিকতা মানুষকে এতো বেশী পেয়ে বসেছে যে, লোপ পেতে চলেছে সমাজ ব্যবস্থার। এক সময়কার কমিউনিটি লিভিং আজ স্টুডিও এপার্টমেন্টে একা, স্বকীয় ও স্বাধীন ও বিচ্ছিন্ন জীবন যাপনে অভ্যস্ত হয়ে ওঠছে। মূলত একসময় মানুষ বিভিন্ন প্রয়োজনে একে অন্যের ওপর নির্ভরশীল ও সহযোগী ছিল। বহুজাতিক বিপণনের পুঁজিবাদী প্রতিযোগীতা সকল সামাজিক ও পারিবারিক নিত্য প্রয়োজনীয় উপকরনগুলোকে বিশেষায়িত পণ্যে রুপান্তরিত করে নিলে মানুষের পারস্পরিক সহযোগীর প্রয়োজনীয়তা কমতে থাকে। উন্নত বিশ্বে বাসায় রান্না করা আজ বিশেষ ঝামেলার কাজ, মানসম্মত সুপার সপে হরেক রকম তৈরী খাবার পরিবেশিত হয়ে। অনলাইনে কিংবা ফোনে বুক করলে গরম গরম ধোঁয়া উড়তে উড়তে দরজায় পৌছে যায়। কাপড় পরিস্কার হতে শুরু করে, বাসা গোছানো সবকিছুর বানিজ্যিক প্রসার খুব সহজলভ্য ও টাকা গুনলেই দোরগোড়ায় হাজির। বিশ্বব্যাপি শারিরীক প্রয়োজন মেটানোর বারবনিতা প্রথাও বৈধ, অবৈধ দু’ভাবেই স্বীকৃত। ইউরোপ, আমেরিকা, চীন, সুইডেন, কানাডা, আফ্রিকাসহ অনেক  দেশে ভাড়ায় বন্ধু পাওয়া যায়।      

পুঁজিবাদী বানিজ্য মানুষের একান্ত নিবিড় ও মৌলিক অনুভূতিগুলোকে ভেঙ্গে চুরে দিচ্ছে। নারী ও পুরুষ উভয়েরই আত্মনির্ভরশীল ও স্বকীয় হবার স্বপ্ন যত অনিবার্য হচ্ছে ততই বাড়ছে দূরত্ব। প্রেমে ও ভালোবাসায় থাকবার পরও বাড়ছে একাকীত্ব। কবি নির্মলেন্দু গুনের ভাষায় ‘কাগজের দুটো পৃষ্ঠার মতো প্রেম,/ কোনদিন কেউ ছোঁবে না পরস্পর।/ চোখের কৃঞ্চ বৃত্ত ঘিরেছে সাদা,/ ভালোবাসা তবু আমার ভিতরে একা’ (পুনশ্চঃ অন্তর্জাল)। একই ছাদের নিচে একই বিছানায় মানুষ জীবনে যাপনে পাশাপাশি থাকছে, তবুও তাদের মধ্যে বাড়ছে দূরত্ব। উন্নত ও পশ্চিমা দেশগুলোতে বিবাহিত দম্পতিদেরও আইনি বিচ্ছেদ বিহীন আলাদা থাকার সংস্কৃতি তৈরী হচ্ছে। সামাজিক অনুষ্ঠান ও একান্ত প্রয়োজনগুলোতে শুধু তারা একত্রিত হচ্ছেন এছাড়া সকল সময়ে যে যার মতো। খেলাধুলা আর বিনোদন জগতের বৈশ্বিক সেলিব্রেটিদের পাশাপাশি এশীয় সেলিব্রেটিদের মধ্যেও একধরনের বিবাহ বন্ধন ভীতি প্রবলভাবে দেখা যাচ্ছে। তারকাদের যারা বিয়েতে জড়াচ্ছেন তাদের সংসারও টিকছেনা বেশী দিন, টেনেটুনে বছর দু’য়েক গড়ানোতেই ডাকঢোল ফিটিয়ে ভাঙনের সুর। সে জন্য তারকারা আজ বিয়ের বাইরে থেকে বন্ধুত্ব কিংবা লিভিংটুগেদারে জীবন যতটা টেনে নেয়া যায় তাতেই সন্তুষ্ট।  

এইতো গেল বিয়ে প্রথার বৈশ্বিক চিত্র। পরিবার ও সামাজিক চিত্রেও একই ভাঙন। এশিয়া মহাদেশে একান্নবর্তী ও বড় পরিবার সংস্কৃতিটি বেশ পুরনো। সামাজিক মূল্যবোধ আর ঐতিহ্য যাই বলিনা কেন হিন্দু, মুসলমান উভয় সমাজে একান্নবর্তী পরিবারের মানুষদের বিশেষ কদর ছিল। একান্নবর্তী পরিবারগুলো ভেঙ্গে ভেঙ্গে আজ ছোট ছোট পরিবারের সংস্কৃতি গড়ে ওঠছে।

পুুঁজিবাদী বৈশ্বিক বিপণন ব্যবস্থা হানা দিয়েছে এ খানেও। অর্থনৈতিক বিবেচনার কথা যদি বলি, একই পরিবারভূক্ত মানুষরা যখন একসঙ্গে বসবাস করবে তখন তাদের সাংসারিক খরচ গড়পরতায় অনেক কমে যাবে। তারচেয়ে অনেক বেশি খরচ হবে আলাদা আলাদা থাকতে গেলে। একান্নবর্তী পরিবারে বাড়ী বাড়া, মাসিক বাজার খরচসহ সবক্ষেত্রে সাশ্রয় হবে। একে অপরের বিপদে পাশে থাকার সুযোগ, সামাজিক নিরাপত্তাতো আছেই, তবুও মানুষ দূরত্বকেই আজ বেছে নিচ্ছে। কিন্তু কেন, এর উত্তর একটাই স্বকীয়তা, সবাই নিজের মতো থাকতে চায়, অন্যের জন্য সেক্রিফাইস করতে কেউ রাজি নয়। পুঁজিবাদী বিপণন ব্যবস্থাও এই ব্যক্তিক ধারণাগুলোকে উসকে দিচ্ছে কারণ মানুষ যত আলাদা থাকবে, তত গড় পারিবারিক চাহিদা বাড়বে, সাবান বেশী বিক্রি হবে, শ্যাম্পু  বেশি লাগবে, বহুজাতিক মোড়লদের বিক্রি বাট্টা বাড়বে, আর কর্পোরেট সোশ্যাল রেসপনসিভিলিটির নামে দু’জন পঙ্গু মানুষকে দু’টি হুইল চেয়ার ধরিয়ে দিয়ে মিড়িয়ার আনুকূল্যে বিশেষ প্রচার পাবেন, বেশ তো।  

কবি আবু হাসান শাহরিয়ারের কবিতাটি আমরা একটু পড়ি- ‘তোমার চোখের চেয়ে বেশী নীল অন্য কোনও আকাশ ছিল না/ যেখানে উড়াল দিতে পারি/ তোমার স্পর্শের চেয়ে সুগভীর অন্য কোন সমূদ্র ছিল না/ যেখানে তলিয়ে যেতে পারি/ তোমাকে দ্যাখার চেয়ে নির্নিমেষ অন্য কোন দ্রষ্টব্য ছিল না/ যেখানে নিমগ্ন হতে পারি/ তোমাকে খোঁজার চেয়ে বেশী দূর অন্য কোন গন্তব্য ছিল না/ যেখানে হারিয়ে যেতে পারি।/ কেবল তোমার চেয়ে বেশি দীর্ঘ তুমি হীন একাকী জীবন।’ কবির কাছে প্রেমহীন একাকী জীবন অনেক দীর্ঘ মনে হলেও সাধারন মানুষের কাছে এই প্রেম ধীরে ধীরে দু’দিনের মোহ, মানবিক পন্য কিংবা শারিরীক প্রয়োজনের চেয়ে বেশী কোন গুরুত্ব পাচ্ছেনা। এ’টি যেমনি প্রেমিক-প্রেমিকায়, স্বামী-স্ত্রীতে তেমনি তৈরী হচ্ছে পরিবারে। পিতা মাতার প্রতি আমাদের সামাজিক ও মানসিক দায়গুলো কমছে সে জন্য বাঙলাদেশের মতো এরকম পারিবারিক মূল্যবোধ আশ্রিত সমাজেও তৈরি হচ্ছে বৃদ্ধাশ্রম। বাড়ছে বয়োবৃদ্ধ মানুষের অমানবিক অসহায়ত্ব।

এভাবে ধীরে ধীরে বন্ধনহীন হতে হতে, একাকী হতে হতে আমরা কোথায় গিয়ে দাঁড়াবো। একাকীত্ব থেকে শূণ্যে। তবে শূণ্যই কি হবে আগামী দিনের মানুষের শেষ আশ্রয়স্থল। আজকের কাজে কর্মের ক্লান্ত মানুষেরা, ট্রাফিক জ্যামাক্রান্ত পথ সাঁতরিয়ে পরিবারে গিয়ে প্রিয় বাবা মায়ের কাছে, প্রিয় প্রিয়তমার কাছে, প্রিয় সন্তানবেষ্টিত নিবিঢ় বন্ধনের কাছে ক্লান্তিগুলো জমা রেখে রাতঘুমে জড়িয়ে যায়। পরদিন আবার ছুটোছুটি। জানিনা আগামী দিনের মানুষেরা নিজের তৈরী দেয়ালে কিভাবে থাকবেন মানসিক আশ্রয়হীন।

‘শাস্ত্রে বলে-/ দুই পারে, পরস্পরে, সম্পর্ক হলেই তবে গড়ে ওঠে সেতু।/ আরো বলে- বস্তুত কোনো সেতুই সম্ভব নয় সম্পর্ক বিহীন।/ অথচ কতটা ধ্রুব, সুস্থির সম্পর্ক আমাদের!/ তবু জেগে ওঠছেনা কোন সেতু/ কোনদিন জাগবে না আর।/ সাড়াহীন পারাপারহীন পড়ে আছি যার যার পারে।’ (সেতু ও সম্পর্ক ঃ মাসুদ খান)। সত্যিই আজ কবিতার মতো এরকম একটি সেতু দরকার আমাদের। মানুষে মানুষে যত বেশি গড়ে ওঠবে মানবিক সেতু, তত  বেশি সুন্দর হবে আগামী দিনের সন্তানদের সমৃদ্ধ জীবন। আসুন আমরা সকলে মিলে সেই মানসিক সেতুটি তৈরী করবার কাজ শুরু করি। ফিরে যাই প্রিয়তমার নিবিড় ঘ্রানের কাছে। মায়ের হাতে রান্না করা মোটা ভাতের দারুণ সুগন্ধের কাছে। প্রিয় সন্তানের মায়া ও শ্রদ্ধাশ্রিত পরিবারে। আমরা মানুষের হতে শিখি, সামাজিক হতে শিখি। নিজেকে বিলিয়ে দিই অন্যের তরে। সমাজ সুন্দর হবে, বসবাস আনন্দের হবে।

মোস্তাফিজুর রহমান লিটন : কবি ও সমাজকর্মী।